পরাশর ঋষি মৈত্রেয়কে বললেন, ‘‘রুদ্রের পুত্র সাভর্ণি দ্বাদশ মনু হবেন; তাঁর যুগে ঋতুধামা দেবরাজ ইন্দ্র হবেন। ব্রাহ্মণ, শুনো, তখনকার দেবতাদের নাম। তখন পাঁচটি দেবগোষ্ঠী থাকবে—হরিতা, রোহিতা, সুমনস, সুকর্মা, ও সুরাপা—প্রতিটি গোষ্ঠীর সদস্য দশজন করে। সাত ঋষি হবেন—তাপস্বী, সুতপস, তাপোমূর্তি, তাপোরতি, তাপোধৃতি, দ্যুতি এবং তাপোধন। এবার শুনো, তাঁর পুত্রদের নাম—দেববান, উপদেব, দেবশ্রেষ্ঠ এবং আরও অনেকে; এঁরা সকলেই ঐ মনুর সন্তান, এবং শক্তিশালী রাজা হবেন। এরপর পরাশর বললেন, ‘‘ত্রয়োদশ মনুর নাম হবে রুচি। তখন দেবতারা হবে—সূত্রামান, সুকর্মা, সুধর্মা ও অমরা—তেত্রিশটি দেবগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে দিবসের অধিপতি, শক্তিতে পরাক্রমশালী, ইন্দ্র হবেন। সাত ঋষি হবেন—একজন বিভ্রমহীন, সত্যদর্শী, অচঞ্চল, আকাঙ্ক্ষাহীন, স্থির ও অবিনশ্বর; অপরজন সুতপা ঋষি, সপ্তম ঋষি। এবার শুনো, তাঁর পুত্রদের নাম—চিত্রসেন, বিচিত্র এবং আরও অনেকে, এঁরা সকলেই পৃথিবীর রাজা হবেন। মৈত্রেয়কে আবার বলা হয়, ‘‘চতুর্দশ মনুর নাম হবে ‘মনু’ই; ইন্দ্র হবেন শুদ্ধ, এবং দেবতারা পাঁচটি গোষ্ঠী—চাক্ষুষ, পবিত্র, কনিষ্ঠ, ভ্রাজিক ও বাকবৃদ্ধ। সাত ঋষি হবেন—অগ্নিবাহু, শুচি, শুক্র, মাগধ, অগ্নিধ্র, যুক্ত, ও জিত। এবার শুনো, ঐ মনুর পুত্রদের নাম—ঊরুগ, গম্ভীর, বুদ্ধি ও আরও অনেকে; এঁরা সকলেই পৃথিবী শাসন করবেন। পরাশর বলেন, ‘‘যখন চতুর্যুগের শেষে বেদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়, তখন সাত ঋষি স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নেমে এসে বেদসমূহ পুনরায় প্রচলন করেন। প্রতিটি যুগের শুরুতে, মনু জন্মগ্রহণ করেন ধর্মের প্রচারক হিসেবে; দেবতারা যাঁরা যজ্ঞে অংশ নেন, তাঁরা মন্বন্তরের অবধি থাকেন। যতদিন মনুর সন্তান ও তাঁদের বংশধররা থাকেন, ততদিন পৃথিবী তাঁদের দ্বারা রক্ষা পায়। মনু, সাত ঋষি, দেবতা, রাজা—যাঁরা মনুর সন্তান—এঁরা সকলেই এক একটি মন্বন্তরে থাকেন, এবং ইন্দ্র তাঁদের মধ্যে প্রধান। এইভাবে চৌদ্দটি মন্বন্তর পার হলে এক পূর্ণ কল্প শেষ হয়, যা হাজার যুগের সমান। পরাশর আরও বলেন, ‘‘এই সময়ের সমানই রাত হয়; তখন ব্রহ্মার রূপ ধারণ করে তিনি ‘শেষ’ নামে জলে শয়ান হন। তখন তিনি তিনটি বিশ্ব গিলে ফেলেন, এবং স্বীয় মায়ায় অবস্থান করেন; জনার্দন, সব সৃষ্টির উৎস, নিজের