সত্কর্ম ও ধর্মাচরণের নিয়মাবলী নিয়ে শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মানুষ যেন কখনো অনুচিতভাবে না ঘুমায়; বরং পূর্ব বা দক্ষিণ দিকে মুখ করে ঘুমানোই শ্রেয়। আহারের সময় পূর্বদিকে মুখ করলে আয়ু বৃদ্ধি পায়, দক্ষিণদিকে মুখ করলে কুখ্যাতি হয়। পশ্চিমমুখে আহার করলে ধনলাভ হয়, উত্তরমুখে খ্যাতি পাওয়া যায়; আবার পূর্বদিকে মুখ করলে দীর্ঘায়ু, দক্ষিণদিকে মুখ করলে পিতৃগতি লাভ হয়। পশ্চিমে মুখ করলে রোগ হয়, উত্তরদিকে মুখ করলে আয়ু ও ধন লাভ হয়। দেবতারা দিনে একবার আহার করেন, মানুষ দুইবার। পিতৃগণ ও অসুরেরা তিনবার, আর শবভোজীরা চারবার আহার করে। দেবতারা নিরামিষ অন্ন গ্রহণ করেন, মানুষ মাছ-মাংস খায়। অন্যরা পচা, বাসি, ও উন্মুক্ত খাদ্য ভক্ষণ করে। স্বর্গে যারা বাস করেন, তাদের হৃদয়ে এই পৃথিবীতে চারটি গুণ বিরাজমান— উৎকৃষ্ট দান, মধুর ভাষণ, দেবপূজা, ও ব্রাহ্মণ সন্তুষ্টি। অন্যদিকে কৃপণতা, স্বজন নিন্দা, দারিদ্র্য, ও নীচজনদের প্রতি ভক্তি— এগুলি নিম্নগতি নির্দেশ করে। অতিরিক্ত ক্রোধ ও কঠোর ভাষা যাঁর মধ্যে থাকে, তিনি নরকে যাবেন; আর যাঁর কথা নবমাখনের মতো কোমল, যাঁর হৃদয় করুণাময় ও নম্র, তিনিই ধর্মবীজজাত। যার হৃদয়ে দয়া নেই, কথা করাতের মতো কঠিন— তিনি পাপবীজজাত। ধর্মাচরণ শোনা বা পাঠে, এর ফল লাভ করে পাপ থেকে মুক্ত হয়ে অক্ষয় স্বর্গে পৌঁছানো যায়। একদিন ভীষ্ম জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রাহ্মণ, এই জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ কোন পুণ্য, যা সকলেই সর্বদা শ্রদ্ধা করে, এবং প্রাচীনরা স্বেচ্ছায় যা পালন করতেন?” পালস্ত্য মুনি বললেন, একসময় ব্যাসদেবের শিষ্য সকল দ্বিজেরা ভক্তিসহ ব্যাসদেবকে প্রণাম করে ধর্মসংক্রান্ত প্রশ্ন করেছিলেন এবং আমাকেও আজকের মতো জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তাঁরা জানতে চাইলেন, "সব ধর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ পুণ্য কোনটি? মানুষের স্বর্গ ও অক্ষয় ফল লাভের উপায় কী? সকল বর্ণের জন্য সহজ ও শুদ্ধ এমন কোন একটি আচরণ আছে কি, যা সকলেই পালন করতে পারে?" তখন ব্যাসদেব উত্তর দিলেন, “আমি পঞ্চবিধ কীর্তি বলব, শুনো। এই পাঁচটির যেকোনো একটি পালন করলেই মুক্তি, স্বর্গ ও খ্যাতি লাভ হয়। পিতা-মাতার পূজা, স্বামীর পূজা, সকলের প্রতি সমতা, বন্ধুকে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা না করা, এবং বিষ্ণুভক্তি— এই পাঁচটি মহাযজ্ঞ। বিশেষত পিতামাতার পূজা করলে যে ফল হয়, তা শত যজ্ঞ বা তীর্থযাত্রাতেও হয় না। পিতা ধর্ম, পিতা স্বর্গ, পিতা সর্বোচ্চ তপস্যা; পিতা সন্তুষ্ট হলে সকল দেবতা সন্তুষ্ট হন। যিনি পিতা-মাতার সেবা ও সদাচরণে তাঁদের সন্তুষ্ট করেন, তাঁর জন্য গঙ্গাস্নান প্রতিদিন সম্পন্ন হয়। মা সকল তীর্থ, পিতা সকল দেবতা; যে পুত্র মা-বাবার চারপাশে প্রদক্ষিণ করেন, সে যেন সমগ্র পৃথিবী প্রদক্ষিণ করল। যে হাঁটু ও হাতে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে পিতামাতাকে প্রণাম করে, সে স্বর্গ লাভ করে। যতদিন পিতামাতার চরণের ধুলা তার মাথায় থাকে, সে পবিত্র থাকে; যে পিতামাতার পদজল পান করে, তার কোটি জন্মের পাপ নাশ হয়।” “এভাবে সে লোকশ্রেষ্ঠ ও পাপমুক্ত হয়। একজন্মে সে বিনায়কের অবস্থায় পৌঁছায়; কিন্তু যে অধম সন্তান পিতামাতাকে কটু কথা বলে, সে সৃষ্টির অন্ত পর্যন্ত নরকে থাকে। যে কুলাঙ্গার পুত্র পিতামাতার সেবা করে না, সে কৃমির গর্তে এক কল্পকাল কাটায়। যে পুত্র পিতার অন্ধত্ব, বধিরতা বা কষ্টে তাঁকে ছেড়ে দেয়, সে রৌরব নরকে পড়ে ও চণ্ডাল, ম্লেচ্ছ, বা অধম জাতিতে জন্ম নেয়। পিতামাতার সেবা না করলে সমস্ত পুণ্য বিনষ্ট হয়; তীর্থ ও দেবপূজা করলেও পিতামাতার পূজা ছাড়া কিছুই লাভ হয় না। তখন সে পতঙ্গের মতো পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়।” “এ বিষয়ে আমি এক প্রাচীন কাহিনি বলছি, মনোযোগ দিয়ে শুনো। শুনলে ভবিষ্যৎ জন্মে আর কখনো মোহ হবে না। একসময় এক ব্রাহ্মণ ছিলেন, যিনি পিতামাতাকে অবহেলা করে তীর্থসেবা করতে গিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন পবিত্র স্থানে ঘুরতেন এবং তাঁর স্নানের কাপড় প্রতিদিন আকাশে শুকাতেন। এতে তাঁর মনে অহংকার জন্মাল— 'আমার মতো পুণ্যবান ও বিখ্যাত আর কেউ নেই।’ তখন এক সারস পাখি তাঁকে কিছু বললে, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে অভিশাপ দিলেন; সারসটি মাটিতে পড়ে ছাই হয়ে গেল। ব্রাহ্মণ তখন মৃত্যুর ভয়ে ও বিভ্রান্তিতে পড়লেন; পাপের ফলে তাঁর কাপড় ও শরীর আকাশে উঠল না। তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন। তখন আকাশবাণী হল, 'হে ব্রাহ্মণ, যাও, মূক চণ্ডালের কাছে; সে মহাপাপী, তার কাছেই ধর্ম শিখবে।’ এই কথা শুনে ব্রাহ্মণ মূকের ঘরে গেলেন। সেখানে তিনি দেখলেন, সেই মূক চণ্ডাল প্রতিটি কাজে পিতামাতার সেবা করছে, শীতকালে তাঁদের জন্য গরম জল দিচ্ছে।” এভাবেই শাস্ত্রে পিতামাতার সেবা ও ধর্মাচরণের শ্রেষ্ঠত্ব, অহংকারের কুফল, এবং সত্যিকার পুণ্যের পথ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।