একদিন এক জ্ঞানী ঋষি তাঁর শিষ্যদের সামনে চন্দ্র-তিথি, বার, নক্ষত্র এবং গ্রহের সংযোগ ও তাদের ফলাফল সম্পর্কে গভীর ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন। তিনি বললেন, ‘‘মঙ্গলবার যদি নবম বা পঞ্চম তিথি পড়ে, তখন তাকে দগ্ধযোগ বলা হয়, যা অশুভ। বুধবারে যদি শ্রবিষ্ঠা বা আর্যামভা নক্ষত্র পড়ে, কিংবা বৃহস্পতিবারে যদি জ্যেষ্ঠা বা ভৃগুদিবস হয়, তাতেও বিশেষ লক্ষণ রয়েছে। আবার, বিষাখা নক্ষত্র থেকে শুরু করে চারটি ভাগে সূর্য ও রবিবার ইত্যাদি দিন ভাগ করা হয়। ঋষি বললেন, ‘‘যে সংযোগ তিথি ও বার থেকে, বা বার ও নক্ষত্র থেকে হয়, তা সাধারণত শুভ হয় না।’’ তিনি আরও বোঝালেন, কিছু বিশেষ যোগ যেমন—ভীষণ, অষ্টচক্ষু, বৃহৎপেট, ধীরগতি এবং মন্দাকিনী নামে পরিচিত, তাদের প্রতিটির নির্দিষ্ট প্রতীক রয়েছে: শূদ্র, চোর, বৈশ্য, পৃথিবী, দেবতা, রাজা ও গাভী। দিনের বিভিন্ন সময়ে এই যোগের প্রভাবও ভিন্ন: পূর্বাহ্নে রাজাদের, মধ্যাহ্নে ব্রাহ্মণদের, অপরাহ্নে সাধারণ মানুষদের জন্য ক্ষতিকর। রাত হলে, যারা রাত্রিতে চলাফেরা করে, অভিনেতা বা যারা রাতের শেষ ভাগে কর্মরত, তাদের ওপর প্রভাব পড়ে। ঋষি আরও বললেন, ‘‘যদি দিনের বেলায় সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করে, তখন তা অশান্তি ও অমঙ্গল ডেকে আনে।’’ তিনি গুণে গুণে বললেন, ‘‘ঘোড়া, কুকুর, উট, বলদ, পদাতিক, অস্ত্র, সরঞ্জাম, যানবাহন, গদা, মুগুর, খড়্গ, দণ্ড, তীর, ধনুক, বল্লম—এসবের ওপরও এই সময়ের প্রভাব পড়ে। এমনকি খাবার, ক্ষীর, ভিক্ষা, সূপ, দুধ, দই, গাভী, ব্যবসায়ী, সকল মানুষ, শিশু ও গো-সম্প্রদায়ের লোকদেরও ছুঁয়ে যায় এই যোগ। আবার, চতুষ্পদ জন্তু, তিল বা সাপ যদি ঘুমিয়ে থাকে, তখন পরিবর্তন ঘটে। তিনি বললেন, ‘‘অস্ত্র, যানবাহন, খাদ্য এবং জাতিগত কর্তব্যেও এই সময়ের প্রভাব পড়ে।’’ কিছু সময় মানুষ অন্ধ, ধীর, মধ্যম প্রকৃতির বা সুন্দর চোখেরও হয়ে উঠতে পারে। যখন সূর্য স্থির রাশিতে প্রবেশ করে, তখন তাকে বিষ্ণুপদ বলা হয়। আর সূর্যের বিষুবরেখা পারাপার হয় তুলা ও মেষ রাশিতে। বিষুবসংক্রান্তিতে ষোলোটি শুভ স্রোত থাকে। এই শুভতা পূর্ব, পশ্চিম, দক্ষিণ বা উত্তরে হলে, তা পূর্ববর্তী বা পরবর্তী দিনে ফল দেয়। মানুষ চন্দ্ররাশির সেই লক্ষণেই পৌঁছায়, তা শুভ বা অশুভ যাই হোক। সূর্যের রাশিপ্রবেশের সময়ও এই নিয়ম চলে। ঋষি বললেন, ‘‘ব্রত, বিবাহ বা অনুরূপ অনুষ্ঠানে এই নিয়মগুলি পালন করা উচিত নয়। যদি দোষ দেখা দেয়, সোনা দান করলে তা মোচন হয়। তখন যদি শক্তিশালী গ্রহ সংক্রমণ করে, বাধাবিপত্তিও বেশি হয়। তবে যদি নব, পঞ্চম বা তৃতীয় জলীয় গ্রহ বা অশুভ গ্রহ দ্বারা আক্রান্ত না হয়, তাহলে তা শুভ। আবার, ইচ্ছিত জলীয় রাশির শেষে দেবতারা যদি নিজের ধর্মে প্রতিষ্ঠিত থেকে কুষ্ঠ না দেয়, তবুও শুভ। খরচের ক্ষেত্রে শনি, বুধ বা সূর্য কোণে থাকলে, আর শুভ উদ্ভিদ থাকলে শুভ হয়। ধীত্রী, যক্ষ বা গজ রাশির শেষে শুভ গ্রহ (চন্দ্র ছাড়া) থাকলেও শুভ। আট, ছয় বা তিন জলীয় রাশির শেষে, কিংবা সূর্য, চন্দ্র বা অশুভ গ্রহ দ্বারা কুষ্ঠ না হলে, তখনও শুভ। আট বা সাত অঙ্গেও যদি সূর্য, চন্দ্র, অশুভ গ্রহ, শত্রু বা মঙ্গলের কুষ্ঠ না থাকে, তাহলে শুভ। ঋষি উপসংহারে বললেন, ‘‘তাই, কুষ্ঠ বিচার করে তবেই শুভ বা অশুভ ঘোষণা করা উচিত।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘যদি শুভ গ্রহ দৃষ্টিতে থাকে, ফল অশুভ; অশুভ গ্রহ দৃষ্টিতে থাকলে, ফল শুভ হয়। গ্রহ যদি শত্রুর রাশি, নিজের রাশি বা বৈরী রাশিতে থাকে, তবে বিশেষ সতর্কতা দরকার। তখন শান্তিকর্ম নিষ্ঠার সঙ্গে করা উচিত।’’ তিনি বললেন, ‘‘রত্ন, মুক্তা, প্রবাল বা পান্না—এসব যথাযথভাবে সূর্য ও অন্যান্য গ্রহকে সন্তুষ্ট করার জন্য ধারন করা উচিত।’’ এই পক্ষটি তার জন্য শুভ, অন্যথায় কৃষ্ণপক্ষ অশুভ। যদি রি, ফরা, অন্ধ্র বা জলীয় রাশিতে গ্রহ স্থিত না থাকে, কিংবা আকাশে গমনকারী গ্রহ দ্বারা আক্রান্ত না হয়, তাহলে শুভ। জীবনে বন্ধুবান্ধব ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু বারবার জন্মে আসে—এভাবেই ঋষি শিষ্যদের সামনে এই জটিল গ্রহ-যোগ ও সময়ের রহস্য উদ্ঘাটন করলেন।