সেই স্থানে, অসংখ্য পাপী ব্যক্তি দুঃখভোগ করছে—তাদের মাঝখানে যেন নিরন্তর যন্ত্রণা। চারপাশে হাড় ও পাথরের ঝড়, রক্তের মেঘ ছড়িয়ে আছে। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ সাঁতরাচ্ছে, কেউ চিৎকার করছে—“হায়, আমি মরে যাচ্ছি!” তাদের কান্না আর বিলাপের শব্দে সমস্ত দিক ভরে উঠেছে। কেউ কেউ মোটা দড়িতে বাঁধা, কেউ আবার নানা রকমভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। এমন সব দৃশ্য দেখা গেল, যা মনে রাখলে মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠবে। এভাবেই শ্রী বরাহ পুরাণের একশো নিরানব্বইতম অধ্যায় শেষ হয়, যেখানে সংসারের চক্রে যন্ত্রণার নানা রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আবার শুরু হল নরকের যন্ত্রণার বিবরণ। সেখানে আছে উত্তপ্ত ও অতিশয় উত্তপ্ত নরক—মহারৌরব ও রৌরব। আছে অন্ধকার নামক নরক, আবার অন্ধকারের চেয়েও গভীর এক নরক। প্রথমটিতে একমাত্র অন্ধকার, দ্বিতীয়টিতে দ্বিগুণ অন্ধকার। পঞ্চম নরকে পাঁচগুণ যন্ত্রণা, ষষ্ঠতে ছয়গুণ। একদিন ও একরাত্রিতে মৃতরা সেই শহরের পথে পৌঁছে যায়। এখানে শুধু দুঃখ, কোনো সুখ নেই; দুঃখের ওপর আরও দুঃখ এসে যোগ হয়। মৃত ব্যক্তিরা এখানে মুক্ত হয়, কিন্তু মৃত্যুর দূতরা এখানে খুবই কম। এখানে কারো জন্য কোনো সুখ নেই; কিছুই নেই। ভূমি জুড়ে রয়েছে গরম ও ধারালো লোহার কাঁটা। এখানে ক্ষুধা অত্যন্ত তীব্র, তৃষ্ণাও অসহনীয়। যখন কেউ পানি পান করতে চায়, তখন দানবরা তাকে একটি হ্রদের দিকে নিয়ে যায়। পানির আশায় সে দৌড়ে যায়। তখন দানবরা রান্না করা মাংস এনে দেয়। সেই হ্রদে বহু মাছ সবকিছু খেয়ে ফেলে। একটু এগোলে, যন্ত্রণা ভোগের জন্য তারা পড়ে যায়। বসে থাকুক, চলুক, দৌড়াক—যন্ত্রণা যেন সবসময় তাদের মাথার ওপর। এখানে রয়েছে বিষ্ঠার গর্ত এবং ভয়ঙ্কর কুম্ভীপাক নরক। দানবরা তাদের ধারালো নখ দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে ফেলে। আছে তলোয়ার-পাতার বন, আছে সূঁচালো কাঁটার বনও। পথে তারা পুড়ে যায়, কাটা যায়, বিদ্ধ হয়, ভাঙে। এখানে রয়েছে কালো ও ছোপ ছোপ দাগের কুকুর, যারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও কাছে যাওয়া কঠিন। আছে রেশম-কটন গাছ, যা কাঁটা দিয়ে ভরা এবং শত্রুতাপূর্ণ। এইসব দুঃখ ও বিপদ সেই কু-মনস্ক ব্যক্তির জন্য। কেউ ঠাণ্ডা চাইলে গরম দেওয়া হয়, কেউ গরম চাইলে ঠাণ্ডা দেওয়া হয়। হাজারে হাজারে, শত শত টুকরো করে কেটে ফেলা হয় তাদের। আছে এক ভয়ঙ্কর নদী—জলে ভরা, ভীতিপ্রদ সাপের দ্বারা পূর্ণ। তার নাম করম্ভা-স্যান্ড, যা একশো যোজন বিস্তৃত। এরপর আসে মহা নদী, ভৈতরণী, লবণাক্ত জলে পূর্ণ। সেখানে কাদার স্তর এত গভীর যে ত্বক, মাংস, হাড় ভেঙে যায়। ধনুকের সমান বড় পেঁচা, হীরার মতো জিহ্বা দিয়ে হাড় ভেঙে ফেলে। সেই যোজনজুড়ে কাদার মধ্য দিয়ে কষ্টে পার হয়ে গেলে, অসংখ্য ইঁদুর নানা ভাবে দেহকে খেয়ে ফেলে। সকালবেলা বাতাসের ছোঁয়ায় তার দেহ আবার ফিরে আসে। এইভাবেই, বরাহ পুরাণে নরকের যন্ত্রণার নানা রূপের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যা শুনলে ও মনে রাখলে মানুষের অন্তর কেঁপে ওঠে।