বেদপাঠের গম্ভীর ও পবিত্র পরিবেশে, একাগ্রচিত্তে পাঠকারীকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলতে হয়। অধ্যায়ের শেষে, কিংবা সামন বা ঋকের শ্লোকে, উচ্চারণের মাঝে তিলের দানার মতো সামান্য ফাঁক রাখতে হয়। এই সময় জ্ঞানীরা শরীরের কোনো অঙ্গ বা অঙ্গুলি নড়াচড়া করেন না। যেন মেঘের মাঝে বিদ্যুৎরেখা ঝলকায়, কিংবা গয়নার মালা ঝুলে থাকে—তেমনই স্থির ও সুন্দর ভঙ্গিতে থাকতে হয়। কচ্ছপ যেমন নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুটিয়ে নেয়, তেমনভাবে পাঠকারীরও মন ও দৃষ্টি গভীর মনোযোগে নিয়োজিত রাখতে হয়। নাকের সামনে হাত রেখে, গাভীর কানের মতো হাতের ভঙ্গি রাখতে হয়। উচ্চারণের সময় শব্দগুলো স্পষ্টভাবে, যথাযথভাবে, হাত ও মুখের সহায়তায় উচ্চারণ করতে হয়। শব্দ যেন না হয় অতিরিক্ত জোরে বা খুব আস্তে, না-ই বা গান গাওয়ার মতো বা দেহ নড়াচড়ার সাথে। ঠিক যেমন মাছের চলার পথ জলে বোঝা যায় না, বা ঘৃত যেমন দইয়ের মধ্যে থাকে, কিংবা কাঠের মধ্যে লুকিয়ে থাকে আগুন—তেমনই সূক্ষ্মভাবে, এক স্বর থেকে অন্য স্বরে যাওয়া উচিত, যেন কোনো ছেদ বা বিরতি না পড়ে। যে স্বর এখনো উচ্চারিত হয়নি, কিংবা যেটি উপেক্ষিত বা ভেঙে গেছে, অথবা অসমভাবে উচ্চারিত হয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। স্বর যদি নিজের স্থান ছেড়ে দেয় বা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাও ঠিক নয়। অনুশীলনের সময় দ্রুত ছন্দে, আর আসল পাঠের সময় মধ্যম ছন্দে পাঠ করা উচিত। এভাবেই পাঠশিক্ষার্থীরা শিখে নেওয়া পাঠ সঠিকভাবে উচ্চারণ করবে। প্রথম স্বরের স্থান কপালে, আর উচ্চতম স্বরের স্থান মস্তকের শীর্ষে। নিচের চতুর্থ স্বরের স্থান জিহ্বায় বলা হয়। যখন বৃদ্ধাঙ্গুলি সর্বোচ্চ স্থানে, তখন তা প্রথম স্বর উৎপন্ন করে। ষষ্ঠ স্বর অনামিকায়, সপ্তম স্বর—ধৈবত—কনিষ্ঠায়। মাঝে ফাঁক না রেখে, মধ্যম অবস্থায়, আর সর্বদা পরিবর্তনশীলতা বজায় রাখাই নিয়ম। দেবতারা উচ্চতম স্বরে, মানুষ প্রথম স্বরে অবস্থান করেন। জন্মান্ধ এবং পিতৃপুরুষেরা চতুর্থ স্বরে অবস্থান করেন। অতিশয় নিচু স্বরে স্থাবর-জঙ্গম সকল প্রাণী বিদ্যমান। যেসব স্বর উজ্জ্বল, বিস্তৃত, দয়ালু—তেমনই কোমল ও মধ্যম স্বরও। উজ্জ্বলতা থাকে নিচের, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ স্বরে। দ্বিতীয় স্বরের মধ্যবর্তী অংশ কোমল, মধ্যম ও বিস্তৃত বলে মনে রাখা হয়। বিস্তৃতি হয় নিচু স্বরে, কোমলতা তার বিপরীতে। দ্বিতীয় স্বরে সংযত স্বর, তারপরে আসে উচ্চতম স্বর। এখানে সংযত স্বর চতুর্থ স্বরের সাথে অগ্রসর হয়। অতিরিক্ত উচ্চ স্বর বা স্বরের মাঝে ফাঁক রাখা উচিত নয়। চলন দুই প্রকার—শব্দের শেষে সংযোগ, ও উচ্চারণের সাথে। সংযত স্বরের মধ্যবর্তী সময় কখনো সংক্ষিপ্ত, কখনো দীর্ঘ, কখনো আকস্মিক হয়। উচ্চ স্বরে উজ্জ্বলতা, এবং স্বরিত স্বরেও উজ্জ্বলতা বিদ্যমান—জ্ঞানেরা এভাবেই জানেন। এখানে আছে উচ্চ, অনউচ্চ, এবং স্বরিত যুক্ত স্বর। এখন আমি তিনটি স্বরছন্দের কথা বলবো—উদাত্ত, অনুদাত্ত, স্বরিত। উদাত্তের পরেই সঙ্গে সঙ্গে স্বরিত আসে। কোনো অক্ষরের স্বর যখন ছাড়িয়ে যায়, তখন তাকে স্বরিত বলে, এবং এটি দুই প্রকারের হয়। এই স্বরকে সাত ভাগে ভাগ করা হয়, প্রসঙ্গ অনুযায়ী। ডান কানে শোনার অনুপাতে সাতটি স্বর প্রয়োগ করতে হয়। উচ্চের চেয়ে উচ্চতর কিছু নেই, নিচের চেয়ে নিম্নতরও কিছু নেই। উচ্চ ও নিচের মাঝে যা থাকে, তাকে ‘নিরপেক্ষ’ বলে শাস্ত্রীয় পরম্পরা।