একদিন, সম্মানিত ঋষিদের সামনে একজন জ্ঞানী বললেন, ‘‘হে দ্বিজগণ, কেন এত কথা বলব? নারী এবং অন্য সকলের জন্যও এই একই কথা প্রযোজ্য—শিবের লিঙ্গ পূজার অধিকার সকলের আছে।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘তবে দ্বিজদের মধ্যে বৈদিক পদ্ধতিতে পূজা করাই সর্বোত্তম। অন্য জীবদের জন্য বৈদিক পূজা অনুমোদিত নয়। দ্বিজদের পূজা অবশ্যই বৈদিক পথেই হওয়া উচিত, অন্য কোনোভাবে নয়—এটাই মহাদেব শিবের ঘোষণা।’’ তিনি ব্যাখ্যা করলেন, ‘‘দধীচি, গৌতম এবং অন্যান্য ঋষিদের অভিশাপে যাদের মন দগ্ধ হয়েছে, তাদের মধ্যে শুধু দ্বিজদেরই বৈদিক পূজায় বিশ্বাস জন্মে। কেউ যদি বৈদিক নিয়ম উপেক্ষা করে স্মার্ত বা অন্য কোনো পূজা করে, সে তার ইচ্ছার ফল লাভ করতে পারে না।’’ ‘‘শম্ভুর পূজা ও নির্ধারিত নিয়মে অন্ন নিবেদন করার পর, তিনটি জগৎ-রূপী আটটি রূপের পূজা করতে হয়। এই আট রূপ হল—পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ, সূর্য, চন্দ্র এবং যজ্ঞকারী। এই আট রূপে শিবের—শর্বর, ভব, রুদ্র, উগ্র, ভীম, ঈশ্বর, মহাদেব এবং পশুপতি—এই নামগুলিতে পূজা করতে হয়।’’ ‘‘এরপর, সত্য ভক্তি নিয়ে শম্ভুর পারিষদদের—ঈশান থেকে শুরু করে—চন্দন, ধান ও পাতা দিয়ে পূজা করতে হয়। ঈশান, নন্দী, চণ্ড, মহাকাল, ভৃঙ্গি, বৃষ, স্কন্দ, কপর্দীশ, সোম ও শুক্র—এই ক্রমে তাদের পূজা করতে হয়। সামনে বীরভদ্র, পেছনে কীর্তিমুখ—এইভাবে এগারো রূপে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পূজা করতে হয়।’’ ‘‘তারপর, পঞ্চাক্ষর মন্ত্র ও শতরুদ্রীয় পাঠ এবং নানা স্তব পাঠের পর পঞ্চাঙ্গ পাঠ করতে হয়। এরপর, লিঙ্গের চারপাশে প্রদক্ষিণ ও প্রণাম করে বিদায় নিতে হয়। এভাবেই শিবের পূজার সম্পূর্ণ বিধি বর্ণনা করা হয়েছে।’’ ‘‘রাত্রে সর্বদা উত্তরমুখী হয়ে দেবীয় ক্রিয়া করতে হয়; তেমনি, শিবের পূজা সর্বদা পবিত্রভাবে উত্তরমুখী হয়ে করতে হয়। শম্ভুর সামনে পূর্বমুখী, যেখানে শক্তি আছে সেখানে উত্তরমুখী, কিংবা পশ্চিমে পিঠ দিয়ে বসা উচিত নয়। এভাবে কোনো অবস্থান গ্রহণ করা ঠিক নয়।’’ ‘‘ত্রিপুণ্ড্র ভস্ম, রুদ্রাক্ষের মালা ও বিল্বপত্র ছাড়া জ্ঞানী ব্যক্তি কখনও শঙ্করের পূজা করা উচিত নয়। যদি ভস্ম না পাওয়া যায়, তাহলে শিব-পূজার শুরুতে কাদামাটি দিয়েই কপালে ত্রিপুণ্ড্র আঁকতে হয়।’’ এরপর এক ঋষি প্রশ্ন করলেন, ‘‘আগে শুনেছিলাম, শিবের প্রসাদ গ্রহণ করা যায় না। এর সিদ্ধান্ত ও বিল্বের মাহাত্ম্য বলুন, হে মহাজ্ঞানী।’’ তিনি আনন্দিত হয়ে বললেন, ‘‘আমি সবই বলব; শিবব্রতের প্রতি তোমার ভক্তি ধন্য।’’ ‘‘শিবভক্ত, যিনি পবিত্র, পরিচ্ছন্ন, সদাচারে দৃঢ়, এবং সংকল্পে স্থির—তিনি শিবের প্রসাদ ভক্ষণ করতে পারেন, নিষিদ্ধ ভাবনা ত্যাগ করে। শুধু শিবের প্রসাদ দেখলেই পাপ দূর হয়; কিন্তু ভক্তের জন্য প্রসাদ গ্রহণে কোটি কোটি গুণ পুণ্য বৃদ্ধি হয়।’’ ‘‘হাজার যজ্ঞ বা কোটি কোটি যজ্ঞও শিবের প্রসাদ ভক্ষণ করার সমান নয়; এতে শিবের সঙ্গে মিলন ঘটে। যে গৃহে শিবের প্রসাদ বিতরণ হয়, সে গৃহ সম্পূর্ণ পবিত্র হয় এবং অন্যদেরও শুদ্ধ করে।’’ ‘‘শিবের প্রসাদ এলে মাথা নত করে গ্রহণ করা উচিত এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে খেতে হয়, সর্বদা শিবের স্মরণে। যদি প্রসাদ অন্য সময়ে আসে, তাও গ্রহণযোগ্য; তবে বিলম্ব হলে তা পাপে যুক্ত হয়।’’ ‘‘যিনি শিবের প্রসাদ গ্রহণের ইচ্ছা করেন না, তিনি মহাপাপী হয়ে নিশ্চিতভাবে নরকে যান। হৃদয়ে, বা স্ফটিক, সোনা, রূপার পাত্রে শিব-দীক্ষিতদের জন্য প্রসাদ গ্রহণযোগ্য।’’ ‘‘শিব-দীক্ষিত ভক্ত সকল লিঙ্গের মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন, তা শুভ। এখন শুনো, যারা শিব-দীক্ষিত নন কিন্তু ভক্ত—তাদের প্রসাদ গ্রহণের সিদ্ধান্ত। শালগ্রাম-লিঙ্গ, তরল লিঙ্গ, পাথর, রূপা, সোনা বা দেবতা বা সিদ্ধ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গে—সব ক্ষেত্রেই প্রসাদ গ্রহণের পুণ্য চন্দ্রায়ন ব্রতের সমান।’’ ‘‘এমনকি ব্রাহ্মণহত্যাকারীও, শুদ্ধ হয়ে, পরিত্যক্ত ফুল পরে, ঘৃত ভক্ষণ করলে তার সমস্ত পাপ নষ্ট হয়। যেখানে চন্দাধিকার আছে, সেখানে কেবল তিনি প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন; যেখানে নেই, সেখানে অন্যরা ভক্তি নিয়ে গ্রহণ করতে পারেন।’’ ‘‘বান-লিঙ্গ, লৌহ-লিঙ্গ, সিদ্ধ-লিঙ্গ, স্বয়ম্ভু-লিঙ্গ ও সব মূর্তিতে চন্দাধিকার নেই। পূজার বিধি অনুযায়ী লিঙ্গ স্নান করানোর পর, সেই স্নানের জল তিনবার পান করলে তিন ধরনের পাপ দ্রুত নষ্ট হয়।’’ ‘‘শিবের প্রসাদ, পাতা, ফুল, ফল ও জল গ্রহণ করা উচিত নয়; তবে শালগ্রাম-শিলার স্পর্শে সবই পবিত্র হয়। লিঙ্গে যা থাকে তা গ্রহণ করা উচিত নয়; কিন্তু যা লিঙ্গের স্পর্শের বাইরে, তা সর্বাধিক পবিত্র।’’ ‘‘এভাবে প্রসাদ গ্রহণের সিদ্ধান্ত বলা হয়েছে, হে ঋষিগণ; এখন মনোযোগ দিয়ে বিল্ব বৃক্ষের মাহাত্ম্য শুনো। এই বিল্ব মহাদেবের স্বরূপ, দেবতারা পর্যন্ত প্রশংসা করেন; তার মাহাত্ম্য যেভাবে জানা যায়, সেটাই যথেষ্ট।’’ ‘‘বিশ্বের সব তীর্থ, সব পবিত্র স্থান বিল্ব বৃক্ষের মূলেই বর্তমান।’’ এভাবেই শিবের পূজা, প্রসাদ ও বিল্বের মাহাত্ম্য সম্পর্কে ঋষিদের সামনে শাস্ত্রের বাণী শ্রুত হল।