একবার এক পাপী আত্মা মৃত্যুর পরে যমলোকের পথে যাত্রা করল। সে এক ভয়ংকর হ্রদের কাছে পৌঁছাল, যেখানে অসংখ্য মাছ সবকিছু গিলে ফেলে। একটু এগিয়ে গেলে, সে যন্ত্রণা অনুভব করার জন্য সেখানে পতিত হয়। বসে থাকুক, বেরিয়ে পড়ুক কিংবা দৌড়াক—যেন তার মাথার ওপরেই বিপদ ঘনিয়ে আসে। সেখানে এক মল-গহ্বর আছে, আর আছে সেই ভয়ানক কুম্ভীপাক নরক। সেখানে দানবেরা তাদের ধারালো নখ দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে ফেলে। সেখানে আছে তরবারির পাতা-সমৃদ্ধ বন, আবার আছে সূঁচালো কাঁটার বন। এই পথে সে দগ্ধ হয়, কাটা পড়ে, বিদ্ধ হয়, আর ভেঙে যায়। সেখানে কালো আর চিতাবাঘের মতো কুকুর ঘুরে বেড়ায়, তারা ভয়ংকর ও কাছে যাওয়া অসম্ভব। আর আছে সিমুল গাছ, যার গায়ে অসংখ্য কাঁটা, সেই গাছও শত্রুর মতো। এই পাপীর যত কষ্ট ও দুর্দশা—সবই তার জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ যদি ঠান্ডা চায়, সে পায় উত্তাপ; কেউ যদি গরম চায়, সে পায় শীত। হাজার হাজার বার, শত শত টুকরোয় কেটে ফেলা হয় তাকে। সেখানে এক ভয়ানক নদী আছে, যার জল আর ভয়ঙ্কর সাপে পূর্ণ। এই নদীকে বলে করম্ভা-স্যান্ড, যা একশো যোজনজুড়ে বিস্তৃত। এরপর আসে মহা নদী বৈতরণী, যার জল লবণাক্ত। সেখানে কাদা এত গভীর যে, তা চামড়া, মাংস ও হাড় ভেঙে দেয়। সেখানে ধনুকের মতো লম্বা পেঁচা, যাদের জিহ্বা হীরার মতো শক্ত, তারা হাড় ভেঙে দেয়। কষ্টে-সষ্টে সেই যোজনজুড়ে কাদার পথ পার হলে, অসংখ্য ইঁদুর তাকে নানা ভাবে খেয়ে ফেলে। সকালে বাতাসের স্পর্শে সে আবার মাংস ফিরে পায়। এরপর সে পৌঁছায় এক ভয়ানক আমবনে, যেখানে নানা পাখি বাস করে। এই আত্মা তখন শিরা-জাল, চোখ কিংবা কান ছাড়াই থাকে। সেই বনটি সন্ধ্যা মেঘের মতো সর্বদা জ্বলজ্বল করে। এই স্থানকে বলে যমের চুল্লি, যার গভীরতা তিন যোজন। সেখানে হাজার হাজার, এমনকি কোটি কোটি মৃত আত্মা জড়ো হয়েছে। সবাই চুল্লির পেটে এসে বিশ্রাম নেয়, আর সেই প্রবল স্রোত তাদের নিয়ে চলে যায়। প্রতিটি স্থানই আগের মতোই ভয়ংকর ও পার হওয়া কঠিন, নিজ নিজ ক্রমে। সেখানে দশটি কাঁটাযুক্ত লতা আর তেরোটি ফুটন্ত দণ্ডের কড়াই আছে। সেখানে সর্বত্র নির্দয় রাক্ষসেরা ঘুরে বেড়ায়, তাদের দর্শনই ভয়ের। শুকনো কুয়ো আর ধোঁয়ার মধ্যে সে উল্টে ঝুলে থাকে। আবার মল-গহ্বরে সে চর্বির আগুনে সিদ্ধ হয়। তিন যোজনজুড়ে তার জন্য সাত ধরনের যন্ত্রণা আছে। এইসব পার হয়ে, দগ্ধ ও অজ্ঞান অবস্থায়, সে পৌঁছায় এক সুন্দর পুকুরে, যেখানে ঠান্ডা জল আর শীতল বনভূমি। সেখানে সব পাপী নানা খাদ্য ও সুস্বাদু দ্রব্য পায়। এরপর আসে শূলবহ পর্বত, যার উচ্চতা একশো যোজন। সেখানে মেঘ বর্ষণ করে, আর সর্বদা ফুটন্ত জল পড়ে। এরপর তার সামনে আসে শৃঙ্গারক বনের শোভা, যেখানে সবুজ তৃণভূমি দেখা যায়। সেখানে কেউ স্পর্শ বা দংশন করলে, সে কৃমি হয়ে যায়। এই সব পার হয়ে, আবারও তার জন্য প্রস্তুত এক নতুন যন্ত্রণা অপেক্ষা করে। এভাবেই পাপী আত্মার যাত্রা একের পর এক কষ্টের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে, যমলোকের পথে।