সৃষ্টিজগতের সকল স্থূল ও সূক্ষ্ম প্রাণী তাদের নিজ নিজ কর্ম অনুসারে দেখা যায়। আমার অঙ্গগুলি ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে, মনও যেন বিভ্রান্ত। তবুও আমি যা দেখেছি ও শুনেছি, তাই বলব। এ এক আশ্চর্য স্থান—চোখে দেখা যায়, আবার যেন অদৃশ্য, নানা জাতের বৃক্ষরাজিতে ভরা। সেখানে রয়েছে স্বচ্ছ, শীতল, সুগন্ধি জলধারা। সেই নদী—সমস্ত পাপ নাশকারী—প্রধান নদী, অতি উজ্জ্বল। দেবতারা সেখানে খেলায় মত্ত, বারবার জলক্রীড়ায় লিপ্ত। কিন্নরীরা সেখানে বাঁকা দেহে, মধুর সুরে গায়, আর সাপজাতিও সেখানে উপস্থিত। হাজার হাজার দেবী সদা বিরাজমান। অন্যত্র আছে চিরসবুজ, সর্বদা ফুলে-ফলে ভরা বৃক্ষবন। সেখানকার জলে মনোমুগ্ধকর রূপসী নারীরা, সুন্দর কটিবন্ধনী পরে, ইচ্ছেমতো রূপধারণে সক্ষম। তারা তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে নদীর জলে ক্রীড়ায় মগ্ন, আনন্দে ভেসে যায়। জলযন্ত্রের ধ্বনি আর অলঙ্কারের ঝঙ্কারে পরিবেশ মুখরিত। এই শুভ্র, আনন্দদায়িনী নদীর নাম—বৈবস্বতী। নদীটি তার জলের সৌন্দর্যের মতোই মোহময়, সর্বদা দেবতুল্য, আকর্ষণীয় জলে পূর্ণ। সেখানকার শ্রেষ্ঠ পদ্ম—রথাঙ্গ—এর সোনালী গর্ভদণ্ড গলিত স্বর্ণের মতো দীপ্তিমান। তার জল পবিত্র, সুগন্ধি, মধুর, স্বচ্ছ, যেন অমৃতের মতো। সেখানে আনন্দে মাতোয়ারা রূপবতী নারীরা নানা আকর্ষণীয় রূপে ক্রীড়া করে। এই নদী দেবতাদের, তপস্যায় সমৃদ্ধ ঋষিদের, এবং সাধকদেরও পূজনীয়। বহু মানুষ এখানে জল নিবেদন করেছেন, আর নদীর প্রকৃত রূপ তার নিজস্ব সত্তায় প্রতিষ্ঠিত। সেখানে নারীরা সদা একত্রে গায়, বাজনার তালে, মধুর সুরে। তাদের মনোহর রূপ ও সঙ্গীত স্বর্গে দেবতাদের আনন্দ দেয়। তারা প্রাসাদবনের মধ্যে উপভোগে মগ্ন, কখনোই ক্লান্ত হয় না। কখনো কখনো মধুর সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, প্রাসাদের করিডোর ও সুশোভিত পথ ভরে যায় সেই গন্ধে। আবার কোথাও স্বর্ণমণ্ডিত মঞ্চে প্রিয়জনদের সঙ্গে খেলায় মগ্ন নারীরা দীপ্তিমান। সেই আনন্দের পরিমাণ বহু দিনেও বর্ণনা করা যায় না। এভাবেই শেষ হয় ‘সংসারচক্রে ধর্মরাজের নগর বর্ণনা’ অধ্যায়। ঋষিপুত্র বললেন—সেই নগরটি সুপ্রাচীরবেষ্টিত, শত শত প্রাসাদে শোভিত। যেন আকাশকেই খনন করে গড়ে তোলা হয়েছে, তার দীপ্তি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। নানা বাদ্যযন্ত্রে মুখর, অগ্নিমালায় পরিবেষ্টিত। সেখানে ধর্মপরায়ণদের জন্য প্রবেশপথ স্থাপিত হয়েছে। সৎকর্মী মানুষের জন্যও প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে। দক্ষিণ দিকে রয়েছে লৌহপ্রাচীরের এক ভয়ংকর প্রবেশদ্বার। সেই পথ দিয়েই সূর্যপুত্র প্রবেশের ব্যবস্থা করেছেন পাপীদের ও হত্যাকারীদের জন্য। পশ্চিমে রয়েছে আরেক প্রবেশদ্বার, চারদিক থেকে দৃষ্টিনন্দন, কিন্তু কঠিন। স্বয়ং যম সেই দ্বার স্থাপন করেছেন অসৎকর্মীদের প্রবেশের জন্য। সেখানে রয়েছে এক দিব্য সভামণ্ডপ, যা সম্পূর্ণভাবে রত্নখচিত—এটি বৈবস্বত কর্তৃক নির্দিষ্ট। যারা ক্রোধজয়ী, লোভহীন, অনাসক্ত ও তপস্যায় নিবেদিত, তাদের জন্য এই সভা। এই সভায় সকল সত্তা—সাধু ও অসাধু—সমানভাবে উপস্থিত হতে পারে।