একদিন এক জ্ঞানী মহর্ষি তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ ও পূর্বপুরুষ-পূজার গভীর রহস্য ও বিধানসমূহ বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, ‘‘দেখো, যদি দানগ্রহীতা একচোখো হয়, তবে ষাটজন দাতার ফল নষ্ট হয়; যদি হিজড়া হয়, একশো জনের ফল নষ্ট হয়; কুষ্ঠরোগীকে দেখলে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ ফল নষ্ট হয়; আর যদি সে মহাভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হয়, তবে সহস্র দাতার ফল বিনষ্ট হয়।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘যদি দাতা নির্বোধ হন, তবে তাঁর পুণ্যফল নষ্ট হয়; আবার কেউ যদি মাথা ঢেকে বা দক্ষিণ দিকে মুখ করে আহার করেন, তাঁরও ফল নষ্ট হয়। যারা জুতো পরে আহার করেন, কিংবা অবমাননা করে দান করেন, তাঁদের সেই দান অসুরপতি নিজের অংশ বলে নিয়ে নেন।’’ ‘‘শ্রাদ্ধের সময় কুকুর ও রাক্ষসদের কখনোই উপস্থিত থাকতে দেওয়া উচিত নয়। তাই, তিল ছিটিয়ে চারপাশে এক সুরক্ষা-বৃত্ত তৈরি করতে হয়। কারণ, তিল রাক্ষসদের বলে মনে করা হয়, আর বৃত্ত কুকুরদের। শূকর দৃষ্টিতে এই অনুষ্ঠান নষ্ট করে, আবার মোরগ পক্ষপাত করলে ফল নষ্ট হয়।’’ ‘‘মাসিকরত নারীর সংস্পর্শে, ক্রোধে, বা কেবল বন্ধুর তাগিদে দান করলে, দেবতা বা পিতৃপুরুষ সন্তুষ্ট হন না এবং স্বর্গও লাভ হয় না।’’ ‘‘তবে নদীর তীরে, জলধারায়, সরোবরে কিংবা নির্জন স্থানে দান করলে, পিতৃপুরুষেরা বিশেষভাবে সন্তুষ্ট হন। সেই সময় অশ্রুপাত, কটু বাক্য বা পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা একেবারেই উচিত নয়।’’ ‘‘বাঁ হাতে কুশ ধারণ করে নির্দিষ্ট নিয়মে শ্রাদ্ধকর্ম করলে, পিতৃপুরুষেরা প্রকৃত সন্তুষ্ট হন। অনুমতি-সংক্রান্ত আচার থেকে শুরু করে, ব্রাহ্মণদের অগ্নিতে দান করতে হয় বিধি মেনে; আর পিতৃপুরুষদের জন্য দান মাটিতে, শূরপা বা কুশাশনে রাখতে হয়।’’ ‘‘শুভ পক্ষের পূর্বার্ধে, অর্থাৎ সকালবেলায় শ্রাদ্ধ করা উচিত; কৃষ্ণপক্ষ হলে বিকেলে। রোহিণী নক্ষত্রের নিয়ম লঙ্ঘন করা অনুচিত।’’ ‘‘এই মহাত্মা পূর্বপুরুষেরা, যাঁরা মহান যোগ ও শক্তিতে সম্পন্ন, স্থান ও কালের যথাযথ উপলব্ধিকারী—তাঁদের সর্বদা পূজা করা উচিত। তাঁদের প্রতি নিরন্তর ভক্তি রাখলে সর্বোচ্চ যোগ লাভ হয়; ধ্যানের দ্বারা তারা মুক্তি লাভ করেন, পাপ-পুণ্য উভয়কেই ছেড়ে দিয়ে।’’ ‘‘এক সময় মহান আত্মা কশ্যপ যজ্ঞের জন্য গোপন যোগ প্রত্যাহার করে এক গুহায় লুকিয়ে রাখেন। তখন যোগজ্ঞদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সনৎকুমার সেই গোপন অমৃত ও সর্বোচ্চ যোগ প্রকাশ করে চিরন্তন ধর্ম ঘোষণা করেন।’’ ‘‘এটি দেবতাদের গোপনতম রহস্য ও ঋষিদের চরম লক্ষ্য—পূর্বপুরুষ-ভক্তির দ্বারা, চেষ্টার দ্বারা সর্বদা অর্জনীয়। এই যোগ সংক্ষেপে, পিতৃভক্ত ব্যক্তি চেষ্টার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে লাভ করতে পারেন; এতে সন্দেহ নেই যে সমস্ত কিছু এতে প্রাপ্ত হয়।’’ ‘‘কাদের শ্রাদ্ধে দান করা উচিত, কোন দান মহাফলদায়ক, কোথায় শ্রাদ্ধ অক্ষয় হয়—তীর্থ, নদী, স্বর্গলাভ—সবই সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’’ তখন বৃহস্পতি বললেন, ‘‘যে ব্যক্তি এই শ্রাদ্ধবিধান শুনে ঈর্ষা পোষণ করে, সে অন্ধকারে আচ্ছাদিত হয়ে ভয়ঙ্কর নাস্তিক-নরকে পতিত হয়। আর যে ব্যক্তি গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলেও সংযতচিত্ত ও আশ্রমধর্ম থেকে মুক্ত, সে কুম্ভীপাক নরকে যায় না; কিন্তু যারা জিহ্বা কেটে দেয় বা চুরি করে, তারা নিশ্চয়ই সেখানে যায়।’’ ‘‘যারা যোগের বিরোধী, তারা মাটির ঢেলার মতো হয়ে মহাসমুদ্রে ডুবে থাকে যতদিন পৃথিবী টিকে থাকে। তাই, বিশ্বস্ত ব্যক্তির সর্বদা শ্রাদ্ধধর্ম পালন করা উচিত। কারো নিন্দা করা উচিত নয়, বিশেষত যোগিদের নয়; নিন্দাকারী কৃমি হয়ে ঘুরে বেড়ায়।’’ ‘‘যে ব্যক্তি মুক্তির জন্য নির্ধারিত যোগের নিন্দা করে, সে ভয়ঙ্কর নরকে যায়, এবং শ্রোতাও যায়—এতে সন্দেহ নেই। নরকের সমস্ত স্থান ভয়ানক ও অন্ধকারে ঢাকা; যোগপতিদের নিন্দা করলে সেখানে গমন অবশ্যম্ভাবী।’’ ‘‘যে ব্যক্তি সংযতাত্মা যোগপতিদের নিন্দা শোনে, সেও দীর্ঘকাল কুম্ভীপাক নরকে ডুবে থাকে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। মন, কর্ম বা বাক্যে যোগিদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা উচিত নয়; মৃত্যুর পরে ও এই জন্মেও তার ফল ভোগ করতে হয়—এ নিয়ে সন্দেহ নেই।’’ ‘‘যে ব্যক্তি পারাপারের ওপারে পৌঁছাতে পারে না, সে পরমাত্মা পায় না; তিনিই তিন জগতে নিজের কর্মানুসারে ঘোরেন। এমনকি যিনি ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও তাদের অঙ্গ শিখেছেন, কিন্তু রূপান্তর লাভ করেননি, তিনিও আটকে থাকেন।’’ ‘‘যিনি পরিবর্তনের ওপারে, প্রকৃতির ওপারে, তিন গুণ ও চব্বিশ তত্ত্বের সীমার ওপারে পৌঁছান, তিনিই প্রকৃত পারাপারী, যাত্রার শেষপ্রান্তে পৌঁছান। যেমন সমস্ত উপাদান আত্মায় বিলীন হয়, তেমনি যোগজ্ঞ স্বয়ং যোগশক্তিতে সবকিছু আত্মায় লীন করেন; তিনি সর্বব্যাপী শক্তির পথে চলেন, অন্যের নাগালের বাইরে।’’ ‘‘যিনি যোগজ্ঞ, যিনি প্রকৃতপক্ষে বেদ জানেন ও জানার বিষয় অর্জন করেন, তাঁকে বেদজ্ঞরা সত্যিকারের বেদজ্ঞ বলেন, তিনিই বেদের পারাপারী। যথাযথ পদ্ধতিতে জানার ও বোঝার বিষয় উপলব্ধি করেন যিনি, তাঁকেই বেদজ্ঞরা বেদজ্ঞ বলে স্বীকার করেন।’’ ‘‘তিনি যজ্ঞ, বেদ, কামনা, নানা জ্ঞান, দীর্ঘায়ু, সন্তান, পিতৃভক্তি ও ধন লাভ করেন। যে ব্যক্তি শ্রাদ্ধবিধির শেষ অংশ নিয়মিত পাঠ করেন, সে এই সব ফল এবং তীর্থে দানের ফলও পায়।’’ ‘‘তিনি বংশশুদ্ধিকারী ও দ্বিজদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত হন; এবং সকল দ্বিজকে শিক্ষা দিলে সমস্ত অভীষ্টলাভ করেন। আর যে ব্যক্তি সর্বদা এই অশেষ কাহিনী শ্রবণ করেন—যদি তিনি ঈর্ষাহীন, ক্রোধজয়ী, লোভ ও মোহবর্জিত হন—তবে তিনি স্বর্গলাভ করেন।’’ ‘‘তিনি তীর্থযাত্রা, দান ইত্যাদির সম্পূর্ণ ফল লাভ করেন; এটি মুক্তির শ্রেষ্ঠ উপায় ও স্বর্গলাভের সর্বোচ্চ উপায়; এই জন্ম ও পরজন্মে চরম সন্তুষ্টি লাভ হয়। তাই, সর্বদা সাধনা করা উচিত।’’ ‘‘যে ব্যক্তি মনোযোগ ও একাগ্রতায় এই শ্রাদ্ধবিধি সভায় বা পুণ্যকালে পাঠ করেন, সে সন্তানপ্রাপ্ত, পরম দীপ্তিসম্পন্ন ও দেবলোকপ্রাপ্ত হন।’’ ‘‘স্বয়ম্ভূর প্রতি, যিনি এই বিধান ঘোষণা করেছেন, আমি প্রণাম জানাই; এবং সর্বদা মহান যোগপতিদেরও প্রণাম করি।’’ ‘‘এইভাবে, প্রিয়জন, পূর্বপুরুষগণ দেবতাদেরও দেবতা; এই সাতজন সর্বদা নিরুদ্বেগ, নিজ নিজ স্থানে বিরাজমান। এঁরা প্রজাপতির পুত্র, সকলেই মহাত্মা; প্রথম গোষ্ঠী যোগী, চিরন্তন ও যোগে সদা উন্নত।