একদিন, আমি সেই প্রশ্ন করেছিলাম, যা আজ তুমি জানতে চেয়েছো। তখন ব্রাহ্মণ কালিঙ্গক, যিনি পূর্বের এক মহর্ষির বচন স্মরণ করতেন, আমাকে সে কথা বলেছিলেন। তিনি জন্মান্তরের কথা মনে রাখতে পারতেন এবং আমায় এক মহাগুপ্ত কথা জানালেন—যম ও তাঁর দূতদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা তিনি বললেন। তিনি বললেন, একবার যম তাঁর নিজ দূতের দিকে, যাঁর হাতে ফাঁস ছিল, তাকিয়ে কানে কানে বললেন: ‘‘যারা মধুসূদনকে আশ্রয় করেছে, তাদের এড়িয়ে চলো। আমি অন্যদের অধিপতি, কিন্তু বিষ্ণুভক্তদের উপর আমার কোনো অধিকার নেই।’’ যম আরও বললেন, ‘‘আমি, যম, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার দ্বারা নিযুক্ত, যিনি দেবতাদেরও পূজিত, জগতের কল্যাণ ও অকল্যাণের জন্য। কিন্তু আমি স্বয়ং হরি ও তাঁর শিক্ষকদের অধীন, স্বাধীন নই—বিষ্ণু স্বয়ং আমার শক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করেন।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘যেমন সোনার নানান অলংকার—বালা, মুকুট, কুণ্ডল ইত্যাদি—তবু সবই এক, তেমনি হরি নানা রূপে—দেবতা, পশু, মানুষ ইত্যাদি—বর্ণিত হলেও, তিনি চিরকাল এক ও অভিন্ন।’’ ‘‘যেমন পৃথিবী, জল ও অণু সবশেষে একত্রিত হয়, তেমনি দেবতা, পশু, মানুষ ও অন্যান্য জীবগণও গুণ ও অশুদ্ধির চিরন্তন স্বভাবের দ্বারা পরিণামে একত্রিত হয়।’’ ‘‘যে সত্যিকারভাবে হরির পদপদ্মে নত হয়, যাঁকে দেবগণও পূজিত করেন, সে পাপবন্ধন হতে মুক্তি পায় এবং যেমন ঘৃত অগ্নিতে পড়লে মিলিয়ে যায়, তেমনি মোক্ষলাভ করে।’’ যমের এই কথা শুনে তাঁর ফাঁসধারী দূত বললেন, ‘‘বলুন, হে সকল প্রাণীর অধিপতি!’’ তখন যমের সে দূত ধর্মরাজকে বললেন, ‘‘যে হরির প্রতি যেমন ভক্ত, তার ফলও তেমনই।’’ ‘‘যিনি নিজের বর্ণধর্ম থেকে বিচ্যুত হন না, যাঁর মন বন্ধু-শত্রুতে সমান, যিনি কিছু চুরি বা হত্যা করেন না, যাঁর মন পবিত্র—তিনিই বিষ্ণুভক্ত।’’ ‘‘যাঁর আত্মা কলিযুগের অশুদ্ধি দ্বারা কলুষিত নয়, যাঁর নির্মল মন মোহে আবদ্ধ নয়, যিনি হৃদয়ে জনার্দনকে প্রতিষ্ঠা করেছেন—জানো, তিনি চিরকাল হরিভক্ত।’’ ‘‘যিনি অন্যের ধন, সে সোনা হলেও, তুচ্ছ মনে করেন, যিনি কেবল ভগবানের ভক্ত—তিনিই শ্রেষ্ঠ বিষ্ণুভক্ত।’’ ‘‘যেমন নির্মল পার্বতের সঙ্গে ঈর্ষা প্রভৃতি দোষের তুলনা চলে না, যেমন জ্বলন্ত অগ্নির তাপে শীতল চাঁদের কিরণ থাকতে পারে না, তেমনি ভক্তের মনে দোষ থাকে না।’’ ‘‘যিনি নির্মল, নির্লোভ, শান্ত, সদাচারী, সকল প্রাণীর বন্ধু, যিনি প্রিয় ও উপকারী বাক্য বলেন, অহংকার ও কপটতা মুক্ত—তাঁর হৃদয়ে সর্বদা বাসুদেব অবস্থান করেন।’’ ‘‘এমন ব্যক্তির হৃদয়ে চিরন্তন, কোমল রূপে জগতের অধীশ্বর বাস করেন। পৃথিবী বাহ্যিকভাবে মনোরম না হলেও, তাঁর অন্তরে আনন্দময় হয়ে ওঠে, যেমন কচি অঙ্কুর আকর্ষণীয়।’’ ‘‘হে বীর, দূর থেকে এড়িয়ে চলো তাদের, যাঁদের মন অপবিত্র, সংযম ও শৃঙ্খলা নেই, যাঁদের হৃদয় অবিনশ্বরের প্রতি আসক্ত নয়, যাঁরা অহংকার, দম্ভ ও ঈর্ষায় পূর্ণ।’’ ‘‘যদি অনাদি হরি, শঙ্খ ও গদাধারী, কারো হৃদয়ে অবস্থান করেন, সেখানে পাপ থাকতে পারে না, যেমন সূর্য থাকলে অন্ধকার থাকতে পারে না।’’ ‘‘যিনি অন্যের ধন চুরি করেন, প্রাণীহত্যা করেন, সর্বদা মিথ্যা বলেন—অসৎ সঙ্গের কারণে যাঁর মন অপবিত্র—তাঁর দুর্ভাগ্যের শেষ নেই।’’ ‘‘যিনি অন্যের সমৃদ্ধি সহ্য করতে পারেন না, নিন্দা করেন, অপবিত্র মন, সজ্জনদের প্রতি দুষ্ট আচরণ করেন, যজ্ঞ বা দান করেন না—তাঁর হৃদয়ে জনার্দন বাস করেন না।’’ ‘‘যিনি আত্মীয়, স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা, দাস-দাসীর প্রতি অত্যাধিক আসক্ত, যাঁর মন কপট ও অর্থলোভী—জানো, তিনি অধম, ভক্ত নন।’’ ‘‘যাঁর মন দুষ্ট, অধর্মে আসক্ত, সর্বদা অসৎ সঙ্গের দ্বারা মাতাল, প্রতিদিন পাপে নিজেকে আবদ্ধ করেন—তিনি পশুর মতো, বাসুদেবভক্ত নন।’’ ‘‘যাঁর অটল ভাবনা—‘সবই, এমনকি আমি নিজেও বাসুদেব, সর্বোচ্চ পবিত্র, একমাত্র ঈশ্বর’—এমন উপলব্ধি যার হৃদয়ে জাগে, তার কাছে যাও, অন্যদের দূরে রাখো।’’ ‘‘হে পদ্মনয়ন বাসুদেব, বিষ্ণু, ধরাধার, অবিনশ্বর, শঙ্খ-চক্রধারী! যারা বলে, ‘আমার আশ্রয় হোন’—হে বীর, তাদের মধ্যে পাপী হলে দূর থেকে এড়িয়ে চলো।’’ ‘‘যাঁর হৃদয়ে অবিনশ্বর আত্মা বাস করেন, সেই শ্রেষ্ঠ মানব—তাঁর দৃষ্টিতেই, হে চক্রধারী, তোমার পথ বা আমার পথ; তাঁকে কারও শক্তি বা বল জয় করতে পারে না।’’ ‘‘এভাবেই, তোমার আদেশ পালনের জন্য, হে দেব, সূর্যপুত্র ধর্মরাজ এই কথা বলেছিলেন। তিনি যা আমায় বলেছিলেন, তাই আমি তোমাকে যথাযথভাবে বললাম, হে কুরুশ্রেষ্ঠ।’’ ‘‘এ কথা পূর্বে আমায় বলেছিলেন দ্বিজাতি নকুল, যিনি কলিঙ্গদেশ থেকে এসেছিলেন, মহামান্য ও সন্তুষ্ট চিত্তে।’’ ‘‘তুমি যেমন জানতে চেয়েছিলে, তেমনই আমি তোমাকে বললাম, প্রিয় সন্তান; কারণ বিষ্ণু ছাড়া সংসার-সমুদ্রে আর কোনো আশ্রয় নেই।’’ ‘‘যাঁর আত্মা সদা কেশবের আশ্রয়ে, তাঁর ওপর যমের দূত, ফাঁস, দণ্ড, ঘোড়া, এমনকি যম নিজেও, কোনো শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না।’’ এখানে মৈত্রেয় প্রশ্ন করলেন, ‘‘হে মহর্ষি, যাঁরা সংসার পার হতে চান, তাঁরা বিশ্বনাথ বিষ্ণুকে কিভাবে পূজা করেন, তা বুঝিয়ে বলুন।’’ ‘‘আর, হে মহামুনি, আমি জানতে চাই, যারা গোবিন্দের পূজায় নিবেদিত, তারা কী ফল লাভ করে?’’ শ্রীপরাশর বললেন, ‘‘তুমি যা জানতে চেয়েছো, একদিন মহারাজ সগরও তাই জানতে চেয়েছিলেন; শুনো, তখন ঔর্ব কী উত্তর দিয়েছিলেন।’’ সগর, ভৃগুবংশীয় ঔর্ব মুনিকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলেন—‘‘বিষ্ণুর পূজার উপায় ও সম্পর্ক কী?’’ তিনি আরও জানতে চাইলেন, ‘‘বিষ্ণুর পূজায় মানুষ কী ফল পায়?’’ তখন ঔর্ব, আন্তরিকভাবে প্রশ্ন পেয়ে, উত্তর দিলেন—শুনো তিনি কী বললেন। ঔর্ব বললেন, ‘‘বিষ্ণুর পূজায় পৃথিবীতে কাম্য বস্তু, স্বর্গ, স্বর্গীয় সুখভোগ, এমনকি সর্বোচ্চ মোক্ষও লাভ হয়।’’ ‘‘যে যে ফল চায় এবং যতটা চায়, অচ্যুতের পূজায়, হে রাজন, তা-ই লাভ হয়—ছোট হোক বা বড়।’’ ‘‘তুমি জানতে চেয়েছো, হরি কিভাবে পূজিত হন—সব বলব; মনোযোগ দিয়ে শোনো।’’ ‘‘বর্ণ ও আশ্রমের কর্তব্য পালনকারীই পরম পুরুষকে পূজা করতে পারে; এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তিনি সন্তুষ্ট হন না।’’ ‘‘যজ্ঞ, স্তোত্রপাঠ, জপ, শত্রু দমন ও অন্যকে কষ্ট দেওয়া—সবই হরির পূজা, কারণ তিনি সকল জীবের আত্মা।’’ ‘‘অতএব, সদাচারী ব্যক্তি যেন নিজের বর্ণধর্ম পালন করেই জনার্দনকে পূজা করেন।’’ ‘‘ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র—যে-ই হোক, হে ভূপতি, নিজের নির্ধারিত কর্তব্যে নিবেদিত হয়ে বিষ্ণুকে পূজা করে, অন্যভাবে নয়।’’ ‘‘যিনি নিন্দা, কুৎসা বা মিথ্যা বলেন না, এবং কারও অশান্তির কারণ হন না—কেশব তেমন ব্যক্তিতে সন্তুষ্ট হন।’’ এভাবেই, মহর্ষি ঔর্বের বচন অনুযায়ী, বিষ্ণুভক্তি ও পূজার মাহাত্ম্য, প্রকৃত ভক্ত ও অধমের চিহ্ন, যম-ধর্মরাজের বাণী, এবং ভক্তের পরম গতি সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়।