সেই নদীর জলে ছিল অপূর্ব রমণীরা, সুদৃশ্য কটিবন্ধনে সজ্জিতা, যারা ইচ্ছামতো যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারে। তারা তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে নদীর জলে আনন্দে খেলাধুলা করত। জলযন্ত্রের মধুর শব্দ ও অলংকারের ঝঙ্কারে পরিবেশ মুখরিত হত। এই শুভ্র ও মনোমুগ্ধকর নদীর নাম বৈবস্বতী, যা সকল নদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক আনন্দময়। বৈবস্বতী নদী যেমন তার জলে সুন্দর, তেমনি সর্বদা দিব্য ও মোহময় জলে পূর্ণ। নদীটি অলংকৃত ছিল চমৎকার রথাঙ্গ পদ্মে, যার স্বর্ণাভ গর্ভ molten gold-এর মতো দীপ্তিমান। এর জল পবিত্র, সুগন্ধি, মধুর, স্বচ্ছ এবং সত্যিই অমৃতের মতো। এখানে মনোরম রূপে বিভোর হয়ে সুন্দরী নারীরা আনন্দে খেলত। এই নদী দেবতা, তপস্যায় সিদ্ধ ঋষি ও সাধুদেরও পূজনীয়। অনেক মানুষ এখানে জলদান করেছে, আর এই নদীর প্রকৃত স্বরূপই তার সারবত্তা। নদীর তীরে নারীরা সর্বদা একত্রে সংগীত গায়, বাজনার তালে তালে তাদের সুমধুর কণ্ঠ পরিবেশ ভরিয়ে তোলে। তাদের মনোরম রূপ ও সুরের মাধুর্যে স্বর্গের দেবতারা আনন্দে পরিপূর্ণ হয়। রাজপ্রাসাদের উদ্যানগুলোয় তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে আনন্দ উপভোগ করে, কখনো ক্লান্ত হয় না। কখনো কখনো মধুর সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, রাজপ্রাসাদের করিডর ও পথঘাটে সেই সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে। অন্যত্র, কেউ কেউ তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে সোনার মঞ্চে খেলায় মগ্ন থাকে। এই আনন্দের পরিমাণ বহু দিন ধরে বললেও সম্পূর্ণ বলা যায় না। এভাবেই ‘ধর্মরাজের নগরীর বর্ণনা’ নামে বৈভবশালী বরাহ পুরাণের একশো ছিয়ানব্বই নম্বর অধ্যায় শেষ হল। ঋষিপুত্র বললেন— সেই নগরী ছিল প্রাচীরবেষ্টিত এবং শত শত প্রাসাদে সজ্জিত। মনে হত যেন আকাশকেই খনন করে তার মধ্যে দীপ্তি ছড়ানো হয়েছে। নানারকম বাদ্যযন্ত্রে মুখরিত ছিল, আর চারিদিকে অগ্নিমাল্য ঘিরে রেখেছিল। সেখানে ধর্মানুশীলনকারীদের জন্য একটি প্রবেশপথ স্থাপিত হয়েছিল। সৎকর্মশীল মানুষের জন্যও প্রবেশের ব্যবস্থা ছিল। দক্ষিণ দিকে ছিল এক ভয়ংকর লৌহদ্বার, যার দৃশ্য বড়ই ভীতিজনক। সূর্যপুত্র সেই পথে প্রবেশের ব্যবস্থা করেছিলেন পাপীদের জন্য এবং হত্যাকারী অন্যান্যদের জন্যও। পশ্চিম দিকেও ছিল আরেকটি প্রবেশদ্বার, যা চারদিক থেকে দেখতেও ভয়ংকর। স্বয়ং যম সেখানে দুষ্টদের প্রবেশের ব্যবস্থা করেছিলেন। নগরীতে ছিল এক দিব্য সভামণ্ডপ, যা নানা রত্নে নির্মিত, বৈবস্বত কর্তৃক নির্ধারিত। সেখানে প্রবেশাধিকার পেতেন যারা ক্রোধ জয় করেছেন, লোভমুক্ত, অনাসক্ত এবং তপস্যায় নিয়োজিত। সেই সভা সকল জীবের জন্য, সৎ ও অসৎ উভয়ই সেখানে বিচার পেত। শাস্ত্র অনুযায়ী কর্মের ফল যেমন, বিচারও তেমনই নির্ধারিত হত। সকলের মঙ্গলার্থে সেখানে সব বিষয়ে আলোচনা হত। তারা সুসংগঠিতভাবে সকল বিষয়ে বিচার করত। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন ঋষি অত্রি, রৌদ্রালকি, মহাবলশালী আপস্তম্ব, শঙ্খ, লিখিত, অঙ্গিরা এবং ভৃগু— এঁরা সকলেই যমের সঙ্গে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতেন। যম, তপস্যায় মহাশক্তিমান, কর্ণভূষণ ও বাহুবন্ধনে শোভিত ছিলেন। তাঁর দীপ্তি ও বাণী এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, তাঁকে সহজে দর্শন করা যেত না। তাঁর পাশে ছিলেন উচ্চকোটির দিব্য ঋষিগণ, যাঁরা ব্রহ্মজ্ঞ ও বেদার্থবেত্তা, সত্য ও ধর্মে প্রতিষ্ঠিত। এভাবেই ধর্মরাজ যমের সেই নগরীর অপূর্ব সৌন্দর্য, বিচারব্যবস্থা ও আনন্দময় পরিবেশের বর্ণনা পুরাণে বিশদভাবে প্রকাশ পেয়েছে।