চন্দ্রের কলঙ্ক প্রথমে যারা ধর্মকে মূল্য দেয়, তারাই দেখতে পায়; যে ব্যক্তি কটু কথা বলে, নিষ্ঠুর ও কুটিল স্বভাবের, সে ধর্মহীন। তখন পদ্মগন্ধা বললেন, ‘‘যখন আমার মধ্যে ধর্ম থাকবে না, তখন তোমার স্বামী তোমাকে পূজা করুক।’’ এ কথা বলে, পদ্মগন্ধা, যার চোখ ছিল পদ্মের মতো, ক্রোধে সোনার পালঙ্ক থেকে উঠে উচ্চস্বরে বিলাপ করতে লাগলেন। ইন্দ্র বললেন, ‘‘প্রিয়, আমার প্রাণের অধিষ্ঠাত্রী, নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তুমি কোথায় যাচ্ছ, আমাকে ছেড়ে?’’ তিনি আবার বললেন, ‘‘আমি তোমার কী অপরাধ করেছি? বলো সুন্দরী, আমি তো তোমার দাস, দাসের মতো সব কর্তব্য পালন করি।’’ ‘‘দাসের স্ত্রীও দাসী হয়; তুমি আমার কথা শোনো না।’’ তখন শক্র, বিভ্রান্ত চিত্তে, পদ্মগন্ধাকে আবার কোলে তুলে নিলেন। শচী বললেন, ‘‘কৌঞ্চ পাখির জীবন ধন্য; নিশ্চয়ই আমার জীবন বৃথা। তুমি সর্বদা সৌভাগ্যশালী, হে স্বামিনী, আর আমি দুর্ভাগিনী। যতদিন কৌঞ্চের পুণ্য থাকে, ততদিনই সে সুখী; কিন্তু সে পুণ্য শেষ হয়ে যাবে।’’ ‘‘কৌঞ্চকুলে জন্ম নিয়ে, আবার দুঃখ পাবে তুমি। ততদিন স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের সঙ্গে ইচ্ছামতো সুখ ভোগ করো। কতোদিন, হে কৌঞ্চ, তুমি থাকবে না, হে ধর্মহীনা?’’ শচীর কথা শুনে পদ্মগন্ধা বিস্মিত হলেন। তিনি দ্বন্দ্ব ত্যাগ করে, সেই সদ্বতী শচীর চরণে প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘‘হে পুলোমার কন্যা, মহিয়সী, তুমি যা বললে তা আশ্চর্য। হে কৌঞ্চী, বলো—তুমি কে? কোথায় থাকো, কীভাবে এখানে এলে? আমি বিস্তারিত শুনতে চাই।’’ ‘‘আমার পুণ্য কবে শেষ হবে?’’ শচী বললেন, ‘‘পূর্বে তুমি কৌঞ্চী ছিলে, পাখিদের মধ্যে জন্মেছিলে, আর তোমার শরীরে ছিল পদ্মগন্ধ। তুমি পৃথিবীতে বাস করতে, অপবিত্র মাংস আর পতঙ্গ খেতে। গঙ্গার মনোরম তীরে একটিমাত্র বটগাছ ছিল।’’ ‘‘সেখানে তুমি বাসা বেঁধে ঘর করেছিলে। একদিন, একটি কালো সাপ সেই বটগাছে প্রবেশ করল। বাসায় ঢুকে হঠাৎ তোমাকে ছোবল মেরে মেরে ফেলল। সেই সাপ ক্রোধে তোমার সমস্ত মাংস খেয়ে ফেলল।’’ ‘‘তোমার হাড়গুলো সেখানে পড়ে রইল, হে সুন্দরী। পরে, প্রবল বাতাসে সেই সাপও পড়ে গেল। ভেঙে গিয়ে, গাছটা শেকড়সহ গঙ্গায় পড়ল, হে মনোহরা। গাছটি গঙ্গায় পড়লে, তোমার উৎকৃষ্ট হাড়গুলো গঙ্গার জলে ধুয়ে গেল।’’ ‘‘যতদিন তোমার হাড় গঙ্গায় থাকবে, ততদিনই তুমি স্বামীর কাছে প্রিয় থাকবে। হে পদ্মগন্ধা, আমি সব বললাম। তোমার সেই পুণ্যেই স্বয়ং শক্রও তোমার অধীন। ভাগ্যবতী জাহ্নবী দেবী, তাঁর কৃপায়, হে কৌঞ্চী, তুমি ইন্দ্রলোকেও অপবিত্রদের স্পর্শে অপবিত্র হও না।’’ ‘‘তাঁর দ্বারাই পুলোমজা, সদ্বতী, অপমানিত হয়েছিলেন। তাঁর পদ্মমুখ মলিন হয়ে গেল, তিনি যেমন এসেছিলেন তেমনি চলে গেলেন। পদ্মগন্ধা, সুন্দরী, ইন্দ্রের ধামে রইলেন। সেই কথা তাঁর মনে সদা জাগরূক রইল।’’ ‘‘একদিন, হে দ্বিজ, দেবরাজ তাঁর ধর্মে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘বরণ করো, হে সুন্দরকটিভাগিনী, যা চাও।’ পদ্মগন্ধা বললেন, ‘আপনি দেবতাদের স্বামী, অসংখ্য নারীর অধিপতি, তবুও আপনি আমার অধীন; আর কী বর প্রয়োজন? তবু, যদি বর দিতে চান, হে দেবশ্রেষ্ঠ, কর্মে, মনে, বাক্যে আমার সামনে অঙ্গীকার করুন।’’ ইন্দ্র বললেন, ‘‘জীবন, ধন, রাজ্য, সঙ্গী—বলো সুন্দরী, আমি দেব। সত্যি, সত্যি, আবারও সত্যি—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তুমি যা চাও, হরিণী-চক্ষু, আমি দেবই।’’ পদ্মগন্ধা বললেন, ‘‘হে দেবরাজ, যদি আপনি সত্যিই সন্তুষ্ট হন, তবে আমার জন্ম যেন হাতিনীর গর্ভে হয়—এ বর দিন।’’ ইন্দ্র বললেন, ‘‘আমি অঙ্গীকার করেছি, হে সুন্দরকটিভাগিনী, এ বর দেবই। কিন্তু বহু দুঃখ আমার মনে এসেছে; হে সুন্দরী, তোমাকে না দেখে আমি এক মুহূর্তও আনন্দ পাই না।’’ ‘‘এত দীর্ঘ বিচ্ছেদ আমি কীভাবে সহ্য করব? যখন তুমি পূর্ণবক্ষিনী হয়ে আমার প্রতি দয়া দেখাবে, তখন, হে শোভনাঙ্গিনী, কিছুদিন আমার সঙ্গে থেকো; পরে দেবরাজ্যের মহাসমৃদ্ধির কথা বলো।’’ তিনি স্বর্গে দশ হাজার বছর রইলেন। পদ্মগন্ধা বললেন, ‘‘হে দেবরাজ, আমার বাসনা পূরণের অনুমতি দিন। আমি কর্মক্ষেত্রে যাব; আপন চরণে প্রণাম জানাই।’’ ইন্দ্র বললেন, ‘‘তোমার আমার প্রতি মহাসমুদ্রসম প্রেমের কারণে, হে চাঁদমুখী, কয়েকদিন থেকে ইচ্ছামতো চলে যেও। তারপর, আমোদ-উৎসবের গৃহে, তাঁর সঙ্গে দিনরাত কাটিয়ে, পদ্মগন্ধা তিনবার দশ-হাজার বছর ধরে খেলায় মগ্ন থাকলেন।’’ এরপর তিনি আনন্দিত মনে দেবরাজকে বললেন, ‘‘আমাকে নির্দেশ দিন; আমি এখন পৃথিবীতে যাব।’’ ইন্দ্র বললেন, ‘‘আলস্য ত্যাগ করো, হে সুন্দরকটিভাগিনী, আমার সঙ্গে এখানেই থেকো। তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারি না, তুমি আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়।’’ পদ্মগন্ধা বললেন, ‘‘হে দেবরাজ, যখন আমার পুণ্য শেষ হবে, তখন আমি পৃথিবীতে যাব। তখন তোমার সঙ্গে আমার দীর্ঘ বিচ্ছেদ হবে; বিচ্ছিন্ন হলে, প্রভু, আমি আবার পৃথিবীতে ফিরতে চাই।’’ ‘‘পুনরায় স্বর্গে ফিরে পুণ্য অর্জন করতে চাই; কর্মক্ষেত্রে গিয়ে, যেভাবে হোক, হে বসব—’’ এভাবেই স্বর্গে পদ্মগন্ধার জীবন অতিবাহিত হতে লাগল, তাঁর মন সদা ধর্মে নিবিষ্ট রইল, আর ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মহামূল্যবান হয়ে উঠল।