অগ্নি একদিন বরের রূপ ধারণ করে এক পাখির গর্ত দিয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি তখন সবকিছু দেখতে পেলেন—শিব ও গিরিজা প্রেমালাপরত অবস্থায় শয়ান। দেবতাদের ঈশ্বর শিব তখন অগ্নিকে বরের রূপে দেখে কিছুটা ক্রুদ্ধ হয়ে মহাদেব বললেন, ‘‘আমার বীর্যের অর্ধেক গিরিজার মধ্যে স্থাপিত হয়েছে, আর বাকি অর্ধেক, যা বরের রূপে রয়েছে, তা থেকে তুমি পান করো, হে অগ্নি। লজ্জাবশত দেবী তা গ্রহণ করছেন না; তুমি এই দায়িত্ব নাও।’’ শিব আরও বললেন, ‘‘তুমি যেহেতু এই বাধা সৃষ্টি করেছ, তাই এই দায়িত্বও তোমার ওপর পড়ল।’’ শিব এভাবে বলার পর অগ্নি ভক্তিভরে হাত জোড় করে সেই শক্তিশালী বীর্য পান করলেন। এরপর সেই বীর্যের দ্বারা দেবতারা পূর্ণ হলেন, এবং তাঁদের মুখ থেকে ঋভুগণ জন্ম নিলেন; আবার তাঁদের উদর ফেটে বেরিয়ে এল শিবের মহাশক্তি। সেই শক্তি গলিত সোনার মতো দীপ্তিমান হয়ে শংকরের বিস্তীর্ণ আশ্রমভূমিতে এক বিশাল, পবিত্র হ্রদের সৃষ্টি করল, যা বহু যোজন বিস্তৃত। সেই হ্রদে সোনালি পদ্মে ভরা ছিল, অসংখ্য পাখির কূজন ধ্বনিত হচ্ছিল। দেবী সে কথা শুনলেন—সেখানে এক মহান সোনালি পদ্মের আবির্ভাব হয়েছে। কৌতূহলে উত্সুক হয়ে দেবী সেই সোনালি পদ্মভরা হ্রদে গেলেন; সেখানে তিনি জলে খেললেন এবং পদ্মফুল দিয়ে নিজেকে অলংকৃত করলেন। এরপর, হ্রদের তীরে সখীদের সঙ্গে বসে দেবী ইচ্ছা প্রকাশ করলেন—তিনি সেই মধুর, পবিত্র, পদ্মভরা জল পান করতে চান। তখন তিনি ছয়জন কৃত্তিকা দেবীকে দেখলেন, যারা সূর্যের মতো দীপ্তিমান। তাঁরা পদ্মপাতায় জল নিয়ে দেবীর কাছে এলেন। দেবী আনন্দিত হয়ে বললেন, ‘‘আমি এই পদ্মপাতায় বিশ্রান্ত জল পান করব।’’ তখন কৃত্তিকা দেবীরা হিমালয়-কন্যাকে বললেন, ‘‘প্রিয়, তোমার গর্ভে যে জন্ম নেবে, সে আমাদেরও পুত্র হবে, সে আমাদের রক্ষা করবে ও সদাচারী হবে।’’ ‘‘সে তিনলোকেই বিখ্যাত হবে, হে শুভমুখী।’’ গিরিজা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আমার শরীর থেকে জন্ম নেওয়া পুত্র তোমাদের কীভাবে হবে?’’ ‘‘সে কি সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তোমাদেরও সন্তান হবে?’’ কৃত্তিকারা বললেন, ‘‘আমরা তা ব্যবস্থা করব।’’ গিরিজা বললেন, ‘‘তবে শ্রেষ্ঠ অঙ্গ শ্রেষ্ঠরাই পাক, এভাবেই হোক, যেন কারও কোনো দোষ না থাকে।’’ কৃত্তিকারা আনন্দে সেই পদ্মপাতার জল দেবীর হাতে দিলেন; দেবী তা চুমুক দিয়ে পান করলেন। জল পান করার সঙ্গে সঙ্গেই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল—দেবীর ডান পাশ থেকে এক বরদানব বেরিয়ে এলেন। এক আশ্চর্য বালক জন্ম নিলেন, রোগ ও দুঃখের বিনাশকারী, অসংখ্য সূর্যকিরণের মতো দীপ্তিমান, দেবসেনার অধিপতি। তাঁর হাতে ছিল বিশুদ্ধ ও মহৎ অস্ত্র—শূল, ত্রিশূল, অঙ্কুশ ও অগ্নি; তিনি দুর্জয় অসুরদের বিনাশের