একজন মহর্ষি নির্জন স্থানে সম্পূর্ণরূপে ভগবানের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে বাস করতেন এবং ফল খেয়ে জীবনধারণ করতেন। দীর্ঘ পাঁচশো বছর ধরে তিনি কেবলমাত্র জল পান করে বেঁচে ছিলেন। গ্রীষ্মকালে তিনি পাঁচ অগ্নি তপস্যা করতেন এবং শীতকালে জলে অবস্থান করতেন। তাঁর এই কঠোর সাধনায় মহাদেব সন্তুষ্ট হলেন। তখন সেই মহাত্মা ঋষি যখন মহাদেবকে দর্শন করলেন, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তিনি স্তোত্র পাঠ শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘‘শিবকে প্রণাম, যিনি বিশুদ্ধ, সর্বব্যাপী, অমর। স্থূল ও সূক্ষ্ম রূপে যিনি বিরাজমান, সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন, তিনি মহান আত্মা—তাঁকে প্রণাম। চন্দ্রকলাধারী, দিগ্বাসা—তাঁকে প্রণাম। যাঁর স্বরূপ জ্ঞান, যিনি জ্ঞানের দ্বারা লাভযোগ্য—তাঁকে প্রণাম। কাশীর ঈশ্বর, পর্বতের অধিপতি—আপনাকে বারংবার প্রণাম। গৌরীপ্রিয়, মঙ্গলময় স্বভাবের অধিকারী—আপনাকে প্রণাম। বিশ্বরূপ, বিশুদ্ধ, মহাত্মা—আপনাকে প্রণাম।’’ মহাদেব তখন প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘‘আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট; তুমি বর চাও, হে স্থিরচিত্ত ঋষি, তোমার মঙ্গল হোক।’’ এভাবে বলার পর হঠাৎ পর্বত ভেদ করে এক লিঙ্গ তাঁর সামনে উদিত হল। মহাদেব জানালেন, ‘‘এই লিঙ্গের প্রতিশ্রুতি আমি পূর্বে এই মহাত্মা পর্বতকে দিয়েছিলাম। তোমার কথায়, হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ, সবই সত্য হবে। যে মর্ত্যমানব ভক্তিসহকারে আমার এই স্তোত্র পাঠ করবে—সে কৃতার্থ হবে। হে ঋষিশ্রেষ্ঠ, আমি ইন্দ্রের প্রেরণায় এখানে এসেছি আমার প্রিয় উদ্দেশ্যে। দেবতার উত্তর দিকে সর্বদা এক পবিত্র কুণ্ড আছে; সেখানে যে যায়, সে বার্ধক্য ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে যায়। এই পর্বত বিদীর্ণ করে আমার লিঙ্গ সেখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই লিঙ্গের মহিমায়, এটি কখনও স্থানচ্যুত হবে না।’’ এ কথা বলে মহেশ্বর নীরব হলেন। এরপর ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতা সেই তীর্থ ও মন্দিরসমূহ দর্শন করলেন। পরে দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, মহাদেব, আনন্দিত হয়ে সেখানেই অধিষ্ঠান করলেন। এদিকে, সূত পুরাণের শ্রোতারা কৌতূহলী হয়ে বললেন, ‘‘সূত, আমাদের মনে কৌতূহল জেগেছে; দয়া করে আমাদের এই মঙ্গলময় কাহিনী বিশদে বলুন, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল।’’ সূত তখন যযাতির গৃহে গেলেন, তাঁকে প্রণাম করলেন এবং রাজা যযাতি বললেন, ‘‘স্বাগতম, হে মুনিশ্রেষ্ঠ; আজ আমার জীবন সার্থক হল। পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ এক পর্বত আছে, যার নাম অর্বুদ। হে তীর্থভক্ত, আমাকে সব বিস্তারিত বলুন।’’ সূত বললেন, ‘‘এত বিশদভাবে বলা আমার পক্ষে শতবর্ষেও সম্ভব নয়। সংক্ষেপে প্রধান তীর্থসমূহের কথা বলছি। বিশেষত নারীদের জন্য এই স্থানে পূত্রলাভের সৌভাগ্য মেলে। এক ব্রাহ্মণী ছিলেন—গৌতমী নামে—তিনি সতী, পতিব্রতা ও ধর্মনিষ্ঠা। তিনি অর্বুদ পর্বতে উপস্থিত হয়ে নাগতীর্থে প্রবেশ করলেন। তাঁর সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে তিনি সেই পবিত্র স্থানে পৌঁছালেন। সঙ্গে ছিল সব পূজার সামগ্রী, দুর্বা ঘাস, নানা রকম ফুল। তাঁর এই সন্তান সত্যিই ধন্য, কারণ সে সর্বদা মায়ের সেবা করত।’’ গৌতমী বললেন, ‘‘আমি স্বামীর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত, সন্তানহীন, গভীর শোকে ক্লিষ্ট।’’ কিন্তু স্বামীর সঙ্গে মিলন ছাড়াই, হঠাৎ তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়লেন। এতে তিনি মৃত্যুর সংকল্প নিয়ে অগ্নি প্রজ্বলিত করলেন। তখন তাঁকে বলা হল, ‘‘এতে তোমার কোনো দোষ নেই; এই তীর্থের মহিমাতেই এমন হয়েছে।