একবার এক ঋষি তাঁর শিষ্যদের কাছে আহারের শুদ্ধতা ও তার ফল সম্পর্কে গভীরভাবে উপদেশ দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বা অনুচিতভাবে আহার গ্রহণ করে, সে শূদ্রের গর্ভে প্রবেশ করে। জীবিত অবস্থায় সে শূদ্র হয়ে যায়, আর মৃত্যুর পর কুকুররূপে জন্ম নেয়। যদি কেউ অন্যের খাদ্য পেটে নিয়ে মারা যায়, তবে সে সেই খাদ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী জন্ম লাভ করে। ঋষি আরও সতর্ক করে বললেন, ‘তোমরা কখনোই দলবদ্ধভাবে, পতিতার কাছ থেকে বা হিজড়াদের কাছ থেকে আহার গ্রহণ করবে না। সংগীতজ্ঞ, লৌহকার, সদ্য সন্তান প্রসব করা নারী—তাদের কাছ থেকেও খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়। আবার পুনর্বিবাহিত নারী, ছাতা নির্মাতা, এবং যারা অভিশপ্ত, তাদের খাদ্যও পরিহার করতে হবে। চিকিৎসক, পতিতা, এবং যারা লাঠি বহন করে, তাদের কাছ থেকে খাবার গ্রহণ করা নিষেধ। সোম বিক্রেতা এবং যারা কুকুরের জন্য রান্না করে, তাদের খাবারও গ্রহণ করা অনুচিত।’ তিনি বলেন, ‘কৃপণ ব্যক্তি যে খাবার ফেলে দেয়, কিংবা যারা অবশিষ্ট খাদ্য খায়, তাদের খাবারও গ্রহণ করা উচিত নয়। যারা ভীত, কাঁদছে, অপমানিত বা ক্লান্ত, তাদের খাবারও পরিহার করতে হবে। অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা খাবার, মৃত ব্যক্তির খাবার, এবং শ্বশুরের খাবারও গ্রহণ করা যাবে না। বিশেষ করে কারিগর এবং অস্ত্র বিক্রেতাদের খাবারও গ্রহণ করা উচিত নয়। যাদের সন্তান উৎপাদনে ক্ষতি হয়েছে, কিংবা যারা দুঃখে নিমজ্জিত, তাদের খাবারও এড়িয়ে চলতে হবে। এমনকি গুরু যদি যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেন, তাঁর খাবারও গ্রহণ করা উচিত নয়।’ ঋষি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের খাদ্য খায়, সে সেই ব্যক্তির পাপেও অংশীদার হয়। এইসব খাবার শুধু শূদ্রদের জন্য এবং যারা নিজেকে উৎসর্গ করেছে, তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য। জ্ঞানীরা বলেন, এইসব খাবার শূদ্রদের মাঝে অল্প দামে বিক্রি করা যেতে পারে। দ্বিজদের জন্য শূদ্রের কাছ থেকে তিলের খৈল ও তেল গ্রহণ করা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পেঁয়াজ, রসুন, ফারমেন্টেড খাবার এবং নির্গত পদার্থ পরিহার করতে হবে। শুকিয়ে যাওয়া বা বিকৃত খাবার, ছত্রাক, মাশরুম—এইসবও গ্রহণ করা উচিত নয়। দ্বিজ যদি উদুম্বর ফল বা লাউ খায়, সে অবশ্যই ধর্ম থেকে পতিত হয়। কাঁচা মাংস, দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত খাবার, এবং যজ্ঞের আহুতি—এইসবও পরিহার করতে হবে। নীপা, কপিত্থ, এবং প্লক্ষ ফলও এড়িয়ে চলতে হবে।’ ঋষি বলেন, ‘রাতে তিল মিশ্রিত দই গ্রহণ করা উচিত নয়। যে খাবার অনুচিত আচরণে, স্বভাবগতভাবে বা অপবিত্র সংস্পর্শে নষ্ট হয়েছে, তা পরিহার করতে হবে। কুকুরের গন্ধ পাওয়া খাবার, পুনরায় রান্না করা খাবার, বা চণ্ডালের দেখা পাওয়া খাবারও গ্রহণ করা যাবে না। অর্পিত নয়, বাসি, বা অবশিষ্ট খাবার সবসময় এড়িয়ে চলতে হবে। মানুষের গন্ধ পাওয়া বা কুষ্ঠরোগীর স্পর্শ পাওয়া খাবারও গ্রহণ করা উচিত নয়। যাদের পোশাক অপরিষ্কার, বা অন্যের স্পর্শে এসেছে, সেই খাবারও পরিহার করতে হবে।’ ঋষি বলেন, ‘মনু বলেছেন, ভেড়ার দুধ এবং সদ্য বাচ্চা দেওয়া পশুর দুধ পান করা উচিত নয়। বক, চকর, জালপদবিশিষ্ট পাখি, কোকিল—এইসব পাখি খাওয়া যাবে না। কবুতর, টিল্লা, গ্রাম্য মুরগি—তাও খাওয়া নিষেধ। শিয়াল, বানর, গাধা—তাদেরও খাওয়া যাবে না। জলজ ও স্থলজ প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য।’ তিনি বলেন, ‘মনু, জীবদের অধিপতি, বলেছেন—পাঁচ নখবিশিষ্ট প্রাণী সর্বদা আহারযোগ্য, তবে দেবতা ও ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার পরেই। অন্যভাবে নয়। বধ্রীণ পাখি, বক, এবং মাছ খাওয়া যায়, তবে পরাজিত হওয়ার পর। এইসব মাছ, হে শ্রেষ্ঠ দ্বিজ, আহারযোগ্য বলে ঘোষিত হয়েছে। নিয়ম অনুসারে, জীবন বিপন্ন হলেও অনুমতি আছে। চিকিৎসার জন্য, অক্ষম হলে, আদেশে, বা যজ্ঞের জন্য—তখন গ্রহণ করা যায়।’ ঋষির এই উপদেশে শিষ্যরা আহারের শুদ্ধতা ও তার ফল সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করল।