ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ ও সামবেদ থেকে জন্ম নেওয়া মহান দেবতা, কোমল হাসি নিয়ে বললেন— ‘‘তপস্যা, সৎ আচরণ, দান বা ধর্মকর্মের ফল দিয়ে, কিংবা তীর্থযাত্রার পূণ্য, বৃহৎ যজ্ঞ, বেদ অধ্যয়ন, সম্পদ বা জ্ঞান— এসব কিছু দিয়েই এখানে আমাকে দেখা সম্ভব নয়। কেবল ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ এখানে আমাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে।’’ তিনি ব্রহ্মাকে বললেন, ‘‘সপ্তম কল্প, অর্থাৎ বারাহ কল্পে, হে প্রপিতামহ, তখন সর্বলোকের আলোকদাতা ভগবান এবং বৈবস্বত মনু তোমার পৌত্র হবেন। তখন চতুর্যুগে, যুগান্তে, জগতের কল্যাণ ও ব্রাহ্মণদের মঙ্গলের জন্য আমি পুনরায় জন্ম নেব। হে ব্রহ্মা, আমি আবার এই যুগান্তে, সেই কল্পের প্রথম যুগে, অবতীর্ণ হব।’’ ‘‘প্রথম দ্বাপর যুগে, যখন স্বয়ং ব্যাসদেব আবির্ভূত হন, আমি সেই যুগান্তে ব্রাহ্মণদের মঙ্গলের জন্য অবতীর্ণ হয়ে ছিলাম। তখন আমি হিমালয়ের সুন্দর চূড়ায়, চাগলা নামক উৎকৃষ্ট পর্বতে, শ্বেত নামক মহর্ষি রূপে আবির্ভূত হব, শিখাধারী রূপে। আমার শিষ্যরাও তখন শিখাধারী হবেন; তাদের নাম হবে শ্বেত, শ্বেতশিখা, শ্বেতস্য ও শ্বেতলোহিত। এই চারজন মহাত্মা ব্রাহ্মণ, বেদে পারদর্শী, ব্রহ্মপথ উপলব্ধি করে পরম ব্রহ্মত্ব লাভ করবেন। ধ্যান ও যোগে নিয়োজিত হয়ে তারা আমার কাছে আসবেন।’’ ‘‘তারপর দ্বিতীয় দ্বাপরে, যখন প্রজাপতি ব্যাসের নাম হবে সদ্য, তখন আমি সুতর নাম ধারণ করব জগতের মঙ্গলের জন্য। সেই কলিযুগে, আমার শিষ্যদের আশীর্বাদ করতে আমি আবার আবির্ভূত হব। তখনও আমার শিষ্যরা খ্যাতি অর্জন করবে— দুণ্ডুভি, শতরূপা, ঋচিক ও কেতুমান— যোগ ও ধ্যানে সিদ্ধ হয়ে তারা পৃথিবীতে ব্রহ্মত্ব প্রতিষ্ঠা করবে এবং একত্রে রুদ্রলোক গমন করবে।’’ ‘‘তৃতীয় দ্বাপরে, যখন ব্যাস ভৃগুবংশীয় হবেন, তখনও আমি দমন নামে যুগান্তে অবতীর্ণ হব। তখনও আমার চার পুত্র জন্ম নেবে— বিকোষ, বিকেশ, বিপাশ ও শাপনাশন। তারা সকলেই মহাশক্তিশালী ও যোগপথে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রুদ্রলোক গমন করবে।’’ ‘‘চতুর্থ দ্বাপরে, যখন ব্যাস অঙ্গিরস নামে পরিচিত হবেন, তখন আমি সুহোত্র নামে আবির্ভূত হব। তখনও আমার চার পুত্র— সুমুখ, দুর্মুখ, দুর্দর ও দুরতিক্রম— তপস্যায় সিদ্ধ, যোগে নিয়োজিত, দৃঢ় ব্রতধারী দ্বিজশ্রেষ্ঠ হবেন। তারা পাপমুক্ত হয়ে সূক্ষ্ম, বিশুদ্ধ যোগপথে অগ্রসর হবেন এবং রুদ্রলোক গমন করবেন।’’ ‘‘পঞ্চম দ্বাপরে, যখন ব্যাস হবে সবিতা, তখনও আমি কঙ্ক নামে মহাতপস্বী রূপে অবতীর্ণ হব, জগতের মঙ্গলের জন্য এবং একক যোগতত্ত্ব ধারণ করে। তখন আমার চার বিশুদ্ধ, সৌভাগ্যশালী, যোগনিষ্ঠ শিষ্য জন্ম নেবে— সনক, সনন্দন, সনাতন ও মহাবল সনৎকুমার। তারা সকলেই নিঃস্বার্থ ও অহংকারহীন। তারা আমার কাছে আসবে, যেখানে প্রত্যাবর্তন দুর্লভ।’’ ‘‘ষষ্ঠ চক্রের শেষে, যখন ব্যাস হবে মৃত্যু নামে পরিচিত, তখনও আমি লোকাক্ষীর নামে উপস্থিত থাকব। তখনও আমার শিষ্যরা যোগতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত, দৃঢ় ব্রতধারী হবেন— সুধামা, বিরজা, শঙ্খপাদ ও রাজা— এই চারজন মহাত্মা যোগতত্ত্বে সিদ্ধ, পাপদগ্ধ, ধ্যানযোগে অগ্রসর হয়ে আমার কাছে আসবেন, যেখানে প্রত্যাবর্তন অতি দুর্লভ।’’ ‘‘সপ্তম চক্রে, যখন ব্যাস হবে শতক্রতু, তখনও এক মহাতেজস্বী, অতীত জন্মে বিখ্যাত, বিভু নামে পরিচিত হবেন। তখনও আমি সেই যুগান্তে, কলিযুগে উপস্থিত থাকব। জৈগীষব্য, যিনি বিভু নামে খ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী, তিনিও তখন আমার পুত্র হবেন। সারস্বত, মেঘ, মেঘবাহ ও সুবাহন— এই মহাত্মারাও ধ্যানযোগে সিদ্ধ হয়ে একই পথে অগ্রসর হবেন এবং রুদ্রলোক গমন করবেন, কষ্টহীন হয়ে।’’ ‘‘অষ্টম চক্রে, যখন ব্যাস হবেন বশিষ্ঠ, তখন আমি দধিবাহন নামে পরিচিত হব। তখনও আমার পুত্রগণ যোগতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত, দৃঢ় ব্রতধারী হবেন— পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মহাযোগী কপিল, আসুরি, পঞ্চশিখ ঋষি এবং মহাযোগী, ধর্মপরায়ণ, মহাশক্তিশালী বাস্কল। তারা মহেশ্বরযোগ লাভ করে, জ্ঞানী ও পাপদগ্ধ হয়ে আমার কাছে আসবেন, যেখানে প্রত্যাবর্তন অতি দুর্লভ।’’ ‘‘নবম চক্রে, যখন সারস্বত হবেন ব্যাস, তখনও আমি ঋষভ নামে উপস্থিত থাকব এবং আমার পুত্রগণ মহাশক্তিসম্পন্ন হবেন— পরাশর, গর্গ, ভৃগু ও অঙ্গিরস। তখন এই মহাত্মা, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ, সেখানে উপস্থিত থাকবেন।’’ এভাবেই মহান ঈশ্বর যুগে যুগে, বিভিন্ন রূপে, যোগ ও ধ্যানে প্রতিষ্ঠিত শিষ্যদের সঙ্গে, জগতের মঙ্গল ও ব্রাহ্মণদের কল্যাণের জন্য অবতীর্ণ হবেন— প্রতিটি যুগান্তে তাঁর মহিমা ও করুণার ধারায়।