বজ্রাঙ্গ, তাঁর কঠোর তপস্যার শেষে, দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করলেন—তিনি যেন অসুরসুলভ স্বভাব থেকে মুক্ত থাকেন, তাঁর লোকেরা যেন অবিনশ্বর হয়, তিনি যেন তপস্যায় আনন্দ পান এবং তাঁর দেহ যেন টিকে থাকে। দেবতা তাঁর প্রার্থনা শুনে বললেন, ‘‘তথাস্তু’’, এবং স্বগৃহে ফিরে গেলেন। বজ্রাঙ্গ, দৃঢ় নিয়মে তপস্যা সম্পন্ন করে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় নিজের আশ্রমে ফিরে এসে স্ত্রীকে খুঁজলেন, কিন্তু তাঁকে কোথাও পেলেন না। ক্ষুধায় কাতর হয়ে তিনি পাহাড়ের ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করলেন। সেখানে ফলমূল ও কন্দ সংগ্রহ করতে গিয়ে বজ্রাঙ্গ দেখলেন, তাঁর প্রিয়া স্ত্রীর মুখ বস্ত্রে ঢাকা, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ও চরম দুঃখে আছেন। তাঁকে দেখে অসুররাজ কোমল ভাষায় সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘‘কে তোমাকে এমন কষ্ট দিয়েছে, ভীতু? কারা তোমাকে বারবার কষ্ট দিয়ে মৃত্যুর দ্বারে পাঠাতে চায়? কিংবা, তুমি কী চাও, বলো, আমি তোমার ইচ্ছা পূরণ করব।’’ তখন তাঁর স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘‘ভয় পেয়েছি, ত্যাগ করা হয়েছি, বারবার দেবরাজ ইন্দ্রের দ্বারা নির্যাতিত ও কষ্ট পেয়েছি—যেন রক্ষকহীন। আমার এই দুঃখের শেষ নেই দেখে আমি জীবন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি আমাকে আমার পুত্র তারক দাও, যাতে আমি এই দুঃখ-শোকের মহাসমুদ্র থেকে উদ্ধার পেতে পারি।’’ স্ত্রীর কথা শুনে বজ্রাঙ্গের চোখ ক্রোধে লাল হয়ে উঠল, যদিও তিনি দেবরাজের প্রতিশোধ নিতে পারতেন, তবুও তিনি আবার তপস্যা করার সংকল্প করলেন। এই কঠোর সংকল্প জেনে স্বয়ং ব্রহ্মা সেখানে এসে, কৃপাময় ভাষায় বললেন, ‘‘পুত্র, আবার কেন এমন কঠোর তপস্যার ইচ্ছা করছ? বলো, কী চাও?’’ বজ্রাঙ্গ বললেন, ‘‘হে ব্রহ্মা, সহস্র বছর উপবাস করেও যে ফল পাওয়া যায়, তা সঠিক সময়ে অন্নত্যাগে এক মুহূর্তেই লাভ হয়। অপূর্ণ বাসনা ত্যাগের চেয়ে, পূর্ণ বাসনা ত্যাগ অনেক বড়।’’ ব্রহ্মার কথা শুনে বজ্রাঙ্গ হাত জোড় করে বললেন, ‘‘আপনার আদেশে ধ্যান থেকে উঠে দেখি, আমার রাণী এক গাছের নিচে ভীত, দুঃখিত ও কাঁদছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘কেন এমন, ভীতু? কী করতে চাও?’ তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘ভয় পেয়েছি, ত্যাগ করা হয়েছি, বারবার দেবরাজের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি। এই দুঃখের শেষ নেই দেখে আমি জীবন ত্যাগ করতে চাই। আমাকে পুত্র তারক দাও, যাতে আমি এই দুঃখ-সমুদ্র থেকে উদ্ধার পাই।’ এ কথা শুনে আমি স্ত্রীর সন্তানের জন্য সংকল্প করলাম—কঠোর তপস্যা করে স্বর্গবাসীদের জয় করব।’’ ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে, শান্ত মুখে বললেন, ‘‘এবার যথেষ্ট হয়েছে, আর তপস্যা করো না। তোমার পুত্রের নাম হবে তারক, সে হবে অতিশয় শক্তিশালী।’’ বজ্রাঙ্গ ব্রহ্মাকে প্রণাম করে ফিরে এলেন এবং আনন্দিত মুখে স্ত্রীকে সুখ দিলেন। দম্পতি সুখে তাদের আশ্রমে ফিরে গেলেন। সুন্দরী বরাঙ্গী বজ্রাঙ্গের স্থাপিত ভ্রূণ হাজার বছর গর্ভে ধারণ করলেন। সহস্র বছর পরে বরাঙ্গী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। সেই অসুররাজ জন্ম নিতেই তিন ভুবন কাঁপতে লাগল—পৃথিবী কেঁপে উঠল, সাগর দুলে উঠল, পর্বত কেঁপে উঠল, প্রবল বাতাস বইতে লাগল। ঋষিরা মন্ত্রপাঠ করলেন, বন্য জন্তু গর্জন করল, চন্দ্র-সূর্য ম্লান হয়ে গেল, দিকচক্র ধূসর হল। সেই মহাসুর জন্ম নিতেই সব অসুর ও তাদের নারীসঙ্গীরা সেখানে এসে আনন্দে উল্লাস করল। অসুর নারীরা গান গাইল, নৃত্য করল, দানবদের মধ্যে মহোৎসব শুরু হল। দেবতারা এবং ইন্দ্র বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। বরাঙ্গী নিজের পুত্রকে দেখে আনন্দে ভরে গেলেন; ইন্দ্রের বিজয় তাঁর কাছে তুচ্ছ মনে হল। সদ্যোজাত অসুররাজ তারক ছিল প্রচণ্ড বীর। সব অসুর—কুজম্ভ, মহিষ ও অন্যরা—তাকে সমগ্র অসুরদের রাজত্বের জন্য অভিষিক্ত করলেন। তারক, রাজ্য লাভ করে, প্রধান দানবদের উদ্দেশে যুক্তিসম্মত ভাষায় বললেন, ‘‘হে মহাশক্তিশালী দানবগণ, আমার কথা শোনো। আমাদের কল্যাণ ও সঠিক পথের জন্য সবাই মিলে আলোচনা করো। দেবতারা আমাদের বংশ ধ্বংস করতে চায়; আমাদের প্রকৃতি দেবতাদের চিরশত্রু। আজ আমরা সবাই মিলে, নিজেদের বাহুবলে, দেবতাদের দমন করতে যাব—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে, তপস্যা ছাড়া দেবতাদের সঙ্গে সম্মুখসমরে যাওয়া উচিত নয়। প্রথমে আমি তপস্যা করব, তারপর দিতিপুত্ররা ভয়ানক যুদ্ধ করবে। এরপর আমরা দেবতাদের পরাজিত করে তিন ভুবন ভোগ করব; কারণ, দৃঢ় সংকল্প যার, সে-ই চিরস্থায়ী সৌভাগ্য পায়। কিন্তু যার মন চঞ্চল, সে কিছু রক্ষা করতে পারে না—সমৃদ্ধিও তার কাছে টিকে থাকে না।’’ তারকের এই কথা শুনে সব দানব গভীর মনোযোগে শুনল।