এইবার আমি PdP 2.8.22-61-এর ধারাবাহিক শ্লোকগুলির ভিত্তিতে একটিই প্রবাহিত, শ্রদ্ধাময়, উজ্জ্বল গল্প বলছি, যথাযথ নাম ও ঘটনাবলী রেখে। যে ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সমস্ত অশুদ্ধি দূর করে, জ্ঞানী হয়ে, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, বিষ্ণুর ধামে গমন করেন; মৃত্যুর মুহূর্তে যে ‘গঙ্গা’ নাম স্মরণ করেন, যা মুক্তি দান করে, তার প্রতি হরির প্রসন্নতা লাভ হয়। মৃত্যুর সময় যার দেহে উৎকৃষ্ট গঙ্গাজল চিহ্ন থাকে, অথবা যে গঙ্গাস্নাত ব্যক্তিকে দেখে মৃতদেহ ত্যাগ করেন—even যদি শ্মশানে হয়, সে গঙ্গায় মৃত্যুর ফল লাভ করে। যতদিন গঙ্গায় কঙ্কাল থাকে, যতদিন দেহ টিকে থাকে, হাজার হাজার যুগ ধরে সে বিষ্ণুর লোকেতে সম্মানিত হয়। যার দেহের ছাই, হাড়, নখ, এমনকি চুল গঙ্গায় ডুবে যায়, হে জ্ঞানী, সে বিষ্ণুর ধামে অধিষ্ঠান করে। যতদিন হাড় গঙ্গায় থাকে, ততদিন মানুষ যে কর্মই করুক, তার সমস্ত ফল আমি ঘোষণা করছি—মনোযোগ দিয়ে শুনো, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ। একবার, শচীশচন্দ্র ইন্দ্র, নানা অলঙ্কারে সজ্জিত, আনন্দের ইচ্ছায়, পদ্মগন্ধা নামে এক যুবতীকে নিয়ে ক্রীড়াভবনে গেলেন। সেই যুবতী, পদ্মের সুগন্ধে ভরা, রুচিতে পারদর্শী, নবযৌবনা হয়ে নানা রকম আনন্দ দিয়ে দেবরাজকে সন্তুষ্ট করল। সহধর্মিণীর স্বর্ণখাটে, ইন্দ্র তুষ্ট ও কামে পরাভূত হয়ে, হরিণীর চোখের মতো পদ্মগন্ধার পায়ে অবস্থান করলেন। তখন ইন্দ্র, অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে, পদ্মগন্ধার গুণে আকৃষ্ট হয়ে, এক স্বর্ণের পানের বাক্স তৈরি করে তাকে দিলেন। সেই মুহূর্তে, সর্বাঙ্গে অলঙ্কারে সজ্জিত, অপূর্ব সুন্দরী পউলোমী (শচী) নিজে সেই ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনি ইন্দ্রকে এইভাবে দেখে, দেবরাজকে দেখে, অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে, সুন্দর মুখে বললেন— “হে দেব, তুমি কী করছ, প্রিয়তম, দেবতাদের অধিপতি হয়েও? তুমি আমার দাসীর কাছে স্বর্ণের পানের বাক্স দিচ্ছ! সব দেবতা তোমার পায়ে মাথা নত করে, অথচ তুমি পদ্মগন্ধার পায়ে হাত দিচ্ছ, সে তো কেবল আমার দাসী! মৌমাছি যদি চাইলেও, সুগন্ধি হবে, কিন্তু খ্যাতি হারাবে; তুমি অসংখ্য সুন্দরীদের স্বামী, সব দীপ্তির অধিপতি, হে প্রভু—তুমি কেমন নিন্দনীয় কাজ করছ? গুণহীন পদ্মগন্ধাকে দূরে সরিয়ে দাও।" “তুমি রাজকুমারীর আসনে, আর ইন্দ্র তোমার পায়ে।”