আমি যা দেখলাম, তাতে আমার মনে ভয় ও উৎকণ্ঠা জেগে উঠল—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যখন এই দুধ দিয়ে রান্না করা হবে—তখন এখানে উপস্থিত সমস্ত ব্রাহ্মণ সেই আহার গ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করবেন। এই কথা মনে করে, আমি, গৃহিণী হিসেবে, নিজেই সেই দুধ পান করলাম। এরপর, গৃহস্বামিনী যখন এটি দেখলেন, তিনি আমাকে প্রহার করলেন; তাঁর আঘাতে আমি কষ্ট পেয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি—আমি কীই বা করতে পারি, এত বড় দুঃখে পড়ে? স্ত্রীর এই দুঃখের কথা মনে করে, বলটি স্ত্রী-কুকুরটিকে বলল, ‘‘শোনো কুকুর, আমি তোমায় আমার দুঃখের কারণ বলি।’’ ‘‘এক পূর্বজন্মে, হে কুকুর, আমি ছিলাম এই গৃহস্বামিনীরই পিতা; আজ ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো হয়েছে, প্রচুর আহার বিতরণ হয়েছে। কিন্তু আমাকে কখনো ঘাস বা জল কোনো কিছুই দেওয়া হয়নি; এই কষ্টে আমার দুঃখ আরও বেড়ে গেছে।’’ এই ঘটনা শুনে আমার রাতে ঘুম হয় না; হে মুনিশ্রেষ্ঠ, আমার চিত্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। আমি বৈদিক অধ্যয়নে এবং যজ্ঞ-কর্মে অভিজ্ঞ; তবু এই দুইজনের মহাদুঃখ স্মরণ করে ভাবতে লাগলাম, আমি কী করব। তাই আপনার কাছে এসেছি—আমার এই দুঃখ দূর করুন। ঋষি বললেন, ‘‘হে উগ্রজন্মন, শোনো, পূর্বজন্মে কী ঘটেছিল। এই উত্তম ব্রাহ্মণ কুন্দনানগরীতে বাস করতেন। ভাদ্রপদ মাসের পঞ্চম দিনে তাঁর পিতার শ্রাদ্ধ ও অন্যান্য ক্রিয়ার জন্য তিনি সেই ব্রত পালন করেননি। তাঁর পত্নী, স্বধর্ম পালন করে, সেই ব্রত গ্রহণ করেন এবং সকল ব্রাহ্মণের জন্য আহার প্রস্তুত করেন। কিন্তু স্বামী অজ্ঞাতে, পাপী ও কু-কর্মী হয়ে, সেই ক্রিয়া সম্পন্ন করেন। প্রথম দিনে তিনি চাণ্ডালী, দ্বিতীয় দিনে ব্রাহ্মণহন্তা, তৃতীয় দিনে ধোবিনীরূপে পরিচিত হন, চতুর্থ দিনে তিনি শুদ্ধিলাভ করেন। এই পাপের ফলে তিনি পরের জন্মে নিজের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো স্ত্রী-কুকুর রূপে জন্ম নেন। আর এই ব্যক্তি, হে ধর্মবান, সেই কর্মের ফলেই বলরূপে জন্ম নিয়েছেন।’’ উগ্রজন্মন বললেন, ‘‘বলুন, হে ধর্মজ্ঞ, কোন ব্রত, দান, যজ্ঞ বা তীর্থ আমার পিতামাতার মুক্তি বিশেষভাবে প্রদান করে?’’ ঋষি বললেন, ‘‘ভাদ্রপদের শুক্লপক্ষের ঋষিপঞ্চমী ব্রত পালন করলে অপবিত্রতার পাপে বিনাশ ঘটে। এই ব্রত পালন করলে সন্তান-নাতি লাভ হয় এবং পূর্বপুরুষের মুক্তি হয়। নদী, কূপ, পুকুর অথবা ব্রাহ্মণের গৃহে গোময় দিয়ে বৃত্ত বানিয়ে, তার ওপর পাত্র স্থাপন করতে হয়। সেই পাত্রে ঋষিদের জন্য পবিত্র শস্য রাখা উচিত। সেখানে জজ্ঞোপবীত, সোনা ও ফল স্থাপন করতে হয়। সুখ-সমৃদ্ধি দানকারী সাত ঋষিকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁদের আহ্বান করে ব্রতীকে পূজা করতে হয় এবং পবিত্র শস্য অন্নরূপে নিবেদন করতে হয়। একবেলায়, নিখুঁত ভক্তি ও নির্ধারিত মন্ত্র-পদ্ধতিতে ঋষিদের পূজা করতে হবে। ঘৃতসহ হোম করে, দানসহ ব্রাহ্মণকে সন্তুষ্ট করতে হবে। এরপর আচার অনুযায়ী প্রদক্ষিণ করে পৃথকভাবে ধূপ, দীপ, অন্ন ও অর্ঘ্য নিবেদন করতে হয়।’’ ‘‘আমার ব্রত পালনে ঋষিগণ সদা সন্তুষ্ট হোন; আমার পূজা তাঁরা গ্রহণ করুন; ঋষিগণকে প্রণাম। পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, প্রচেতস, বসিষ্ঠ, মরিিচি ও অত্রি—আপনারা আমার নিবেদন গ্রহণ করুন; আপনাদের প্রণাম।’’ এইভাবে উৎকৃষ্ট ধূপ-দীপ দ্বারা পূজা করতে হয়; এই কর্মের ফলে পূর্বপুরুষদের মুক্তি ঘটে। পূর্বজন্মের কর্ম ও রাগ-দ্বেষের ফলে দোষ জন্মায়; কিন্তু, হে সন্তান, এই ব্রত পালনে নির্দ্বিধায় মুক্তি লাভ হয়। তিনি মুক্তির জন্য এবং পূর্বপুরুষদের মঙ্গলের জন্য এই ব্রত পালন করলেন; পূর্বপুরুষগণ মঙ্গলকামী হয়ে মুক্তির পথে গমন করলেন। এই ঋষিপঞ্চমী ব্রত ব্রাহ্মণদের জন্য প্রশংসিত হয়েছে; যারা উত্তম পুরুষ এই ব্রত পালন করেন, তাঁরা সত্যিই সৌভাগ্যবান। যারা শ্রেষ্ঠ ঋষিব্রত পালন করেন, তাঁরা এখানে বহু ভোগভোগ করে বিষ্ণুলোকে গমন করেন। এভাবে মহাপবিত্র পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডে উমাপতি ও নারদের সংলাপে ঋষিপঞ্চমী ব্রত অধ্যায় (অধ্যায় ৭৭) সমাপ্ত হল। এরপর পার্বতী বললেন, ‘‘হে জ্ঞানী, আবার গঙ্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করুন, যা শুনে সকল ঋষি বারবার বৈরাগ্যলাভ করেন। হে সর্বেশ্বর, হে স্বামী, তাঁর মাহাত্ম্য কিরূপ? জন্মকথা পূর্বে শুনেছি, কিন্তু তাঁর গৌরব শুনিনি। আপনি সকল জীবের প্রথম, আপনি চিরন্তন দেবতা।’’ মহাদেব বললেন, ‘‘ঋষিগণ, যাঁরা জ্ঞানে বৃহস্পতি ও বলশক্তিতে ইন্দ্রের সমান, তাঁরা ভীষ্মকে দর্শন করতে এলেন, যিনি শরশয্যায় শায়িত ছিলেন। অত্রি, বসিষ্ঠ, ভৃগু, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, অঙ্গিরা, গৌতম, অগস্ত্য, সুমতি, সংযমী ঋষি—তাঁরা এলেন। বিশ্বামিত্র, স্থূলশিরা, সর্বজ্ঞ, প্রমথেশ্বর, রৈভ্য, বৃহস্পতি, ব্যাস, পবন, কশ্যপ, ধ্রুব—তাঁরাও উপস্থিত হলেন। দুর্বাসা, জমদগ্নি, মার্কণ্ডেয়, গালব, উশনা, ভরদ্বাজ, ক্রতু ও আস্তিকও এলেন। স্থূলাক্ষ, সর্বলোকাক্ষ, কণ্ব, মেধাতিথি, কুশ, নারদ, পার্বত, সুধান্বা, চ্যবন দ্বিজ—তাঁরাও এলেন। মতি ভু, ভবন, ধৌম্য, শতানন্দ, কৃতব্রণ, জামদগ্ন্য, রাম, ঋচীক ও আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।’’ ‘‘তাঁদের যথাযথভাবে প্রণাম করে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভ্রাতাগণ, বিধি অনুসারে, বিশ্ববন্দিত সেই ঋষিদের পূজা করলেন। সেই মহান আত্মার তপস্বীরা পূজা পেয়ে, তপস্যার ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ হয়ে, ভীষ্মসহ দেবধর্মমূলক আলোচনা শুরু করলেন।