অতীত কালে, চিরন্তনী লক্ষ্মী দেবী আবার জন্ম নিলেন ক্ষতি-পরিবারে, মহর্ষি ভৃগুর কোল থেকে, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যকে সঙ্গে নিয়ে। সেই সময়, তাঁর নিজের নামে একটি নগরী নির্মিত হয়েছিল নদীতীরে—ওহে মহারাজ, সেই নদী ছিল নর্মদা, আর ব্রহ্মা স্বয়ং এই নগরীর অনুমোদন দিয়েছিলেন। একবার লক্ষ্মী দেবী তাঁর পিতার কাছে নিজের নগরী ও তার চাবি নিয়ে গেলেন। তিনি দেবলোক গমন করেন এবং ফিরে এসে পুনরায় নগরীটি চাইলেন। তবে, লোভবশত যখন তিনি আবার নগরীটি চাইতে গেলেন, তখন তা তাঁকে দেওয়া হয়নি। তখন তিনি ভৃগুর কাছ থেকে নগরীটি পুনরায় পেলেন এবং সেই সময় কেশবকে বললেন, ‘‘আমার পিতা আমাকে অবজ্ঞা করেছেন, আমার নগরী নিয়ে নিয়েছেন; তুমি নিজে তাঁর হাত থেকে নগরীটি উদ্ধার করো।’’ এরপর পদ্মনয়ন, চক্র ও গদাধারী ভগবান ভৃগুর কাছে গিয়ে কোমলভাবে বললেন, ‘‘তোমার কন্যাকে নগরীটি দাও।’’ ভৃগু তখন রেগে গিয়ে জবাব দিলেন, ‘‘নগরী ও চাবি চাবিধারিনীকে দাও—এ কথা করুণা বশতই হতে পারে। কিন্তু আমি নগরী দেবো না।’’ ভৃগু বললেন, ‘‘ওহে ভগবান, এই নগরী লক্ষ্মীর নয়, আমি নিজেই একে নির্মাণ করেছি। আমি দেবো না—তুমি আর জোর করো না, কেশব।’’ ভগবান আবার বললেন, ‘‘তুমি লক্ষ্মীকে নগরী দাও; আমার আদেশে সব দিক থেকে তা ছেড়ে দাও, হে মহর্ষি।’’ তখন ভৃগু প্রবল ক্রোধে কেশবকে বললেন, ‘‘ধর্মবান, তুমি তোমার স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে আমাকে ক্লেশ দিচ্ছো। মানবলোকে, ওহে মধুসূদন, তুমি দশবার জন্ম নেবে; পত্নী-বিচ্ছেদে তুমি অনেক দুঃখ ভোগ করবে।’’ এভাবে ভৃগু প্রচণ্ড ক্রোধে ভগবান বিষ্ণুকে অভিশাপ দিলেন। তখন বিষ্ণুও পাল্টা ভৃগুকে অভিশাপ দিলেন, ‘‘হে মুনি, তুমি সন্তানে সুখ পাবে না।’’ এই অভিশাপ দিয়ে তিনি ব্রহ্মার লোকের দিকে চলে গেলেন। কেশবের এই অবস্থায় তিনি পদ্মযোগ জন্মা ব্রহ্মাকে বললেন, ‘‘প্রভু, আপনার পুত্র ভৃগু আমাকে বিনা কারণে অভিশাপ দিয়েছেন—দশবার মানবরূপে জন্ম নিতে হবে এবং বহু দুঃখ সহ্য করতে হবে।’’ ‘‘পত্নী-বিচ্ছেদ থেকে উৎপন্ন যন্ত্রণা আমার শক্তি ও উৎসাহ নষ্ট করবে; তাই আমি এই জগৎ ছেড়ে মহাসাগরে শয়ান হবো। যখনই দেবকার্য উপস্থিত হবে, তখন আমায় ডেকো।’’ এ কথা শুনে, ব্রহ্মা, জগতের আচার্য, বিষ্ণুকে শান্ত করতে স্তব করতে লাগলেন, ‘‘এই জগৎ তোমার দ্বারাই সৃষ্ট, হে পদ্মনাভ; আমি তোমার নাভি থেকে জন্মেছি, আমি তোমারই অধীন, হে কেশব। তুমি সকল জগতের রক্ষক, তুমি সৃষ্টিকর্তা; তিন জগৎ যেন তুমি ছেড়ে না যাও—এটাই আমার একমাত্র প্রার্থনা।’’ ‘‘জগতের কল্যাণের জন্য তোমাকে দশবার মানবজন্মে নিজেই কর্ম করতে হবে; অভিশাপের ফল কেউ নষ্ট করতে পারে না। ভৃগু কে, আর তিনি জনার্দনকে কীভাবে অভিশাপ দিতে পারেন? সর্বদা ঋষিদের সম্মান করো, কারণ ব্রাহ্মণরাই তোমার রূপ।’’ ‘‘যোগনিদ্রা গ্রহণ করো, হে ভগবান, ক্ষীরসমুদ্রের ওপর বিশ্রাম নাও; যখন কার্যসময় হবে, হে মাধব, আমি তোমায় জাগিয়ে তুলবো।’’ ‘‘ততক্ষণে, তোমার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ইন্দ্র সকল কার্য সম্পাদন করবে; তিনি তোমার অংশেই শত্রুদের বিনাশ করবেন। তিন জগৎ রক্ষা করতে তিনি তোমার আদেশ অনুসারে চলবেন।’’ এভাবে স্তব শুনে বিষ্ণু ব্রহ্মাকে বললেন, ‘‘প্রভু, আপনি যা বললেন, আমি তাই করবো।’’ এরপর দেবতা অদৃশ্য হয়ে গেলেন, ব্রহ্মা তাঁকে চিনতে পারলেন না। বিষ্ণু চলে গেলে, ব্রহ্মা, জগতের পিতামহ, আবার সৃষ্টিতে মন দিলেন; তিনি সকল জীবের উৎস ও অধীশ্বর। তখন নারদ, শ্রেষ্ঠ বক্তা, তাঁকে দেখে বললেন—‘‘হাজারমাথা, হাজারচোখ, হাজারপা বিশিষ্ট পুরুষ, সর্বব্যাপী, তিনি ধরাতলের দশ আঙুল উপরে দাঁড়িয়ে আছেন।’’ ‘‘যা ছিল এবং যা হবে, সবই তোমার থেকে উদ্ভূত; এই সমগ্র বিশ্ব তোমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছে এবং হবে। তোমার থেকেই যজ্ঞ, সমস্ত আহুতি, ঘৃত এবং যজ্ঞ-পশু দুই রূপে জন্ম নেয়; তোমার থেকেই ঋক ও সামবেদ জন্ম নেয়।’’ ‘‘তোমার থেকেই যজ্ঞ, ঘোড়া ও হাতি জন্ম নেয়; গরু, ধাতু ও বন্য প্রাণীও তোমার থেকেই উৎপন্ন। তোমার মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, পদ থেকে শূদ্র উৎপন্ন হয়েছে।’’ ‘‘তোমার চোখ থেকে সূর্য, কান থেকে চন্দ্র, মন থেকে বায়ু, মুখ থেকে অগ্নি জন্ম নিয়েছে। তোমার নাভি থেকে আকাশ, মস্তক থেকে স্বর্গ, কান থেকে দিক, পদ থেকে পৃথিবী; তোমার থেকেই এই সমস্ত সৃষ্টি। যেমন বিশাল বটগাছ ক্ষুদ্র বীজে নিহিত থাকে, তেমনি তুমি বীজরূপে সমগ্র বিশ্ব সৃষ্টি করেছো।’’ ‘‘বীজের অঙ্কুর থেকে বটগাছ যেমন বিস্তৃত হয়, তেমনি তোমার সৃষ্টি থেকে জগৎ প্রসারিত হয়েছে। যেমন কলাগাছ ছাড়া তার ছাল ও পাতার অস্তিত্ব নেই, তেমনি তোমার ছাড়া এই বিশ্ব দেখা যায় না।’’ ‘‘সেই আনন্দময় শক্তি তোমার মধ্যেই অবস্থান করে, কেবল তোমার সঙ্গে যুক্ত; সুখ-দুঃখে মিশ্রিত, তুমি গুণাতীত হয়েও তাতে বিরাজমান। তোমায় নমস্কার, তুমি স্বতন্ত্র ও এক, সকল সত্তার সার; তুমি প্রকাশ্য, আদ্যাপ্রকৃতি, পুরুষ, বিশ্বাধিপতি।’’ ‘‘তুমি সকল জীবের মধ্যে বিরাজমান, সবকিছু তুমি, সকলের রূপধারী; সমস্ত কিছু তোমার থেকেই উৎসারিত—তোমায় প্রণাম, তুমি সকলের আত্মা। তুমি সকলের আত্মা, সকলের ঈশ্বর, প্রত্যেক জীবের অন্তরে অবস্থান করো; সুতরাং আমার আর কিছু বলার দরকার নেই—তুমি হৃদয়ের সবই জানো।