একদিন এক জ্ঞানী মুনি জীবনের রহস্যময়তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছিলেন। তিনি বললেন, ‘‘বীজ এক স্থানে উৎপন্ন হয়, কিন্তু তার ফল অন্য কোথাও গিয়ে প্রকাশ পায়। যেমন কারও জীবনে সমস্ত কিছু থেমে যায়—একটি আম্র মুকুল ঝরে পড়ার মতোই হঠাৎ সবকিছু শেষ হয়।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘অনেক চেষ্টা করেও কখনও ডিম উৎপন্ন হয় না, আবার কখনও দীর্ঘজীবী পুত্র জন্ম নেয়—সে কিভাবে মৃত পিতার মতো হতে পারে? দশ মাস গর্ভে ধারণের পরও কেউ কেউ পরিবারের জন্য লজ্জার কারণ হয়। এমনও দেখা যায়, অতি শুভ লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও শুদ্ধ আত্মারা জন্মায় না।’’ ‘‘কোনও দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই ভ্রূণ মাতৃগর্ভে প্রবেশ করে। যে ব্যক্তি সুখ-দুঃখ দুটোই পরিত্যাগ করে—সে-ই প্রকৃত জ্ঞানী। মানুষ কখনও দুঃখের ভয়ে ধন-সম্পদ ছেড়ে দেয়, আবার তা ধরে রাখলেও প্রকৃত সুখ পায় না। যারা বিশেষ গুণে গুণান্বিত, তারা একের পর এক ধন-সম্পদ অর্জন করে, কিন্তু সব সঞ্চয় শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ে যায়; সব উন্নতি অবশেষে পতনের দিকে যায়।’’ ‘‘তৃষ্ণার কোনও শেষ নেই, তবুও তৃপ্তিই সর্বোচ্চ সুখ। কেউ যদি এক মুহূর্তের জন্যও তৃপ্তি লাভ করে, তবুও সে স্থায়ী হয় না। যারা বুদ্ধি দিয়ে জীবের প্রকৃতি উপলব্ধি করে, তারা অন্ধকারের ওপারে যেতে পারে। কিন্তু ইচ্ছার তৃপ্তি না পেয়ে মানুষ বারবার এই এক জিনিসই সংগ্রহ করতে চায়।’’ ‘‘তাই এই দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়ও ভাবা উচিত। শব্দ, স্পর্শ, স্বাদ, রূপ এবং গন্ধ—এইসব ইন্দ্রিয়ানুভূতির মধ্যেই সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। যারা বাকশক্তির সদ্ব্যবহার করে, তারা দুঃখ বা ব্যাধিতে কষ্ট পায় না।’’ ‘‘যে ব্যক্তি আসক্তি ত্যাগ করে, প্রশংসা বা অন্যদের মধ্যে থেকেও, নিজস্ব আত্মায় স্থিত, উদাসীন ও কামনাহীন হয়—সে-ই প্রকৃত শান্তিতে থাকে। যখন সুখ ও দুঃখের উল্টোপাল্টা অবস্থা আসে, তখন নিজের স্বভাব অনুযায়ী কার্য করা উচিত; যারা চেষ্টা করে, তারা কখনও পতিত হয় না।’’ ‘‘আগের সমস্ত দেহ একই আত্মারই ছিল। অন্য দেহের দ্বারা আগের শক্তি ও দুর্বলতা দগ্ধ হয়। মিলনের ফলে, চেতনাহীন শুক্রকণা মাতৃগর্ভে স্থাপন হয়। সেখানে আহার ও পানীয় হজম হয়, যা খাওয়া হয় তা ভক্ষণ হয়। গর্ভে প্রস্রাব ও মল স্বাভাবিক নিয়মে প্রবাহিত হয়।’’ ‘‘পেটে ভ্রূণের জন্ম হয়, আবার অন্যদেরও জন্ম হয়। এই গর্ভের সংযোগ থেকে যে জন্ম নেয়, সে-ই মুক্তি পায়। গর্ভের সঙ্গে জন্ম নেওয়া শিশুর সপ্তম মাসে বিশেষ অবস্থা আসে। সন্দেহ নেই, মানুষের নাভি থেকেই যোগের উদ্ভব হয়।’’ ‘‘রোগে পীড়িতরা তাদের বিপুল সম্পদ ত্যাগ করে, তবুও ব্যথা দূর হয় না, চিকিৎসকরা যতই চেষ্টা করুন না কেন। জীবেরা ব্যাধিতে কষ্ট পায়, ঠিক যেমন হরিণ শিকারির হাতে নিহত হয়। বার্ধক্যে বিধ্বস্ত মানুষদের দেখা যায়, যেন মহারথী হাতি অন্য হাতির দ্বারা পরাজিত হয়েছে।’’ ‘‘বন্য প্রাণী ও গরিবরা সাধারণত এইভাবে কষ্ট পায় না। রোগ জীবদের আক্রমণ করে, যেমন কসাই পশু ধরে ফেলে। প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে কেউ জোরপূর্বক টেনে নিয়ে যায়। যারা দেহ থেকে মুক্ত, তারা নিজেদের প্রকৃতির ঊর্ধ্বে উঠে যায়।’’ ‘‘মানুষ সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে, তবুও সবকিছু তাদের ইচ্ছামতো হয় না।’’—এভাবেই সেই মুনি জীবনের রহস্য ও অনিত্যতার কথা শ্রদ্ধার সাথে বর্ণনা করলেন।