তিনি দানবনাশক, কুকুরনাশক, মৃত্যুনাশক, যজ্ঞযোগ্য, দীপ্তিমান, জ্ঞানী, অগ্নিস্বরূপ, কলঙ্কহীন। তিনি দানবনাশক, পশুনাশক, বিঘ্নহর্তা, প্রাণস্বরূপ, সর্বত্র ঘুরে বেড়ান, মহৎ, সমুদ্রসম, দুঃসাধ্য। তিনি কৃষ্ণবর্ণ, বিজয়ী, জগতের ঈশ্বর, আসক্তিহীন, বিঁধানযোগ্য, সমদর্শী। তিনি সুবর্ণবাহু, সর্বব্যাপী, মহান, শোভনকর্মকারী, অপ্রতিরোধ্য, স্বামী, সুদর্শন। তিনি দ্রুতবাণধারী, সদা অশ্বারোহী, মঙ্গলময়, মুক্তিদাতা, গৌরবর্ণ, শ্যামবর্ণ, মহাদেব, জ্ঞানী। তিনি বৃহদাকৃতি, দীপ্তিমান, কান্নার কারণ, সঙ্গী, দৃঢ়ধনুর্ধর, বর্মধারী, রথী, সৈন্যসহ। তিনি ভৃগুর ঈশ্বর, শুক্র, গুহাবাসী, সৃষ্টিকর্তা, অচ্যুত, শান্ত, জ্ঞানী, বৃষভ। হে সর্বস্বরূপ, চর্মবাস, পশুপতি, ভুতপতি—আপনাকে প্রণাম। ওঁকার, ঋক, যজুঃ, সাম, স্বাহা, স্বধা, বষট্-স্বরূপ, মন্ত্র-স্বরূপ—আপনাকে প্রণাম। তিনি সৃষ্টিকর্তা, ধারক, কর্তা, দর্শন-শ্রবণের আধার, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ঈশ্বর, কর্ম-স্বরূপ। বসু, সাধ্য, রুদ্র, আদিত্য, অসুর, বিষ, মরুৎ, দেবত্ব-স্বরূপ—আপনাকে প্রণাম। অগ্নি-সোমযজ্ঞজ্ঞ, পশুপতি, ঔষধিপতি, স্বয়ম্ভূ, অজ, অদ্বিতীয়, প্রজাপতি, ব্রহ্ম-স্বরূপ—আপনাকে প্রণাম। তিনি স্বাত্মা, আত্মনিয়ন্ত্রিত, সর্বেশ্বরাতীত, সর্বপ্রাণীর অঙ্গরূপ, সর্বপ্রাণের আত্মা—আপনাকে প্রণাম। তিনি নির্গুণ, গুণজ্ঞ, প্রকাশ্য ও অমৃত, অবর্ণনীয়, বন্ধু, সাংখ্য-আত্মা—আপনাকে প্রণাম। তিনি পৃথিবী, অন্তরীক্ষ, স্বর্গ, মহঃ, জন, তপ, সত্য—সব জগতের আত্মা। তিনি অব্যক্ত, মহান, সৃষ্টির ও ইন্দ্রিয়ের উৎস, স্বয়ংজ্ঞ, পৃথক, সর্বাত্মা। তিনি চিরন্তন, স্বাত্মচিহ্নিত, সূক্ষ্ম ও ভিন্ন, জ্ঞান ও শক্তি, মুক্তির আত্মা। তিনিভাবে তিনলোকে ও তারও বাইরে, সত্যের শেষপ্রান্তে, মহৎ ও চতুষ্পদে—আপনাকে প্রণাম। স্তবকে প্রণাম; যদি কিছু বাদ পড়ে থাকে, হে ভক্তবৎসল ব্রহ্মন্, আপনি ক্ষমা করুন। এভাবে দেবতাদের প্রভুকে, নীল-রক্তবর্ণধারী মহাদেবকে তিনি নমস্কার করলেন, হাত জোড় করে, সংযত বাক্যে তার সামনে দাঁড়ালেন। তখন মহাদেব, কাব্যাকে স্পর্শ করে প্রসন্ন হলেন, তাকে পূর্ণ দৃষ্টি দিলেন এবং সেখানেই অন্তর্হিত হলেন। দেবেশ্বর অন্তর্হিত হলে, কাব্য দেখলেন, জয়ন্তী তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জয়ন্তীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুমি কে, সৌভাগ্যবতী? কার কন্যা? তুমি দুঃখিত কেন, যখন আমিও দুঃখিত? তোমার এই তপস্যার উদ্দেশ্য কী?’’ তিনি বললেন, ‘‘এই স্তব, ভক্তি, নম্রতা, সংযম ও স্নেহের জন্য, সুন্দরনিতম্বিনী, শুভবর্ণা, আমি তোমায় প্রসন্ন। তোমার ইচ্ছা কী, সরলনিতম্বিনী? যা চাও, আজই দান করব, তা যত কঠিনই হোক।’’ জয়ন্তী বললেন, ‘‘আমার উদ্দেশ্য তুমি তপস্যার দ্বারা জানতে পারবে, হে ব্রহ্মন্, তুমি তা প্রকৃতরূপে জানো।’’ তখন তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বললেন, ‘‘তুমি আমার সঙ্গে দশ বছর থাকবে, সুন্দরনিতম্বিনী, দীপ্তিময়ী।’’ ‘‘তুমি চাও—অদৃশ্য থেকে আমার সঙ্গে এখানে মিলন, হে দেবী, নীলপদ্মবর্ণা, বরযোগ্যা, সুন্দরনয়না, মধুরভাষিণী, এটাই তোমার ইচ্ছা।’’ ‘‘তথাস্তু! চলো, আমার গৃহে যাই, মত্তনয়না।’’ এরপর তিনি তাঁর গৃহে নিয়ে গিয়ে জয়ন্তীর হাত ধরলেন। ভর্গব তখন জয়ন্তীর সঙ্গে দশ বছর অদৃশ্যভাবে, নিজের মায়ায় আচ্ছন্ন থেকে বাস করলেন। এই সময়, কাব্য তাঁর উদ্দেশ্য সাধন করে ফিরে এলে, দিতিপুত্ররা আনন্দিত হয়ে তাঁর গৃহে ছুটে এলেন। কিন্তু তাঁরা যখন এলেন, তখন কাব্যকে দেখতে পেলেন না, কারণ তিনি মায়ায় আচ্ছন্ন ছিলেন। তাঁরা ইঙ্গিত বুঝে ফিরে গেলেন। এদিকে বৃহস্পতি জানতেন কাব্য বরবশে রয়েছেন, জয়ন্তীর সন্তুষ্টির জন্য দশ বছর অপেক্ষা করলেন। এই সময়, ইন্দ্রের প্রেরণায় বৃহস্পতি কাব্যরূপ ধারণ করে অসুরদের ডেকে পাঠালেন। তাঁরা এলে বৃহস্পতি বললেন, ‘‘স্বাগতম, আমার শিষ্যগণ; আমি তোমাদের কল্যাণের জন্য এসেছি। আমি যা শিখেছি, তা তোমাদের শিক্ষা দেব।’’ অসুররা আনন্দিত মনে তাঁর কাছে শিক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন। দশ বছর পূর্ণ হলে, তখন কাব্য থেকে দেবযানী জন্মগ্রহণ করলেন, এ কথা শোনা যায়। এরপর কাব্য তাঁর শিষ্যদের দিকে মনোযোগ দিলেন। তিনি জয়ন্তীকে বললেন, ‘‘হে দেবী, আমি আমার শিষ্যদের দেখতে যাচ্ছি, পবিত্রহাসিনী, সদাচারিণী, চঞ্চলনয়না, বিশালত্রিনয়না।’’ জয়ন্তী বললেন, ‘‘তুমি ভক্তদের প্রতি মনোযোগ দাও, মহাব্রতধারী; এটাই ধার্মিকের কর্তব্য, ব্রাহ্মণ। তোমার ধর্মে আমি বাধা দিব না।’’ এরপর কাব্য গিয়ে দেখলেন, অসুররা দেবগুরু বৃহস্পতির কাব্যরূপে প্রতারিত হয়েছেন।