অসুরদের এক মহা যজ্ঞের ফলে দেবতাদের ওপর এক ভয়ংকর বিপদ নেমে আসে। দেবতারা চরম দুঃখে নিপীড়িত হলে কুমার কার্ত্তিকেয় ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তখন তিনি তাঁর অসাধারণ অস্ত্রসম্ভার নিয়ে অসুর সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান। তাঁর অপ্রতিরোধ্য অস্ত্রবৃষ্টিতে দেবতাদের শত্রুরা পরাজিত ও বিধ্বস্ত হয়। কালনেমি-নেতৃত্বাধীন সমস্ত অসুর যুদ্ধে পিছু হটে পালাতে থাকে, আর যেখানেই তারা পালাতে চেষ্টা করে, সেখানেই তারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কিন্নরদের গীত ও হাসির মধ্যে কুমার তাঁর সোনার মতো দীপ্তিমান গদা নিয়ে অসুরদের আঘাত করতে থাকেন। যুদ্ধের সময় তাঁর বর্ণিল তীরের আঘাতে ময়ূর বাহনও পিছু হটে যায়; সেই বাহন রক্তাক্ত ও বিমুখ হলে দেবতা কুমার দুঃখ পান। তখন ষড়ানন স্বর্ণালঙ্কারে শোভিত এক পবিত্র শক্তি হাতে তুলে নেন, তাঁর বাহুতে সোনার কঙ্কণ দীপ্তি ছড়ায়। এরপর মহাসেন অসুররাজ তারককে সম্বোধন করে বলেন, ‘‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, দুষ্টচিন্তাধারী! যমলোকের দৃশ্য দেখো। আমি এই শক্তি দিয়ে তোমাকে হত্যা করব; অসুররূপে তোমার কৃতকর্ম স্মরণ করো।’’ এই বলে তিনি দিতিপুত্র তারকার দিকে সেই শক্তি নিক্ষেপ করেন। কুমারের বাহু থেকে মুক্তি পাওয়া সেই শক্তি তাঁর কঙ্কণের ধ্বনিসহ বজ্র বা পর্বতের মতো কঠিন হৃদয় বিদীর্ণ করে অসুরের প্রাণনাশ করে। তারকা প্রাণত্যাগ করে ভূপৃষ্ঠে পড়ে যান, প্রলয়ের সময় ভেঙে পড়া পর্বতের মতো, তাঁর মুকুট, পাগড়ি ও অলংকার সব ছিটকে পড়ে। যখন অসুরদের এই ভারবাহক তারকা নিহত হলেন, তখন কেউই শোক প্রকাশ করেনি, এমনকি পাতালবাসী দুষ্টরাও নয়। দেবতারা তখন ষণ্মুখকে স্তব করতে করতে আনন্দে হাসিমুখে খেলায় মেতে ওঠে এবং আগ্রহভরে নিজ নিজ লোকালয়ে ফিরে যায়। সকল দেবতা, তুষ্ট ও অভীষ্টলাভ করে, তপস্যাশক্তিধর মুনিদের সঙ্গে নিয়ে ষণ্মুখকে বরদান করেন। তাঁরা বলেন, ‘‘যে মহাবুদ্ধিমান ব্যক্তি স্কন্দের এই কাহিনি পাঠ করবে, শুনবে বা অন্যকে শুনাবে, সে মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধ হবে।’’ তাঁরা আরও বলেন, ‘‘সে দীর্ঘায়ু, সৌভাগ্যবান, ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ, কীর্তিমান ও শুভদর্শন হবে; সকল প্রাণীর মাঝে নির্ভয় ও সকল দুঃখ থেকে মুক্ত থাকবে। যে ব্যক্তি প্রভাতবেলার আরাধনা শেষে স্কন্দের কীর্তি পাঠ করবে, সে কিন্নরদের সঙ্গে মহাসম্পদের অধিপতি হবে।’’ এ পর্যায়ে ভীষ্ম বললেন, ‘‘এবার আমি হিরণ্যকশিপুর বধ, নৃসিংহের মহিমা ও পাপ বিনাশের কাহিনি শুনতে চাই।’’ পুলস্ত্য ঋষি বললেন, ‘‘রাজন, এক কৃতযুগে অসুরদের অধিপতি ও আদি পুরুষ হিরণ্যকশিপু মহাতপস্যায় ব্রতী হন। তিনি দশ হাজার বছর এবং আরও এক হাজার বছর জলাশয়ে বাস করে স্নান ও মৌনব্রত পালন করেন। তাঁর মধ্যে ছিল প্রশান্তি, সংযম ও ব্রহ্মচর্য; ব্রহ্মা তাঁর এই তপস্যায় সন্তুষ্ট হন। এরপর স্বয়ম্ভূ, সেই পুণ্যবান ভগবান, সূর্যসম দীপ্তিমান এক বিমানে, হামসযানে চড়ে, সেখানে উপস্থিত হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আদিত্য, বসু, সাধ্য, মরুদ, রুদ্র, বিশ্ব, যক্ষ, রাক্ষস, সর্প, দিক্পাল, নদী, সাগর, নক্ষত্র, মুহূর্ত, দেবতা, বৃহৎ গ্রহ, ব্রহ্মর্ষি, সিদ্ধ, সপ্তর্ষি, রাজর্ষি, সজ্জন, গন্ধর্ব ও অপ্সরারা—সবাই তাঁর সঙ্গে এসেছেন। সব দেবতাদের মাঝে অবস্থানরত, সকল প্রাণীর আচার্য, ব্রহ্মা, সেই অসুরকে বলেন, ‘‘তোমার এই তপস্যা ও ভক্তিতে আমি সন্তুষ্ট; বর চাও, শুভ হোক, যা চাও তাই লাভ করো।’’ তখন হিরণ্যকশিপু বর চেয়ে বলেন, ‘‘দেবতা, অসুর, গন্ধর্ব, যক্ষ, সর্প, রাক্ষস, মানুষ, পিশাচ—কেউ যেন আমাকে হত্যা করতে না পারে। মুনিরা বা মানুষও যেন আমাকে অভিশাপ দিতে না পারে। অস্ত্র, শস্ত্র, পর্বত, বৃক্ষ, শুকনো বা ভেজা কিছু, কিংবা অন্য কিছু দিয়েও যেন আমার মৃত্যু না হয়। আমি সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, জল, আকাশ, নক্ষত্র, দশ দিক—এসব হয়ে উঠি। আমি ক্রোধ, কাম, বরুণ, ইন্দ্র, যম, ধনাধিপতি, যক্ষ ও কিম্পুরুষদের অধিপতি হয়ে উঠি।’’ ব্রহ্মা বলেন, ‘‘প্রিয়, এই দেবতুল্য আশ্চর্য বর আমি তোমাকে দিলাম; সন্দেহ নেই, তুমি তোমার সমস্ত ইচ্ছা পূর্ণ করবে।’’ এই বলে পুণ্যবান ব্রহ্মা ব্রহ্মর্ষিদের সঙ্গে নিয়ে স্বর্গলোকে চলে যান। এরপর দেবতা, গন্ধর্ব, মুনি ও চারণরা বরপ্রদান শুনে ব্রহ্মার কাছে এসে বলেন, ‘‘প্রভু, এই বর দিয়ে সেই অসুর আমাদের নিশ্চয়ই হত্যা করবে; অতএব, প্রভু, তাঁর মৃত্যুর উপায়ও বিবেচনা করুন।’’ তখন স্বয়ম্ভূ, সমস্ত সৃষ্টির আদি কর্তা, দেবতা ও পিতৃপুরুষদের যজ্ঞগ্রাহী, নিরাকৃতি মহাশক্তিমান প্রজাপতি তাঁদের মঙ্গলার্থে কোমল ও শান্তবাক্যে সান্ত্বনা দেন। তিনি বলেন, ‘‘তাঁর তপস্যার ফল অবশ্যই তাঁকে পেতে হবে; কিন্তু তাঁর তপস্যা শেষে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং তাঁর মৃত্যু সাধন করবেন।’’ পদ্মজ ব্রহ্মার এই কথা শুনে দেবতারা আনন্দিত মনে নিজ নিজ স্বর্গলোকে ফিরে যান। বরলাভের সঙ্গে সঙ্গেই হিরণ্যকশিপু সেই বরকে নিয়ে গর্বিত হয়ে সমস্ত জগতের প্রাণীদের নিপীড়ন করতে শুরু করেন।