তখন, মহাত্মা পুষ্কস নিজের অহংকার, কামনা ও দুষ্টতা পরিত্যাগ করতে মনস্থির করলেন। নিজের কল্যাণ ও সত্য উপলব্ধি করে তিনি দৃঢ়চিত্ত হলেন। তিনি সুন্দরী পত্নীকে বললেন, ‘‘আজ, প্রিয়তমে, আমি তীক্ষ্ণ তরবারির শপথে এই দেহ ত্যাগ করব। আমার জন্য দীর্ঘজীবনের আর কোনো অর্থ নেই।’’ এভাবে বলার পর, তিনি নিজের তরবারি বের করলেন এবং নিজেকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন। ঠিক সেই সময়, শিবের প্রেরিত বহু গন এসে উপস্থিত হলেন। অসংখ্য দিব্য যান সেখানে এসে দাঁড়াল। সেইসব যান ও গনদল দেখে পুষ্কস বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। গভীর ভক্তি নিয়ে পুষ্কস তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘হে রুদ্রাক্ষধারীরা, তোমরা এখানে কেন এসেছো?’’ তারা সকলেই স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো দীপ্তিমান, চন্দ্রশিখা অলংকৃত, জটাজুটধারী, চামড়ার বস্ত্র পরিহিত এবং সাপের মালা পড়ে আছেন। তারা সকলেই মহিমায় উজ্জ্বল, শক্তিতে রুদ্রের সমান। পুষ্কস বললেন, ‘‘হে মহাশয়গণ, যথাযথভাবে আমাকে বলুন।’’ তখন রুদ্রের সঙ্গীরা বললেন, ‘‘ভয়ংকর শিব, সর্বোচ্চ প্রভুর আদেশে আমরা এসেছি। তুমি ও তোমার পত্নী দ্রুত এই যানবাহনে আরোহণ করো।’’ তারা জানালেন, ‘‘তুমি রাতে শিবলিঙ্গের যে পূজা করেছো, সেই কর্মের ফলে তুমি পরম অবস্থায় পৌঁছেছো।’’ বীরভদ্রের মুখে এই কথা শুনে পুষ্কস প্রায় হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘আমি তো পাপী, আমি আবার কী সুকর্ম করেছি? আমি তো শিকারপ্রিয়, মূর্খ ও দুষ্ট, সব সময় পাপাচারী ছিলাম। স্বর্গে আমি কীভাবে বাস করতে পারি?’’ তিনি কৌতূহলভরে জানলেন, ‘‘আজ কীভাবে শিবলিঙ্গের পূজা হল? দয়া করে বলুন।’’ বীরভদ্র বললেন, ‘‘আজ দেবতাদের দেবতা, গঙ্গাধর মহাদেব, তোমার ও তোমার স্ত্রীর প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। আজ তুমি কোলা গাছ ও বিল্বপাতা লক্ষ্য করে যেভাবে আচরণ করেছো, তা-ই পূজা হয়ে গেছে। তুমি যেসব পাতা কাটলে ও ফেললে, সেগুলো লিঙ্গের মাথায় পড়েছিল। সেই কারণেই তুমি ধন্য হয়েছো। মহাবৃক্ষের ওপর তোমার জাগরণও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর সেই জাগরণের ফলেই বিশ্বেশ্বর প্রসন্ন হয়েছেন।’’ ‘‘শিবরাত্রির রাতে, কেবল কোলা ফল দেখিয়ে, তুমি অনিচ্ছাকৃত উপবাস পালন করেছিলে। সেই উপবাস ও জাগরণের ফলে মহাসত্ত্বা ঈশ্বর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তোমার জন্য সমস্ত বর প্রদান করেছেন।’’ এইভাবে বীরভদ্রের বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ বচন শুনে, পুষ্কস সকলের সামনে শ্রেষ্ঠ দিব্যরথে আরোহণ করলেন। তখন দেবতা, গন্ধর্ব, অপ্সরা ও সমস্ত জীবের মধ্যে বিরাট বাদ্যযন্ত্র, ঢাক, শঙ্খ, নানান সঙ্গীত বাজতে লাগল। বীণা, বাঁশি, ঢোলের সঙ্গে নৃত্য ও নাট্য পরিবেশিত হল; গন্ধর্বরাজেরা গাইলেন, অপ্সরাদল নৃত্য করলেন। চামরায় পাখা ও নানা ছাতায় ছায়া দিয়ে, তাঁকে মহা উল্লাসে শিবের সামনে নিয়ে যাওয়া হল। পুষ্কস পুণ্যতীর্থে স্নান ও শিবপূজার ফল লাভ করলেন—তাহলে যারা ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে শিবের পূজা করেন, তাঁদের কত বড়ো আশীর্বাদ হয়! যারা এই পৃথিবীতে শিবকে ফুল, ফল, গন্ধ, পান বা চাল নিবেদন করেন, সন্দেহ নেই, তারাও রুদ্ররূপ লাভ করেন। মহাদেব বললেন, ‘‘সেই সময় থেকে এই তীর্থ খঙ্গধার নামে পরিচিত হল। হে দেবী, কলিযুগে এই তীর্থ গোপন থাকবে। মাঘ, বৈশাখ, বিশেষত কার্তিক মাসে এখানে যারা স্নান করেন, তারা মুক্তি লাভ করেন। বসিষ্ঠ, বামদেব, ভরদ্বাজ ও গৌতম এখানে স্নান ও পিনাকীনের দর্শনে আসেন।’’ ‘‘তিন যুগ পর্যন্ত এখানে লিঙ্গ থাকে, কিন্তু কলিযুগে নয়, পার্বতী। তখন আমি ঋষি বিশ্বামিত্রের অভিশাপে আক্রান্ত হয়েছিলাম।’’ পার্বতী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘হে দেবেশ, সেই ঋষির অভিশাপ কেমন ছিল? আমি শুনতে চাই।’’ মহাদেব বললেন, ‘‘একদিন, মহান তপস্বী বিশ্বামিত্র এই আশ্চর্য খঙ্গধার তীর্থে এলেন। তিনি নিয়মমাফিক স্নান করে আমাকে দর্শন করলেন এবং নানা উপায়ে পূজা করতে লাগলেন।’’ ‘‘সেই সময়, এক মহাপাপী কৌলিক, পাপরূপ ধারণ করে, শিবের ওপর মাংস নিবেদন করল। তা দেখে বিশ্বামিত্র বললেন, ‘এটি এক পাপীর কুকর্ম।’ তিনি দেখলেন, শর্বরূপ সর্বোচ্চ আত্মা শিব সেই পাপীর কোনো শাস্তি দেননি। তখন বিশ্বামিত্র স্থির করলেন, ‘আমি অভিশাপ দেব, কোনো সন্দেহ নেই।’’ ‘‘এইভাবে ভেবে, তখন তিনি আমাকে অভিশাপ দিলেন, ‘এই ভয়ঙ্কর কলিযুগে তুমি সম্পূর্ণ গোপন থাকবে।’ এই অভিশাপ উচ্চারণ করে ঋষি চলে গেলেন।’’ ‘‘সেই সময় থেকে, হে দেবী, আমি ঋষির অভিশাপে গোপনে রয়েছি। কেউ যদি আমার নির্দিষ্ট স্থানে পূজা করে—তাদের সমস্ত পাপ মুহূর্তে নষ্ট হয়। যারা মাটি দিয়ে আমার মূর্তি গড়ে পূজা করে—’’ ‘‘বিশেষত যারা এখানে থাকেন, তারা কলিযুগে খঙ্গধারেশ্বর নামে পরিচিত হন। কৃতযুগে একে মন্দিরা বলা হত, ত্রেতায় গৌরব, দ্বাপরে সর্বত্র প্রসিদ্ধ ছিল; কলিযুগে একে খঙ্গেশ্বর নামে স্মরণ করা হয়।