বর্ষার ঋতু এসে উপস্থিত হয়েছে। আজ আকাশ যেন বিশাল পর্বতের মতো ঘন মেঘে আচ্ছাদিত। সূর্য তার তেজ ছড়িয়ে নয় মাস ধরে আকাশে গর্ভধারণ করেছে, আর এখন, সাগরের নির্যাস পান করে, সে যেন বৃষ্টির অমৃত প্রসব করছে। সূর্য যেন মেঘের সিঁড়ি বেয়ে আকাশে আরোহণ করেছে, আর কুটজ ও অর্জুন ফুলের মালা পরে সজ্জিত হয়েছে। গোধূলির লাল ও ফ্যাকাসে আভা মেঘের কিনারায় ছড়িয়ে পড়েছে, ঝলমলে ফাটলগুলো আকাশকে এমন দেখাচ্ছে যেন ক্ষতবিক্ষত দেহে ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়েছে। হালকা বাতাসে আকাশ যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে, সন্ধ্যার চন্দন রঙে রঞ্জিত ও মেঘে ফ্যাকাসে হয়ে, সে যেন ভালোবাসায় কাতর কোনো প্রাণ। এই পৃথিবী, সূর্যের দাহে ঝলসে গিয়ে এখন টাটকা জলে ভিজে, যেন শোকে কাতর কোনো নারী ক্রন্দন করছে। মেঘের পেট থেকে বেরিয়ে আসা বাতাস, কর্পূরের মতো শীতল ও কেতকী ফুলের সুবাসে ভরা, হাতে তুলে পান করার মতো মনে হয়। দেখো, এই পর্বত—ফুলে ভরা অর্জুন গাছ, কেতকীর সুগন্ধে মাতাল, ঝরনায় স্নান করছে—এ যেন সুধীগ্রীব, শান্ত ও অভিষিক্ত। মেঘের কালো চামড়ায় ঢাকা পর্বত, ঝরনার জয়মালায় সজ্জিত, গুহায় বাতাসে পূর্ণ—এ যেন বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণরত পুরোহিত। আকাশে সোনালী বিজলির চাবুকের আঘাতে ও বজ্রনিনাদে আকাশ যেন বেদনার্ত হয়ে কাঁপছে। কালো মেঘের মাঝে বিদ্যুৎ ঝলকানি আমার কাছে সীতার মতো মনে হয়—উপবাসিনী, রাবণের কোলে কাঁপছে। দিগন্ত, যা আগে প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রিয় ছিল, এখন মেঘে ঢাকা, চাঁদ-তারা হারিয়ে গেছে। সৌমিত্রি, পাহাড়ের ঢালে কুটজ গাছগুলি ফুলে ঢেকে গেছে—কিছু গাছ বৃষ্টির জন্য আকুল হয়ে, অশ্রুতে দমবন্ধ, আমারও শোক ও আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আজ ধুলো থেমে গেছে, বাতাস কোমল, গ্রীষ্মের তাপ কমে এসেছে; রাজাদের যাত্রা বন্ধ, পথিকেরা তাদের গৃহে ফিরে যাচ্ছে। চক্রবাক পাখিরা, হ্রদে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়, সঙ্গিনী নিয়ে রওনা দিয়েছে; বৃষ্টিতে ধোয়া পথে আর রথ চলে না। মেঘে ছেয়ে থাকা আকাশ কোথাও উজ্জ্বল, কোথাও অন্ধকার; কখনো পর্বতে বাধা, যেন বিশাল সমুদ্রের শান্ত পৃষ্ঠ। পাহাড়ি ঝরনা, সার্জা ও কদম্ব ফুলে মিশে, খনিজে রাঙা, দ্রুত প্রবাহিত, ময়ূরের ডাক সঙ্গী। পাকা জাম্বু ফল রসে ভরা, মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর, সবাই তা উপভোগ করছে; বাতাসে কাঁপা, নানা রঙের, পাকা আম মাটিতে পড়ছে। মেঘ বিদ্যুতের পতাকায় শোভিত, সারসের মালা পরে, পর্বতের চূড়ার মতো, বজ্রের গর্জনে মাতাল হাতির মতো গর্জন করছে। অরণ্য, তৃণভূমি বৃষ্টিতে স্নিগ্ধ, ময়ূরের নৃত্যে মুখর, মেঘ কেটে গেলে দুপুরে আরও সুন্দর দেখায়। জলে ভরা ভারী মেঘ, সারসের ডাক, বারবার পর্বতের চূড়ায় বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে যায়। সারসের সারি, মেঘে পৌঁছাতে উন্মুখ, বাতাসে উড়ে আকাশে যেন শ্বেতপদ্মের মালা ঝুলছে। পৃথিবী, নতুন সবুজ ঘাস, কচি অঙ্কুর ও ইন্দ্রগোপ পোকায় রাঙা, যেন লাক্ষার রঙে রঞ্জিত শাড়ি পরা নারী, টিয়ার ফ্যাকাসে ছোঁয়া লেগেছে। ধীরে ধীরে ঘুমে ঢলে পড়ছে কেশব; নদী দ্রুত সাগরের দিকে ছুটছে; উল্লসিত সারস মেঘ খুঁজছে; আর প্রেমিকা, আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়ে, প্রিয়জনের কাছে যাচ্ছে। অরণ্য প্রান্তে ময়ূরের নৃত্য, কদম্ব ডালে ফুলের বাহার; ষাঁড় ও গাভীর আকাঙ্ক্ষা সমান, তারা উঠে পড়েছে; জমি শস্যে শোভিত। নদী, মেঘ, মাতাল হাতি, অরণ্য প্রান্ত—সবাই প্রবাহিত, বর্ষণ, গর্জন, দীপ্তি ছড়াচ্ছে; তারা ভাবছে, নাচছে, বিশ্রাম নিচ্ছে—কিন্তু ময়ূর ও বানর, প্রিয়জনহীন, ব্যাকুল। বৃষ্টির ঝাপটায় কদম্ব শাখায় ঝুলে থাকা মৌমাছি, দ্রুত নব্যফুলের মধু সংগ্রহ করে, ধীরে ধীরে মাতালভাব ছেড়ে দিচ্ছে। জাম্বু গাছের শাখা, রসে ভরা, পাকা লাল ফলের স্তূপে ঢেকে গেছে, মৌমাছির ঝাঁকে যেন নিঃশেষিত হচ্ছে। বজ্রনিনাদে ও বিদ্যুতের পতাকায় শোভিত মেঘের রূপ, যুদ্ধপ্রিয় হাতির মতো দীপ্ত। এক বিশাল হাতি, পাহাড়-অরণ্য পথে, মেঘের বজ্রধ্বনি শুনে—যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় উত্তেজিত, আবার প্রতিধ্বনিতে সতর্ক—মাতাল হয়ে ফিরে যাচ্ছে। কোথাও অরণ্যপ্রান্ত মৌমাছির গুঞ্জনে গীতিময়; কোথাও নীলকণ্ঠ ময়ূরের নৃত্যে; কোথাও মহারাজ হাতির মাতালে—অরণ্য নানা রূপে প্রাণবন্ত। কদম্ব, শাল, অর্জুনের কচি ডালে, মধুমিশ্রিত জলে ভরা অরণ্য মেঝে যেন মদের দোকান, ময়ূর বৃষ্টিতে মাতাল হয়ে নাচছে, ডাকছে। স্বচ্ছ মুক্তোর মতো জলে ভরা পাতার পাত্রে, ক্লান্ত-রঙের পাখিরা তৃষ্ণায় তা পান করছে—এ যেন দেবরাজের দান। মৌমাছির মধুর স্বর, বানরের তাল, মেঘের বজ্রনিনাদ—সব মিলে অরণ্যে যেন সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরু হয়েছে। কখনো নাচছে, কখনো জোরে ডাকছে, কখনো গাছে বসে লম্বা রত্নময় লেজ ছড়িয়ে ময়ূর—এ যেন সঙ্গীতেরই জন্ম হয়েছে। মেঘের শব্দে জাগ্রত বানর, দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে, নানাভাবে ডেকে উঠছে, নতুন বৃষ্টির ঝাপটায়। নদী, আশ্রিত রাজহংসকে নিয়ে, তীর ভাসিয়ে, নতুন জলে পূর্ণ হয়ে, দ্রুত সাগরমুখী। নীল পর্বতে নীল মেঘ, নতুন জলে ভরা, যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে; অগ্নিদগ্ধ অরণ্যে মেঘ যেন অগ্নি; পাহাড়ে মেঘ যেন পাহাড়ই। হাতিরা মধুর কদম্ব-অর্জুন ফুলের সুবাসে ভরা অরণ্যের গভীরে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে মাতাল ময়ূর ডাকে, ঘাস ইন্দ্রগোপে ভরা। আনন্দিত মৌমাছি, নতুন বৃষ্টিতে ক্ষতবিক্ষত পদ্মফুল ছেড়ে, তাজা কদম্ব ফুলের রেণু পান করছে। এভাবেই বর্ষার আনন্দে প্রকৃতি নবজীবনে মুখর, অরণ্য, নদী, পাহাড়, পশুপাখি সবাই নববর্ণে সেজে উঠেছে।