—এইভাবে পউলোমী পদ্মগন্ধাকে নানা উপায়ে তিরস্কার করলেন। পদ্মগন্ধা, সেই মহৎ নারী, রাগে বললেন, “প্রভু নিজেই আমার গুণ ও দোষ জানেন। তুমি কী অধিকার নিয়ে আমাকে অপমান করছ, আমি তো গুণহীন! অন্যেরা দুই চোখে গুণ ও দোষ দুটোই দেখে। হাজার চোখ থাকলেও, যার মন খারাপ, সে কিছুই দেখতে পায় না; মানুষের দোষ ছড়ায়, গুণ নয়।" “চাঁদের কলঙ্ক প্রথমে গুণবান লোকই দেখে; যার বাক্য ক্ষতিকর, যার মন নিষ্ঠুর, যার রূপ কুৎসিত, সে গুণহীন। আমি যদি গুণহীন হই, তবে তোমার স্বামী তোমাকে পূজা করুন।”—এই বলে পদ্মগন্ধা, পদ্মের মতো চোখে, রাগে— স্বর্ণখাট থেকে উঠে, উচ্চস্বরে বিলাপ করলেন। তখন ইন্দ্র বললেন, “প্রিয়তম, আমার জীবনের অধিকারিণী, নারীশ্রেষ্ঠ, তুমি আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ? আমি তোমার প্রতি কী অপরাধ করেছি? বলো, সুন্দরী। আমি তো তোমার দাস, দাসের কাজ করি। দাসের স্ত্রী দাসী হয়; তুমি আমার কথা শুনছ না।” তখন ইন্দ্র, বিভ্রান্ত মনে, উঠলেন ও সেই সুন্দরীকে আবার কোলে বসালেন। শচী বললেন, “কৌঞ্চ পাখির জীবন ধন্য; আমার জীবন বৃথা। তুমি সর্বদা সৌভাগ্যবতী, আমি দুর্ভাগ্যবতী। যতদিন কৌঞ্চের পুণ্য থাকে, ততদিন তার পুণ্য ক্ষয় হবে। কৌঞ্চ বংশে জন্ম নিয়ে, আবার দুঃখ পাবে। ততদিন দেবরাজের সঙ্গে ইচ্ছামতো আনন্দ করো। কতদিন, হে কৌঞ্চ, তুমি গুণহীন হয়ে থাকবে?” শচীর কথা শুনে পদ্মগন্ধা বিস্মিত হলেন। দ্বন্দ্ব ত্যাগ করে, তিনি পউলোমীর সামনে মাথা নত করে বললেন, “হে পউলোমার কন্যা, তুমি যা বলেছ, তা আশ্চর্য। হে কৌঞ্চী, বলো—তুমি কে, কোথায় বাস করো, কীভাবে এখানে এলে? আমি সব জানতে চাই। আমার পুণ্য কতদিনে ক্ষয় হবে?” শচী বললেন, “পূর্বে তুমি কৌঞ্চী ছিলে, পাখিদের মধ্যে জন্মেছিলে, পদ্মের সুগন্ধ ছিল। পৃথিবীতে বাস করত, অপবিত্র মাংস ও কীটপতঙ্গ খেত। গঙ্গার পাড়ে একমাত্র বটগাছ ছিল। সেখানে তুমি বাসা বানিয়ে ঘর করেছিলে। একদিন, এক কালো সাপ সেই বটগাছে ঢুকল। সে তোমার বাসায় ঢুকে হঠাৎ কামড়ে দিল, তুমি মারা গেলে। সেই সাপ রাগে তোমার সমস্ত মাংস খেয়ে ফেলল। তোমার হাড়, মাংসহীন, সেখানে পড়ে রইল। একদিন, প্রবল বাতাসে সেই সাপও বটগাছসহ নিচে পড়ে গেল। ভেঙে গিয়ে গঙ্গায় পড়ে গেল, মূলসহ। যখন সেই বটগাছ গঙ্গায় পড়ল, তখন— তোমার উৎকৃষ্ট হাড় গঙ্গার জলে ধুয়ে গেল। যতদিন তোমার হাড় গঙ্গায় থাকে, ততদিন তারা সেখানে থাকে। সেই সময় পর্যন্ত তুমি তোমার প্রভুর কাছে প্রিয় থাকবে। এইভাবে, হে পদ্মগন্ধা, আমি সব বলেছি। যার পুণ্যের বলে ইন্দ্রও তোমার অধীন। ধন্য হলেন দেবী জাহ্নবী, যার কৃপায়, হে কৌঞ্চী— তুমি এই সৌভাগ্য লাভ করেছ।” এভাবেই গঙ্গার মহিমা, পুণ্য, ও পদ্মগন্ধার পূর্বজন্মের কাহিনি, দেবরাজ ইন্দ্র, শচী ও পদ্মগন্ধার মধ্যকার সম্পর্ক এবং গঙ্গার আশ্চর্য শক্তি ফুটে উঠল এই শ্রদ্ধাময় বর্ণনায়।