একদিন দেবী বসুন্ধরা দেবতাকে প্রশ্ন করলেন, “হে দেব, আপনি সর্বদা এই সব কিছুকে আমার মায়া বলে উল্লেখ করেন। আমি জানতে চাই, এই মায়ার অর্থ কী? এই যে পরম, গোপন সত্য—তার ব্যাখ্যা দিন।” দেবী বসুন্ধরার এমন আন্তরিক কৌতূহল দেখে দেবতা মৃদু হাসলেন এবং তাঁকে বললেন, “তুমি যা দেখবে তার জন্য অযথা কষ্ট করছ কেন? হে বিশাল নেত্রী, আমার মায়া সম্পর্কে তোমাকে আর কী বলব? শোনো, যখন কোনো ভূমি শুষ্ক হয়ে যায়—এটাই আমার মায়া, প্রিয়। যেমন চাঁদ পক্ষকাল ধরে ক্ষয় ও বৃদ্ধি পায়, তেমনই। অমাবস্যার রাতে চাঁদ দেখা যায় না—এটিও আমার মায়া। গ্রীষ্মকালে যখন হঠাৎ শীতলতা অনুভূত হয়, সেটাও আমার মায়া। আবার, যখন সূর্য পূর্বদিকে উদিত হয়, হে সুন্দরী, সেটাও আমার মায়া। যখন কোনো জীব গর্ভে জন্ম নেয়, তখনও আমার মায়া কাজ করে; আত্মা গর্ভে প্রবেশ করে সুখ-দুঃখ অনুভব করে। জন্মের পর সেই আত্মা সব কিছু ভুলে যায়—এটাই আমার পরম মায়া। কর্মের ফলে সে অন্যত্র গমন করে—এটিও আমার পরম মায়া। মানুষের আঙুল, পা, বাহু, মাথা, কোমর, কান, চোখ, করোটির অংশ, কপাল ও জিহ্বা—সবই আমার মায়ার দ্বারা গঠিত। সে যা খায়, তা দেহের আগুনে হজম হয়; পানীয়ও তেমন। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, স্বাদ এবং পঞ্চম—গন্ধ—এইসব ইন্দ্রিয়বিষয়ও আমার মায়ার অন্তর্ভুক্ত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্থাবর ও জঙ্গম সকল প্রাণীর মধ্যে নিজ নিজ স্বভাব প্রকাশ পায়—এটাও আমার মায়া। দেবজল ও পার্থিব জল আছে—যার ওপর সবকিছু স্থিত। বর্ষার সময় পুকুর-জলাশয় জলপূর্ণ হয়ে ওঠে। হিমালয়ের শিখর থেকে মন্দাকিনী নদী প্রবাহিত হয়। মেঘেরা সমুদ্র থেকে লবণাক্ত জল টেনে নিয়ে আসে ও বয়ে নিয়ে যায়। কিছু জীব রোগাক্রান্ত হলে মহৌষধি সেবন করে; কিন্তু ওষুধ দিলেও কখনো কখনো কারো মৃত্যু ঘটে। প্রথমে গর্ভে ভ্রূণ গঠিত হয়, তারপর সে জন্মগ্রহণ করে। এরপর ইন্দ্রিয়ের ধ্বংস ঘটে—এটাও আমার মায়ার শক্তি। আবার, গাছের পাতার মতো নানা রূপে আমার মায়া প্রকাশ পায়। সেইখানেই আমি বারবার অমৃত বর্ষণ করি মায়ার দ্বারা। আমি গরুড়রূপে দ্রুতগতি ধারণ করে নিজেই নিজেকে বহন করি। এই মায়া সৃষ্টি করে স্বর্গবাসীদের জন্য যজ্ঞ সম্পাদন করি। অঙ্গিরস মায়া ধারণ করে দেবতাদের দ্বারা যজ্ঞ করাই। বরুণ মায়া ধারণ করে মহাসমুদ্রের রক্ষা করি। কুবের মায়া ধারণ করে ধনরক্ষা করি। শাক্র মায়া ধারণ করে বৃত্রকে বধ করি। মায়া দ্বারা মেরু পর্বত সৃষ্টি করেছি, আবার সূর্যকেও বহন করি। পাতালাগ্ন অগ্নিরূপে সেই জল পান করি। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে—‘ওই জল কোথায় থাকে?’—তবে জেনে রাখো, আমার মায়ার শক্তিতে তা বন-জঙ্গলের ঔষধি গাছের মধ্যে থাকে। রাজমায়া দ্বারা আমি পৃথিবীর রক্ষা করি। তাদের মধ্যে প্রবেশ করে, হে পৃথিবী, আমি জগতে মায়া সৃষ্টি করি। উজ্জ্বল, অলৌকিক এক মায়ার রূপ ধারণ করে আমি সমগ্র বিশ্বকে পূর্ণ করি।