সুগ্রীব যখন তার পত্নী রুমাকে ফিরে পেলেন এবং রামচন্দ্রের আশীর্বাদে রাজ্য পুনরুদ্ধার করলেন, তখন তিনি দেবরাজের মতোই গৌরব ও সৌভাগ্য লাভ করলেন। এই মহৎ অভিষেকের সংবাদ রামকে জানানো হলো, এবং এরপর কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের সাতাশতম সর্গ শুরু হয়। সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হলে এবং বনরেরা গুহায় প্রবেশ করলে, রাম ও লক্ষ্মণ একত্রে প্রস্রবণ পর্বতে গেলেন। সে পর্বত ছিল বাঘ ও হরিণের ডাক-শব্দে মুখরিত, সিংহের ভয়ঙ্কর গর্জনে পরিবেষ্টিত, নানা ঝোপ-লতা ও ঘন বৃক্ষে আচ্ছাদিত। সেখানে ভালুক, লম্বা লেজওয়ালা বনর, বিড়াল—এদের আনাগোনা ছিল; মেঘমালার মতো সে পর্বত সর্বদা পবিত্র ও শুভ। পর্বতের শিখরে রাম ও সৌমিত্রি লক্ষ্মণ এক বিশাল, প্রশস্ত গুহায় বাস করতে লাগলেন। রাম, সুমহান রঘুবংশধর, সুগ্রীবের সঙ্গে চুক্তি করে লক্ষ্মণকে বললেন, ‘‘ভ্রাতা লক্ষ্মণ, এই গুহা মনোরম, প্রশস্ত ও বাতাস চলাচলের জন্য উপযুক্ত। এখানে, শত্রুনাশী সৌমিত্রি, বর্ষাকাল আমরা কাটাব; এই সুন্দর পর্বতশিখর সত্যিই চমৎকার, রাজপুত্র।’’ রাম আরও বললেন, ‘‘শ্বেত, কৃষ্ণ ও তাম্রবর্ণ শিলায় সাজানো, নানা খনিজে পূর্ণ, নদী ও ব্যাঙে সঙ্গতিপূর্ণ এই পর্বত। নানা জাতের বৃক্ষের ঝাঁক, রঙিন লতায় জড়ানো, নানা পাখির কলরবে মুখর, ময়ূরের ডাক-ধ্বনিতে মুখরিত। এখানে ফুটে আছে যূথিকা, কুন্দ, সিন্দুবার, শিরীষ, কদম্ব, অর্জুন ও সর্জ বৃক্ষ। এই মোহনীয় পদ্মপুকুর, ফুটন্ত পদ্মে শোভিত, আমাদের গুহা থেকে বেশি দূরে নয়, রাজপুত্র।’’ ‘‘পূর্বদিকে জলাভিমুখী গুহা উপযোগী, আর পশ্চিমে উঁচু ও নিরাপদ। গুহার দ্বারে, সৌমিত্রি, একটি সমতল, শুভ্র, লম্বা কৃষ্ণশিলা আছে, যেন বিভক্ত কাজলের স্তূপ। উত্তরে দেখো, পিতা, এক শিখর, যেন ভাঙা কৃষ্ণকাজলের মেঘমালা, বৃষ্টি-মেঘের মতো উঁচু। দক্ষিণে আছে আকাশের মতো শুভ্র, কৈলাসশৃঙ্গের মতো দীপ্ত, নানা খনিজে উজ্জ্বল পর্বত।’’ ‘‘গুহার ওপারে ত্রিকূটে প্রবহমান প্রাচীন নদী, কাদায় ঘন, যেন জানহবী। চন্দন, তিলক, শাল, তামাল, অতিমুক্তক, পদ্ম, সরল, অশোক বৃক্ষে শোভিত। বানীর, তিমিদ, বকুল, কেতকী, হিন্তাল, তিণিশ, নীপ, বেতস—এসব গাছের মালায় সাজানো। নদীতীরে নানা বৃক্ষের সমারোহ, যেন অলঙ্কারে সজ্জিতা নারী।’’ ‘‘শত শত পাখির ঝাঁকে মুখর, চক্রবাক পাখিতে শোভিত। মনোরম বালুচরে রাজহাঁস ও বক আসে, নদী যেন হাসছে, নানা রত্নে দীপ্ত। কোথাও নীলপদ্ম, কোথাও লাল পদ্ম, আবার কোথাও শুভ্র কুমুদ কুঁড়িতে শোভিত। শত শত ভাসমান পাখিতে পূর্ণ, ময়ূর-বকের ডাক-ধ্বনিতে মুখর, এই মোহনীয় নদী, সদাশান্ত ঋষিদের আশ্রয়।’’ ‘‘দেখো, চন্দনবৃক্ষের সারি, যেন সুবিন্যস্ত, শিখরগুলো পাশাপাশি, যেন মনে মনে সৃষ্টি হয়েছে। আহ, কত মনোরম এই স্থান, শত্রুনাশী! নিশ্চয়ই, সৌমিত্রি, আমরা এখানে আনন্দে ও শান্তিতে বাস করব। এখান থেকে কিষ্কিন্ধা দূরে নয়, আশ্চর্য বন, আর সুগ্রীবের মনোহর নগরী শীঘ্রই তোমার হবে, রাজপুত্র।’’ এদিকে, পত্নীকে ফিরে পেয়ে, বন্ধুদের পরিবেষ্টিত হয়ে, রাজ্য পেয়ে, বনরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সুগ্রীব অপার আনন্দে ভাসছিলেন। এইভাবে কথা বলে, রাঘব রাম লক্ষ্মণসহ সেই বহু গুহা ও প্রস্রবণযুক্ত পর্বতে অবস্থান করলেন। যদিও পর্বত মনোরম ও সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল, তবু রাম তাতে বিশেষ আনন্দ পেলেন না। কারণ, তার প্রাণাধিক প্রিয় সীতার স্মরণে, বিশেষত চাঁদ উঠলে, তার মন বিষাদে ভরে যেত। রাত্রে শুয়ে থাকলেও ঘুম আসত না, দুঃখ ও অশ্রুতে মন আচ্ছন্ন থাকত। লক্ষ্মণও সেই দুঃখ ভাগ করে নিতেন, আর শোকগ্রস্ত কাকুত্থস রামকে শান্ত-সান্ত্বনার কথা বললেন— ‘‘যথেষ্ট, বীর, এই দুঃখ আর নয়; তোমার শোক করা উচিত নয়। কারণ, শোক করলে সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তা তুমি জানো।’’ ‘‘তুমি কর্মনিষ্ঠ, দেবতাদের প্রতি একাগ্র, ধর্মপরায়ণ, দৃঢ়ব্রত, হে রাঘব। সংকল্প ছাড়া শত্রু জয় হয় না, বিশেষত সেই রাক্ষস। তুমি যুদ্ধবলে প্রতারক রাবণকে নিশ্চয়ই বধ করতে পারো।’’ ‘‘তোমার শোক দূর করো, সংকল্প দৃঢ় করো; তবেই তুমি সেই রাক্ষস ও তার বংশধরদের ধ্বংস করতে পারবে। হে কাকুত্থস, তুমি চাইলে এই পৃথিবী, তার সাগর, বন, পর্বতসহ উল্টে দিতে পারো—তাহলে রাবণই বা কী!’’ ‘‘বর্ষাকাল এসেছে, শরৎকাল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো; তখন তুমি রাবণ ও তার অনুসারীদের নিশ্চয়ই বধ করবে।’’ এভাবেই রাম ও লক্ষ্মণ সে মনোরম পর্বতে আশ্রয় নিলেন, সুগ্রীব রাজ্য ফিরে পেলেন, আর রাম সীতার শোকে বিহ্বল হয়ে, ভাইয়ের সান্ত্বনায় শক্তি সঞ্চয় করলেন।