মধ্যে থাকেন। তারপর, যখন সেই ভগবান আবার জাগেন, ঠিক পূর্বের মতো আবারও অবিনশ্বর, রজোগুণী ভগবান প্রতিটি কল্পে বিশ্ব সৃষ্টি করেন। মনু, রাজা, ইন্দ্র, দেবতা, সাত ঋষি—এঁরা সকলেই সত্ত্বগুণের অংশ, এবং পৃথিবীকে রক্ষা করেন। সেই বিষ্ণু, যাঁর কার্য বিশ্ব রক্ষা, তিনি চতুর্যুগের ধারাবাহিকতা স্থাপন করেন। কৃতযুগে তিনি কপিল ও অন্যান্য রূপে সকলের কল্যাণে সর্বোচ্চ জ্ঞান প্রদান করেন। ত্রেতাযুগে তিনি বিশ্বচক্রবর্তী রূপে তিনটি বিশ্ব রক্ষা করেন, দুষ্টদের দমন করেন। দ্বাপরযুগে তিনি ব্যাসরূপে এক বেদকে চার ভাগে বিভক্ত করেন, এবং আরও শত শত শাখায় বিস্তৃত করেন। দ্বাপরযুগে বেদ বিতরণ শেষে, কলিযুগের শেষে হরি কল্কিরূপে অধর্মীদের জন্য পথ স্থাপন করেন। এভাবে অসীম আত্মা চিরকাল বিশ্ব সৃষ্টি, রক্ষা ও সংহার করেন; তাঁর ঊর্ধ্বে কিছু নেই। পরাশর বলেন, ‘‘ব্রাহ্মণ, সকল জীবের—অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—সত্তার কথা এখানে ও অন্যত্র তোমাকে বলা হয়েছে। আমি তোমাকে সব মন্বন্তর ও তাদের শাসকদের কথা বলেছি; আর কী বলব?’’ তখন মৈত্রেয় বললেন, ‘‘আপনার কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি, এই বিশ্বই বিষ্ণু, বিষ্ণুর মধ্যে, এবং বিষ্ণু থেকে; তাঁর বাইরে কিছুই নেই। আমি জানতে চাই, কীভাবে মহান আত্মা, ব্যাসরূপে, প্রতিটি যুগে বেদ বিভাজন করেন। প্রতিটি যুগে কে ছিলেন ব্যাস, মহর্ষি? তাঁদের কথা এবং শাখা বিভাজনের কথা বলুন।’’ পরাশর বললেন, ‘‘মৈত্রেয়, বেদ ও তার শাখার বিভাজন অসংখ্যবার হয়েছে; আমি বিস্তারিত বলতে অক্ষম, সংক্ষেপে শুনো। প্রতিটি দ্বাপরযুগে বিষ্ণু ব্যাসরূপে এক বেদকে বহু ভাগে বিভক্ত করেন, সকলের কল্যাণে। মানুষের শক্তি, বল ও সামর্থ্য কমে যাওয়ায় তিনি বেদ বিভাজন করেন। যে শরীরে তিনি বেদ পৃথক করেন, সেই রূপে মধুর শত্রু ‘বেদব্যাস’ নামে পরিচিত হন। যে মন্বন্তরে যে ব্যাস ছিলেন, তাদের কথা এবং কীভাবে শাখা বিভাজন হয়, শুনো। বৈবস্বত মন্বন্তরের দ্বাপরযুগে ঋষিরা বেদকে আটাশবার বিভক্ত করেছেন। সেই আটাশজন বেদব্যাস, যাঁরা প্রতিটি দ্বাপরে বেদকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন, তাঁদের নাম শুনো।’’ এভাবেই পরাশর ঋষি মৈত্রেয়কে মন্বন্তর, দেবতা, ঋষি, রাজা, এবং বেদব্যাসের মহান কাহিনি শোনালেন—যুগে যুগে, কল্পে কল্পে, বিশ্বরক্ষার জন্য বিষ্ণুর অবিরাম কর্মের কথা।