জন্য আবির্ভূত, তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল সোনার মতো। এইভাবেই কুমারের জন্ম হল। তারপর দেবীর বাম পাশ বিদীর্ণ করে আরেকটি সন্তান বেরিয়ে এল। অগ্নির মুখ থেকে, বিশেষ করে কৃত্তিকার জলের দ্বারা, শুদ্ধ ও ছয় মুখবিশিষ্ট স্কন্দ জন্ম নিলেন, যার ছয়টি মুখ ও ছয়টি শাখা ছিল। এই ছয় শাখা শুভ বলে পরিচিত, তাই তিনি বিশ্বে বিষাখ ও ষণ্মুখ নামে খ্যাত। স্কন্দ, বিষাখ, ষণ্মুখ ও কার্তিকেয়—এই নামেই তিনি প্রসিদ্ধ। চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চদশীতে, তাঁরা সূর্যের মতো দীপ্তিমান হয়ে বিশাল শরণবনে জন্মগ্রহণ করেন; শুক্লপক্ষের পঞ্চমীতে, অগ্নিসম্ভূত দুই সন্তান জ্বলে উঠলেন। দুই বালককে একত্রিত করে সন্ধ্যাবেলায় একত্রিত করা হল, সত্তার জন্য; ষষ্ঠী তিথিতে গুহ দেবতার অভিষেক সম্পন্ন হল। ব্রহ্মা, উপেন্দ্র, ইন্দ্র, ভাস্কর—সমস্ত অমরগণ সুগন্ধি মালা, মঙ্গলধ্বনি, খেলনা নিয়ে তাঁকে অভিষিক্ত করলেন। উপযুক্ত নিয়মে ছাতা, চামর, মালা, অলংকার, চন্দন প্রভৃতি দিয়ে ছয়মুখী মহাবলবান দেবতাকে অভিষিক্ত করা হল। ইন্দ্র তাঁকে তাঁর কন্যা, প্রসিদ্ধ দেবসেনাকে পত্নী হিসেবে দিলেন; দেবরাজ বিষ্ণু তাঁকে এক দিব্য অস্ত্র দান করলেন। ধনাধিপতি তাঁকে এক লক্ষ যক্ষ দিলেন; অগ্নি দিলেন তাঁর দীপ্তি, বায়ু দিলেন বাহন। ত্বষ্টা দিলেন এক খেলনা—মনোমত পরিবর্তনশীল মোরগ। এভাবে সকল দেবতা তাঁকে অসংখ্য সঙ্গী ও অনুসারী দিলেন। আনন্দে উজ্জ্বল দেবতারা এইসব উপহার স্কন্দকে দিলেন; তারপর তাঁরা ভূমিতে নতজানু হয়ে তাঁকে স্তব করলেন। দেবতারা বললেন, ‘‘কুমার, তোমায় প্রণাম; স্কন্দ, অবিনাশী অসুরবিনাশী তোমায় প্রণাম।’’ ‘‘তোমার কান্তি সদ্যোদিত সূর্যের মতো; গুপ্ত গুহ, তোমাকে প্রণাম। তুমি জগতের ভয় দূর করো, সর্বজনে করুণাময়, তোমায় প্রণাম।’’ ‘‘বিস্তীর্ণ, নির্মল চক্ষু তোমার; বিষাখ, মহাব্রতধারী, তোমায় প্রণাম। যুদ্ধের সময় ভয়ংকর, ময়ূরবাহন, তোমায় বারবার প্রণাম।’’ ‘‘বাহুবন্ধধারী, উত্তোলিত পতাকাবাহী, শক্তির উপাসকরা যাঁকে প্রণাম করেন, সাহসের প্রতীক, ঘণ্টাধারী, তোমায় প্রণাম।’’ তখন কুমার বললেন, ‘‘কী বর চাও? বলো, সন্তুষ্ট চিত্তে। কঠিন হলেও, অনেক দিন ধরে এই ইচ্ছা আমার হৃদয়ে ছিল।’’ তাঁর কথা শুনে, দেবতারা মাথা নত করে, আনন্দচিত্তে, মহাত্মা গুহকে বললেন, ‘‘তাড়কা নামে এক অসুররাজ আছে, যিনি অমরগণের সব বংশ বিনাশ করেছেন; তিনি দুর্দান্ত, অপরাজেয়, উগ্র, দুষ্টাচারী ও অতিশয় ক্রুদ্ধ।’’ ‘‘তাঁকে বধ করো, যিনি আমাদের সকল সমস্যার মূল ও আমাদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।’’ ‘‘আর হিরণ্যকশিপু নামে আরেক ভয়ংকর অসুর আছে, যিনি দেবগণের কাছে অজেয়, যজ্ঞবিনাশী, সর্বদা পাপকর্মে লিপ্ত, এমনকি ব্রহ্মাকেও যন্ত্রণাদান করেছেন।