হে দেবী, জগতে আর কোনো দেবতা নেই—এ সত্য, এ সত্য, হে মুনিশ্রেষ্ঠ। তখন সেই শিশুটি বলল, ‘‘আমি লিঙ্গের পূজা করব; আপনার দুঃখ এখানেই ফেলে দিন।’’ এই কথা শুনে পিতা এবং উপস্থিত সকলেই বিস্মিত হলেন, হে পার্বতী। ঠিক তখনই, লিঙ্গের মধ্যভাগ থেকে এক অলৌকিক স্বর ভেসে উঠল, ‘‘হে পর্বতকন্যে, পাপের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তারা দীর্ঘজীবী হোক।’’ ‘‘হে মহীয়সী, যারা শিশুটির কথা শুনে লিঙ্গের সান্নিধ্যে নীরব থাকে, তারা চিরকাল বার্ধক্য ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে থাকবে। তারা সর্বোচ্চ কামনা লাভ করবে ও গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হবে।’’ এইভাবে বরলাভ করে, কন্থা ভক্তিভরে হাতজোড় করে এগিয়ে এল। এমন বর সত্যিই বিরল, দেবতা, অসুর কিংবা যক্ষদের মধ্যেও। শিশুটি তখন মহাদেবকে বলল, ‘‘আরও কোনো বর যদি দেওয়ার থাকে—’’ তখন প্রসন্ন পার্বতী লিঙ্গের মধ্য থেকে বললেন, ‘‘তথাস্তু। কেবল একবার দর্শনেই মানুষ দীর্ঘায়ু লাভ করে।’’ যে-ই কন্থদেশ্বরের সেই মহাদেবের লিঙ্গ দর্শন করে, সে পাপবন্ধন থেকে মুক্ত হয় ও মোক্ষ লাভ করে; আমার নাম উচ্চারণ করলেই সমস্ত পাপ নির্মূল হয়। জগতে যেসব মানুষ এই দর্শন পায় না, তাদের জন্ম বৃথা, হে গৌরী। এইভাবে আমি তোমাকে বললাম সেই মহাশক্তির কথা, যা সমস্ত পাপ নাশ করে। হে দেবী, এই শক্তি মহাসিদ্ধি দান করে এবং ব্রাহ্মণহত্যার মতো মহাপাপও নাশ করে। এদিকে ছিলেন প্রজাপতি ত্বষ্টা, তাঁর পুত্র ছিলেন কুশধ্বজ। পুত্র নিহত হওয়ার সংবাদে ত্বষ্টা, সৃষ্টিকর্তা, প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘‘আজ দেবতাসহ তিনভুবন আমার শক্তির সাক্ষী থাকুক!’’ ‘‘যে আমার পুত্রকে নিজ কর্তব্যে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় হত্যা করেছে—’’ এরপর ত্বষ্টার তেজে আবির্ভূত হল ভয়ংকর অসুর বৃত্র, অগ্নিমাল্যধারী, যার শক্তি অতলস্পর্শী। বৃত্রকে দেখে স্বয়ং ইন্দ্রও বুঝলেন, এ-ই তাঁর মৃত্যুর কারণ। ঠিক তখনই, অসুরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বৃত্র উপস্থিত হলেন এবং শুরু হল ভয়াবহ যুদ্ধ। ভগ্ন দেহ, ছিন্ন বর্মে ভেসে গেল ভূমি; রক্তে লাল হল ধরিত্রী। নিঃশির দেহের স্তূপ জমল, দেবসেনা জড়ো হল; রক্তধারায় আকাশের দিগন্ত লাল হয়ে উঠল। বৃত্র তখন বেঁধে ফেলল বাসব, অর্থাৎ ইন্দ্রকে, এবং দেবলোক অভিমুখে চলল। তখন দেবরাজ ইন্দ্র আবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। বুদ্ধিমান বৃহস্পতি তাঁকে দেখে আশীর্বাদ জানিয়ে বললেন, ‘‘এ সময় তোমার জন্য অনুকূল নয়, হে দেবরাজ। সেখানে আমি সকল প্রধান অসুরদের দেখেছি।’’ ‘‘তাদের প্রত্যেকেই একা তোমাকে পরাজিত করতে সক্ষম—দেখেছি বা শুনেছি, তাদের শক্তি এমনই।’’ বৃহস্পতির কথা শুনে ইন্দ্র গভীর দুশ্চিন্তায় পড়লেন, ‘‘এখন কী করা উচিত বলো, হে বৃহস্পতি? ওরা আমার কাছে আসবে, আর বৃত্র তো অতিশয় শক্তিশালী।’’ তখন বৃহস্পতি বললেন, ‘‘খণ্ডেশ্বরের দক্ষিণে যে মহৎ কালবন, সেখানে গিয়ে পরিশ্রম সহকারে তাঁর পূজা করো; তিনি তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করবেন।’’ ‘‘সেই মহৎ কালবনে, হে দেবী, শ্রেষ্ঠ লিঙ্গ দর্শন করো। দেবাদিদেব, শঙ্কর, বৃষধ্বজ, সর্বশ্রেষ্ঠ—তাঁকে চিরকাল নমস্কার; যিনি সকল কামনা পূর্ণ করেন, তাঁকেই চিরকাল নমস্কার।’’ এভাবেই দেবী, পাপনাশিনী সেই শক্তির মাহাত্ম্য ও বৃত্রাসুরের অভ্যুদয় ও ইন্দ্রের মুক্তির পথের কথা তোমাকে শ্রদ্ধাভরে বললাম।