দানবদের সভায় তখন উত্তপ্ত পরিবেশ। প্রাচীন পুরোহিতের সামনে প্রশ্ন তুললেন, ‘‘তুমি আমাকে কেন পরিত্যাগ করলে এবং অন্য কাউকে পুরোহিত নিযুক্ত করলে? এ তো অঙ্গিরসের পুত্র, দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি।’’ তখন উত্তর এলো, ‘‘নিশ্চয়ই তোমাকে ছলনা করা হয়েছে, কিন্তু দেবতাদের মঙ্গলের জন্যই। হে মহাভাগ্যবান, শত্রুপক্ষকে জয়ী করে যে, তাকে পরিত্যাগ করো।’’ এরপর সেই পুরোহিত বললেন, ‘‘হে প্রভু, আজ্ঞা পালনের ভয়ে আমি আগে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমি তখন জলে অবস্থান করছিলাম, তখন মহাদেব শম্ভু আমাকে পান করেছিলেন।’’ তিনি বললেন, ‘‘আমি তাঁর উদরে সম্পূর্ণ একশো বছর অবস্থান করেছিলাম। পরে, বীর্যরূপে, তিনি আমাকে নিজের দেহ থেকে নির্গত করেন।’’ ‘‘তখন, বরদানকারী দেবতা আমাকে বললেন, ‘তুমি বীর্য-সম্পর্কিত যা কিছু বর চাও, চেয়ে নাও, আমি প্রসন্ন হয়েছি। দেবতাদের দেবতা, ধনুর্বাহী ঈশ্বর তোমাকে বর দিচ্ছেন।’ আমি বললাম, ‘যে সকল মনোবাঞ্ছা হৃদয়ে জন্ম নেয়, যে বর অন্তরে স্থিত হয়—তুমি কৃপা করে যেন সবই আমাকে দাও, হে শঙ্কর।’ শিব বললেন, ‘তথাস্তু।’ তারপর তিনি আমাকে তোমার কাছে পাঠালেন। এদিকে, বৃহস্পতি এখানে তোমাদের পুরোহিত হয়ে গেল।’’ ‘‘হে দানবদের অধিপতি, আমি যা দেখেছি, তা-ই বললাম, সত্য বলছি। এরপর বৃহস্পতি প্রহ্লাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি জানি না, কে এই ব্যক্তি—দেব, দানব না মানুষ—যে আমার রূপ ধারণ করে তোমাকে বিভ্রান্ত করতে এসেছে।’’ সব দানব তখন একবাক্যে বলল, ‘‘সঠিক কথা! যেই হোক, আগের পুরোহিতকে বরখাস্ত করো।’’ তারা বলল, ‘‘আমাদের তার আর দরকার নেই, সে যেমন এসেছিল, তেমনই চলে যাক।’’ এতে কাব্য রোষে দানবদের অভিশাপ দিলেন, ‘‘যেভাবে তোমরা আমাকে ত্যাগ করেছ, আমিও যেন তোমাদের সবাইকে দেখিতে পাই, সৌভাগ্য ও প্রাণহীন, বহুদিন দুঃখে নিপতিত। তোমরা সবাই শীঘ্র ভয়ানক কষ্টে পতিত হও!’’ এই বলে কাব্য তপস্যার অরণ্যে চলে গেলেন। তাঁর প্রস্থানের পর বৃহস্পতি শুক্রের স্থানে থেকে কিছুদিন দানবদের রক্ষা করলেন। বহুদিন পরে, সব দানব একত্র হয়ে তাঁদের গুরুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘‘হে স্থিরচিত্ত, এই অসার জগতে আমাদের মুক্তির উপায় কী, সে জ্ঞান দাও।’’ তখন দেবগুরু, কাব্যরূপী বৃহস্পতি বললেন, ‘‘তোমরা যে উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছ, একসময় তা আমারও ছিল। একটু ধৈর্য ধরো, পবিত্র চিত্তে মনোযোগ দাও; আমি তোমাদের মুক্তিদায়ক জ্ঞান বলব।’’ তিনি বললেন, ‘‘এটাই বৈদিক জ্ঞান—ঋক, যজুঃ, সামন—যা বৈশ্বানর দেবতার কৃপায় জীবজগতে দুঃখ আনে। যেসব ক্ষুদ্রমনা মানুষ শুধু পার্থিব লাভের জন্য যজ্ঞ ও পিতৃকর্ম করে, বৈষ্ণব ও রুদ্রনির্দেশিত কর্তব্য পালন করে—তাতে মুক্তি কোথায়?’’ ‘‘রুদ্র, যিনি অর্ধেক নারী, অর্ধেক পুরুষ, যিনি অধর্ম, হিংসা ও ক্ষতিকর কর্মে লিপ্ত, তিনি তাঁর পত্নীসহ মুক্তি লাভ করবেন কীভাবে? যিনি ভূতগণের পরিবেষ্টিত, অস্থিধারী, তিনি স্বর্গ বা মুক্তি কিছুই পান না; বরং জগৎও কষ্ট পায়।’’ ‘‘বিষ্ণু, যিনি হিংসার আশ্রয় নিয়েছেন, তিনি মুক্তি পাবেন কেমন করে? ব্রহ্মা, যিনি রজোগুণী, তিনি নিজের সৃষ্টি রক্ষা করেন। দেবতা, ঋষি ও অন্যান্য বৈদিক পথের অনুসারীরা অধিকাংশই হিংস্র, নিষ্ঠুর, মাংসাশী ও পাপাচারী।’’ ‘‘দেবতারা মদ্য পান করেন, ব্রাহ্মণরা মাংস ভক্ষণ করেন—এমন ধর্মে কে স্বর্গ পায়, মুক্তি কোথায়? যজ্ঞ, শ্রাদ্ধাদি, যা শাস্ত্রে নির্দিষ্ট, সেখানেও মুক্তি নেই।’’ ‘‘যদি যজ্ঞে পশুহত্যা ও রক্তপাতের মাধ্যমে স্বর্গলাভ হয়, তবে নরকে পতন কীভাবে ঘটে? যদি অন্যের ভোজন তোমার তৃপ্তি আনে, তবে নিজে না খেয়ে শ্রাদ্ধ করো। যারা মাংস খেয়ে আকাশে বিচরণ করে, তারা পতিত; তাদের জন্য স্বর্গ বা মুক্তি নেই।’’ ‘‘প্রত্যেক প্রাণীর জীবন তার কাছে প্রিয়—তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তি কীভাবে নিজের মাংসের মতো অপরের মাংস খেতে পারে?’’ ‘‘যারা গর্ভ থেকে জন্ম নেয়, তারা আবার গর্ভে ফিরে কীভাবে সেবা করে? দানবাধিপতি, যৌন মিলনে কীভাবে স্বর্গলাভ হয়? যেখানে কাদা ও ছাই দিয়ে শুদ্ধি হয়, সেখানে প্রকৃত পবিত্রতা কোথায়?’’ ‘‘দেখো, হে দানব, এই জগৎ কত বিকৃত—যেখানে মল-মূত্র নির্গত হওয়ার পর, সেই অঙ্গের মূত্র পান করেই শুদ্ধি হয়!’’ ‘‘হে রাজন, খাওয়ার পরে মুখ ও প্রস্রাবের অঙ্গ শুদ্ধ হয় না কেন? যেভাবে শুদ্ধি হয়, সেভাবেই এই বিকৃত আচরণ প্রতিষ্ঠিত; যেখানে শুদ্ধির বিধান, সেখানেই তারা তা পালন করে।’’ ‘‘একবার সোম দেবতা বৃহস্পতির স্ত্রী তারা-কে নিয়ে গেলেন; তার গর্ভে বুধ জন্ম নিল, পরে বৃহস্পতি তাঁকে ফিরিয়ে নিলেন। ইন্দ্র নিজেই গৌতম ঋষির স্ত্রী অহল্যাকে গ্রহণ করেছিলেন। দেখো, ধর্ম কেমন পালিত হয়।’’ ‘‘এমন আরও অনেক পাপজনক ঘটনা জগতে দেখা যায়; যেখানে এমন ধর্ম, সেখানে সর্বোচ্চ সত্য কী, তোমার মতে?’’ ‘‘বলো, হে দানবাধিপতি, আবার বলো, তোমার গুরুর মুখনিঃসৃত সর্বোচ্চ সত্য শুনে।’’ যারা জন্মের রহস্য জানতে চেয়েছিল, সংসার-সাগর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সেই দানবরা বলল, ‘‘হে গুরু, যারা এখানে ভক্তিসহকারে উপস্থিত, তাদের সকলকে দীক্ষা দাও।’’ ‘‘তোমার আদেশে আমরা যেন আর কখনও মোহে পতিত না হই; আমরা সংসার থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ, যা শুধু দুঃখ ও বিভ্রান্তি আনে।