একদিন এক জ্ঞানী মহর্ষি তাঁর শিষ্যদের সামনে ধর্মাচরণের নানা সূক্ষ্ম বিধান বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘‘শুচিতার জন্য প্রস্রাবের পরে না ধুয়ে কখনোই নিজেকে পরিষ্কার করবে না, আর জলাশয়ে বীর্যপাতও করো না। কোনো পবিত্র বৃক্ষ কেটে ফেলা উচিত নয়, এবং জলে থুতু ফেলাও অনুচিত। কখনোই তুষ, অঙ্গার বা গোবরের ওপর বসবে না। পা দিয়ে এসব স্পর্শ করবে না এবং মুখ দিয়ে ফুঁ দেবে না—এটাই জ্ঞানীরা বলেন। আগুনে আগুন ফেলবে না, আবার আগুন জলে নিভিয়েও দেবে না। বিক্রয়ের জন্য কখনোই অযোগ্য বা ভেজাল দ্রব্য ব্যবহার করবে না। পুণ্যস্থান বা জলাশয়ের কাছে সীমানা নির্ধারণ করবে না। পশু, বন্য জন্তু বা পাখিদের একে অপরের মধ্যে বিঘ্ন ঘটাবে না। সন্ধ্যা বা প্রভাতে ভিক্ষার জন্য গৃহদ্বারে কড়া নাড়বে না। ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলবে এবং অনুচিত পথে প্রবেশ করবে না। নিজের অগ্নি হাতে স্পর্শ করবে না এবং দীর্ঘক্ষণ জলে অবস্থান করবে না। আগুনে মুখ দিয়ে ফুঁ দেবে না, কারণ আগুন মুখ থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। এক ব্রাহ্মণ কখনো একা সভায় যাবে না, বা কোনো সমাবেশে যুক্ত হবে না। কাপড় দিয়ে নিজেকে বাতাস করবে না এবং মন্দিরে শোবে না। যারা রোগাক্রান্ত, শূদ্র বা পতিত—তাদের সঙ্গে শয়ন করবে না। আগুন, গাভী বা ব্রাহ্মণের মাঝ দিয়ে কখনো যাবে না। যোগী, সিদ্ধ, তপস্বী বা ব্রতধারীদের নিন্দা করবে না। ব্রাহ্মণ বা গাভীর ছায়া ইচ্ছাকৃতভাবে পদদলিত করবে না। অঙ্গার, ছাই বা চুলের ওপর বসবে না। দ্বিজাতিদের জন্য নিষিদ্ধ আহার বা অনুপযুক্ত পানীয় গ্রহণ করবে না। যে ব্যক্তি অপ্রয়োজনে বা অনুচিতভাবে আহার করে, সে শূদ্রযোনিতে প্রবেশ করে। জীবিত অবস্থায় সে শূদ্র হয়, মৃত্যুর পরে কুকুররূপে জন্মায়। কেউ পরের খাদ্য খেয়ে মারা গেলে, সেই খাদ্যের যোগ্য জন্মলাভ করে। সংঘ, গণিকা বা ক্লীবের অন্ন গ্রহণ করবে না। বাদ্যকার, কুমার বা প্রসবোত্তর নারীর অন্নও এড়িয়ে চলবে। পুনর্বিবাহিতা নারী, ছাতার কারিগর বা অভিশপ্ত ব্যক্তির অন্নও গ্রহণ করবে না। চিকিৎসক, পতিতা বা দণ্ডধারীর অন্নও বর্জনীয়। সোমবিক্রেতা ও কুকুরের জন্য রান্না করা ব্যক্তির অন্ন গ্রহণ করা যাবে না। কৃপণ দ্বারা পরিত্যক্ত বা অবশিষ্টভোজী ব্যক্তির খাওয়া অন্নও এড়িয়ে চলবে। ভীত, কাঁদছে, অপমানিত বা ক্লান্ত ব্যক্তির অন্নও গ্রহণ করা অনুচিত। অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা, মৃতদেহের কাছ থেকে পাওয়া বা শ্বশুরের দেওয়া অন্নও বর্জনীয়। বিশেষত, কারিগর বা অস্ত্রবিক্রেতার অন্ন এড়িয়ে চলা উচিত। যার সন্তান উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটেছে বা যিনি শোকাক্রান্ত—তাঁদের অন্নও গ্রহণ করা উচিত নয়। এমনকি গুরু যদি যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেন, তাঁর অন্নও গ্রহণ করা অনুচিত। অন্যের অন্ন ভক্ষণকারী সেই ব্যক্তির পাপও ভোগ করে। এইসব খাদ্য শূদ্রদের জন্য গ্রহণযোগ্য, এবং যারা নিজেকে উৎসর্গ করেছে, তাদের জন্যও। জ্ঞানীরা বলেন, এইসব খাদ্য শূদ্রদের জন্য সামান্য মূল্যে দেওয়া যেতে পারে। তবু দ্বিজাতিরা শূদ্রের কাছ থেকে তেল ও তেলের খৈল গ্রহণ করতে পারে। পেঁয়াজ, রসুন, মদ্য, এবং নির্গত পদার্থ বর্জনীয়। শুকনো বা বিকৃত খাদ্য, ছত্রাক ও কুশলও পরিহার করবে।’’ এভাবে মহর্ষি একে একে শিষ্যদের সামনে আচার-বিধি ও নিষেধের কথা অত্যন্ত আন্তরিক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বর্ণনা করলেন, যাতে তাঁরা শুচি জীবন ও ধর্মের পথে অটল থাকতে পারেন।