রঘুনাথের মহাযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল অপূর্ব আড়ম্বরে। তিনি ব্রাহ্মণদের জন্য দান করতে নির্দেশ দিলেন—ভোজন, দুধ, নির্ভয়তা, সর্বোচ্চ দান, এমনকি সকল প্রকার রত্নও। তিনি বললেন, ‘‘দান কর, দান কর, ধন ও সম্মান দাও—যাকে বলো, সে যেন ভোজন দান করে, সমস্ত ভোগসহ।’’ এইভাবে, জ্ঞানী রঘুনাথের যজ্ঞ শুরু হয়, যথাযথ উপাচারে, শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের দ্বারা সম্পন্ন, সমস্ত মঙ্গলাচরণ পালিত হয়। এরপর রামের ছোট ভাই শত্রুঘ্ন গেলেন তাঁর মায়ের কাছে, সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘‘হে সুন্দরী জননী, আপনার আদেশে আমি এখন অশ্বের রক্ষার্থে যাত্রা করছি। আপনার কৃপায় শত্রুদের দমন করে, মহারাজাদের ও উত্তম অশ্বসহ গৌরবে ভূষিত হয়ে ফিরে আসব।’’ মা স্নেহে বললেন, ‘‘যাও, বীর পুত্র, তোমার পথ শুভ হোক; সব শত্রুদের জয় করে, আবার ফিরে এসো, জ্ঞানীজন।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘তুমি তোমার ভাইপো, ধর্মজ্ঞানী, শক্তিশালী, কিন্তু এখনো শিশুসুলভ ও চঞ্চল পুষ্কলকে রক্ষা করবে। তুমি যদি পুষ্কলকে সঙ্গে নিয়ে, কল্যাণময় হয়ে ফেরো, তবে আমার আনন্দ হবে; নচেৎ আমি দুঃখে ক্লিষ্ট হব।’’ মায়ের এ কথা শুনে শত্রুঘ্ন বললেন, ‘‘আপনার চরণ যুগল স্মরণ করে আমি মঙ্গল লাভ করব। পুষ্কলকে নিজের অঙ্গের মতো রক্ষা করব, ও সুন্দরী, এবং তাঁকে আমার নামে যোগ্য করব, আনন্দভরে ফিরে আসব।’’ এই বলে তিনি রামের যজ্ঞশালায় গেলেন, যেখানে রাম মুনিদের মাঝে, যজ্ঞবস্ত্রধারী, আসীন ছিলেন। শত্রুঘ্ন বললেন, ‘‘রাম, অশ্বরক্ষার জন্য আমাকে আদেশ দিন, আপনার অনুমতি নিয়ে আমি যাত্রা করতে প্রস্তুত।’’ রঘুনাথ বললেন, ‘‘কল্যাণ হোক। কিন্তু মনে রেখো, কোনো শিশু, নারী, মত্ত ব্যক্তি কিংবা নিরস্ত্রকে হত্যা করবে না।’’ তখন লক্ষ্মীনিধি, জনকীর পুত্রের ভাই, মৃদু হাসলেন ও চোখের ইঙ্গিতে রামের প্রতি বললেন, ‘‘রাম, মহাবাহু, সর্বধর্মে নিষ্ঠ, তুমি শত্রুঘ্নকে এমনভাবে শিক্ষা দাও, যাতে সে মানুষের মধ্যে অতুলনীয় হয়। সে যেন বংশধর্ম পালন করে, বড় ভাইয়ের আচরণ অনুসরণ করে, দীপ্তি ও শক্তিসম্পন্ন হয়ে শ্রেষ্ঠ গতি লাভ করে।’’ এরপর লক্ষ্মীনিধি বলেন, ‘‘হে মহারাজ, যেমন তুমি বলেছ, ব্রাহ্মণকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়; তোমার পিতা পুত্রস্নেহে ব্রাহ্মণবধ করেছিলেন। তুমিও এক মহৎ কাজ করেছ, যদিও সমাজে নিন্দিত, কারণ তুমি এক নারীকে হত্যা করেছ, যিনি হত্যার যোগ্য ছিলেন না। আবার তোমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাও সনক মুনির আদেশে এক রাক্ষসীর কর্ণচ্ছেদ করেছিলেন। এইভাবে, তোমার নির্দেশ অনুসারে শত্রুঘ্নও কাজ করবে; নচেৎ সে বংশের যোগ্য হবে না।’’ রাম মৃদু হাস্যে, মেঘগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘‘শান্ত যোগীরা, যারা সুখ-দুঃখে সম, তারা পুনরায় শুনুন; তারা সংসার-সমুদ্র পার হবার উপায় জানেন। কিন্তু যারা বীর, ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী, অস্ত্র-শস্ত্রে নিপুণ, তারাই যুদ্ধের প্রকৃত রহস্য বোঝেন, তোমাদের মতো জনেরা নন। যারা অপরকে কষ্ট দেয়, ধর্মচ্যুত হয়—তাদের রাজারা এবং লোককল্যাণকামী সবাই হত্যা করাই কর্তব্য।’’ রামের এ কথা শুনে সভাসদগণ হাসলেন, শত্রুদমনকারী শত্রুঘ্নের প্রতি প্রশংসাসূচক দৃষ্টি দিলেন। সমুদ্রজাতা অশ্বটি সম্মানিত হয়ে মুক্তি পেল। তখন কুম্ভজন্মা ঋষি বসিষ্ঠ মন্ত্রোচ্চারণ করে অশ্বকে স্পর্শ করে মুক্তি দিলেন, বিজয়ের কামনায়। বসিষ্ঠ বললেন, ‘‘যাও অশ্ব, পৃথিবীর সর্বত্র ইচ্ছামতো ঘুরে এসো; যজ্ঞার্থে তোমাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে—যিনি ছেড়েছেন, তাঁর কাছে শীঘ্র ফিরে এসো।’’ অস্ত্র ও শস্ত্রে দক্ষ যোদ্ধাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অশ্বটি বাতাসের মতো দ্রুত পূর্বদিকে চলল। বিশাল সেনাবাহিনী অগ্রসর হতে লাগল, ভূ-পৃষ্ঠ কেঁপে উঠল; এমনকি শেষনাগও সেই সময় ভূমিকে ধারণ করলেন না। চারদিক পরিষ্কার হয়ে উঠল, ধরিত্রী অলঙ্কৃত হলো; শত্রুঘ্ন ধীরে ধীরে চললে, পেছনে বাতাসও যেন অনুসরণ করল। তখন শত্রুঘ্ন যাত্রা শুরু করলে তাঁর দক্ষিণ বাহু কেঁপে উঠল—এটি ছিল বিজয়ের শুভলক্ষণ। এদিকে পুষ্কল নিজ গৃহে প্রবেশ করলেন, যা ছিল রাজপ্রাসাদসম, বারান্দা ও অসংখ্য রত্নে শোভিত, রত্নমণ্ডিত মঞ্চে দীপ্তিমান। সেখানে তিনি দেখলেন তাঁর পত্নীকে, স্বামীনিষ্ঠ, স্বামীর দর্শনে উৎসুক, কিছুটা সাহসী হয়ে উঠেছেন। তাঁর মুখ ছিল পদ্মের মতো, তিনি চিবোচ্ছিলেন সুগন্ধি কর্পূর মেশানো পান; নাকের নথ ছিল জলজ রত্নের, বাহুতে ছিল পদ্মডাঁটার মতো সুন্দর বালা। তাঁর স্তন ছিল পাকা বেলের মতো, কটিদেশে মনোহর কটিবন্ধ, পায়ে কোমল নূপুর—তিনি তাঁর স্বামীকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলেন। পুষ্কল দৃঢ়চিত্তে তাঁর প্রিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন; স্ত্রীর কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ, তিনি স্বামীর বুকে স্নেহে লেপ্টে রইলেন। পুষ্কল বললেন, ‘‘প্রিয়, আমি শত্রুঘ্নের পশ্চাদ্বারী রক্ষক হয়ে, রামের আদেশে অশ্বরক্ষার জন্য রথসহ যাচ্ছি। তুমি আমার মাতাদের সেবা করবে, তাঁদের পায়ে মালিশ করবে এবং তাঁদের পরে অবশিষ্ট অন্নই গ্রহণ করবে, এই কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘সমস্ত পত্নীগণ, লোপামুদ্রা প্রমুখ, যাঁরা স্বামীনিষ্ঠ, তাঁদের তুমি যথাযথ সম্মান করবে, হে লাজুকিনী, কারণ তাঁরা নিজেদের তপস্যাবলে দীপ্তিমান।’’ শেষ বললেন, স্বামীর এ কথা শুনে তাঁর পত্নী গভীর স্নেহে, হালকা হাসি ও কিছুটা কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দিলেন...