গর্ভে অবস্থানরত শিশুটি মায়ের খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে পুষ্টি লাভ করে এবং ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। কিন্তু গর্ভের সংকীর্ণ ও আবদ্ধ পরিবেশে সে নানাবিধ কষ্টে জর্জরিত থাকে, তার শরীর ঘিরে থাকে যন্ত্রণার আবরণ। এই অবস্থায়ও সে সচেতন থাকে, কিন্তু তার স্বভাবই যেন যন্ত্রণায় পূর্ণ—বারবার সে ক্লেশ অনুভব করে। জন্মের সময় প্রসবপথে প্রবল চাপে, মুখ নিচু করে সে বাহিরে আসে। তারপর ধাপে ধাপে, দিন দিন সেই শিশু বড় হতে থাকে। এভাবেই এই জগতে জীবের দেহধারণ একের পর এক ঘটে চলে। তবে, এখানে প্রশ্ন ওঠে—নিজেকে উদ্ধার করতে না পারা ব্যক্তির চেয়ে পাপী আর কে আছে? এই জন্ম-দুঃখ সকল জীবের জন্যই সাধারণ, পশুদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। কিন্তু মানুষের জন্য এই নিয়মের বিশেষত্ব হল—এখানে বন্ধন ছিন্ন করার সুযোগ রয়েছে। তাই, যে ব্যক্তি মুক্তি চাই, তার উচিত মন্ত্র-দীক্ষা গ্রহণ করা। যিনি আত্মজ্ঞানের ধারক, তিনি মুক্তির অবস্থায় পৌঁছান। তিনি মন্ত্রযোগে শিবের পূজা করেন, যাতে বন্ধনে আবদ্ধ সকলের কল্যাণ হয়। শিব, শক্তি ও অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি আত্মার অন্তর্গত কার্যকলাপ উপলব্ধি করেন। কিন্তু বন্ধনের কারণে, তিনি যেন শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের মতো—নিজের সত্য উপলব্ধি প্রকাশ করতে পারেন না। তাই, শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী মন্ত্র-দীক্ষা গ্রহণ করা উচিত। নিয়মিত এবং বিশেষ উপলক্ষে সাধনাগুলি পালন করা উচিত। জীবনের যে পর্যায়েই কেউ থাকুক না কেন, যদি সে দীক্ষা গ্রহণ করে, তবে দীক্ষার পর তার কর্ম আর বন্ধনের কারণ হয় না। দীক্ষা গ্রহণকারী ব্যক্তি ইচ্ছা করলে সংসারের ভোগও উপভোগ করতে পারে। তবে, যে ব্যক্তি নিয়মিত বা বিশেষ সাধনার জন্য দীক্ষা নিয়েও সে সাধনা পালন করে না—তার উচিত সমস্ত নিয়মিত ও বিশেষ কর্ম পালন করা। যারা এই সাধনাগুলি পালন করেন, তাদের মধ্যেও কেবল গুরু-ভক্তিতে নিবেদিত ব্যক্তি-ই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করেন, অন্য কেউ নন। আর যার গুরু-ভক্তি কৃত্রিম, কেবল বাহ্যিক লাভের জন্য—সে প্রকৃত সিদ্ধি পায় না। যিনি দেহ, মন ও বাক্যে গুরু-ভক্তিতে নিবিষ্ট, যিনি গুরুপ্রতি সর্বস্ব অর্পণ করেন, তিনিই প্রকৃত শিষ্য। তবে, যদি মন্ত্র পাঠে কোনো ভুল হয়, গুরুকে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। এখন আমি দীক্ষার সেই পদ্ধতি বলব, যা মন্ত্রের শক্তি প্রদান করে। এজন্য জ্ঞানীরা একে ‘দীক্ষা’ বলেন। কারণ, এটি ধ্যান ও ধর্মের ধারক হয়ে রক্ষা করে বলে একে ‘মন্ত্র’ বলা হয়। যেসব মন্ত্র দীর্ঘ স্বরে শেষ হয়, তারা স্ত্রীলিঙ্গ; ‘হুঁ’ বা ‘ফট’ দিয়ে শেষ হলে পুরুষলিঙ্গ। যেসব মন্ত্রের দেবতা পুরুষ, তারা মন্ত্র; যাদের দেবতা নারী, তারা বিদ্যা নামে পরিচিত। ‘তারা’ বা ‘রেফ’ ও ‘স্বাহা’ দিয়ে শেষ হওয়া মন্ত্রকে অগ্নিতত্ত্বের বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এভাবে মন্ত্রকে জ্ঞানীরা অগ্নি ও সোমের স্বরূপ বলে জানেন। কিছু মন্ত্র চন্দ্রশক্তি দ্বারা জাগ্রত হয়, কিছু আবার বামগামী বায়ু দ্বারা। ঘুমঘুম অবস্থায় মন্ত্র পাঠ করলে ফল হয় না। শ্বাস স্বাভাবিক চললে ‘বিন্দু’যুক্ত মন্ত্র, আর শ্বাস বিঘ্নিত হলে সৃষ্টি-সংক্রান্ত মন্ত্র পাঠ করা উচিত। সঠিক মালা দিয়ে পাঠ করলে ত্রুটিপূর্ণ মন্ত্রও সিদ্ধি দেয়। এই মন্ত্রের স্বভাব শান্ত, জ্ঞানময়, অক্রোধ, এবং প্রশান্ত। তবে, যেসব মন্ত্র ভঙ্গ বা ত্রুটিতে আক্রান্ত, তারা সাধককে রক্ষা করতে পারে না। এভাবেই জন্ম, দীক্ষা, সাধনা ও মন্ত্রের গূঢ় রহস্য এক অনন্ত ধারায় প্রবাহিত হয়, জীবের মুক্তির পথ উন্মোচন করে।