প্রাচীন ঋষি ও জ্ঞানীরা একদিন একত্র হয়ে মানবজীবনের শুদ্ধাচার ও শিষ্টাচারের নিয়মাবলি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাঁরা বললেন, মিথ্যা অপবাদ দিলে তার জন্য কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই—এ অপরাধ চিরকাল কলঙ্কিত করে রাখে। আবার, কারো শরীরের যে অংশ পোশাকে ঢাকা বা দৃষ্টির অগোচর, তা অন্যের সামনে প্রকাশ করা বা ইঙ্গিত করা উচিত নয়। জ্ঞানী ব্যক্তি যদি অপবিত্র থাকেন, তখন তিনি সূর্য, চন্দ্র বা গ্রহের দিকে তাকাবেন না। কেউ যদি মুখে খাবার নিয়ে বা মুখ ঢেকে থাকে, তখন তার সঙ্গে কথা বলা অনুচিত। এছাড়াও, যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উন্মুক্ত, যে উন্মাদ বা মদ্যপ, তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। হাঁচি দিচ্ছেন, হাই তুলছেন বা ইচ্ছামতো বসে আছেন—এমন কোনো নারীর সঙ্গেও কথা বলার নিয়ম নেই। প্রস্রাবের ওপর দিয়ে পা ফেলা বা তার ওপর দাঁড়ানো উচিত নয়। অপবিত্র খাদ্য, মধু, ঘি বা কৃষ্ণমৃগচর্মে স্থাপিত হোমদ্রব্য কাউকে দান করা অনুচিত। তাঁরা আরও বললেন, ক্রোধে গা ভাসানো যাবে না এবং ঘৃণা বা আসক্তি থেকেও নিজেকে দূরে রাখতে হবে। হিংসা, অহংকার, শোক ও মোহ—এসবও পরিহার্য। নীচ প্রকৃতির বা কঠিন বুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের সঙ্গে কখনো মিশতে নেই। যারা গুণী, তাদের অবজ্ঞা করা উচিত নয়, এবং জ্ঞানী ব্যক্তি নিজেকেও কখনো অভিশাপ দেবেন না। নদীর মাঝে 'নদী' বা পর্বতের মাঝে 'পর্বত' বলে ডাকাও অনুচিত। নগ্ন অবস্থায় জলে প্রবেশ করা বা পায়ে আগুন পার হওয়াও নিষেধ। অপবিত্র কাউকে নিয়ে এমন স্থানে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে চুল বা গোপন অঙ্গ প্রকাশিত হয়। যৌনাঙ্গ, উদর বা হাস্যরসাত্মক বিষয় নিয়ে কথা বলা বা শোনা অনুচিত। জলকে পা বা হাতে আঘাত করা উচিত নয়। বর্বর জাতির ভাষা শেখা বা পা দিয়ে আসন টেনে নেওয়াও অনুচিত। ম্যাসাজ করতে হলে হঠাৎ বা অকারণে করা যাবে না। নাচ, গান বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো থেকেও বিরত থাকতে হবে। দেবতাদের প্রশংসা জাগতিক বা বাহ্যিক স্তোত্রে করা উচিত নয়। অপবিত্র অবস্থায় শোয়া বা নগ্ন হয়ে স্নান করাও নিষেধ। দাঁত দিয়ে চুল, নখ বা দেহের লোম কাটতে নেই; ঘুমন্ত কাউকে জাগানোও অনুচিত। শূন্য গৃহে একা ঘুমানো বা নিজেই চটি বহন করাও নিষেধ। নিজের পায়ে পা ধোয়া অনুচিত। বায়ু, অগ্নি, গুরু, ব্রাহ্মণ, সূর্য বা চন্দ্রের সামনে কখনো প্রাকৃতিক কর্ম করা যাবে না। সন্ধ্যা ও মধ্যাহ্নে এ কাজগুলো বিশেষভাবে এড়াতে হবে। দেবতার আসন বা মূর্তিকে পা দিয়ে স্পর্শ করা যাবে না। অকারণে গভীর জলে প্রবেশ বা জল বহন করাও অনুচিত। প্রস্রাবের পর জল না দিয়ে পরিষ্কার করা বা জলে বীর্যপাত করাও নিষেধ। পবিত্র বৃক্ষ কাটতে নেই, জলে থুতু ফেলাও অনুচিত। তুষ, অঙ্গার বা গোবরের ওপর বসা অনুচিত; পা দিয়ে স্পর্শ করা বা মুখ দিয়ে ফুঁ দেওয়াও নিষেধ। আগুনে আগুন নিক্ষেপ করা বা জল দিয়ে আগুন নিভানো যাবে না। অযোগ্য বা ভেজাল দ্রব্য বিক্রির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। পুণ্যক্ষেত্র বা জলাশয়ে সীমানা চিহ্নিত করা অনুচিত। পশু, বন্যপ্রাণী বা পাখিদের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করা যাবে না। সন্ধ্যা বা প্রভাতে ভিক্ষার জন্য ঘরের দরজায় কড়া নাড়া অনুচিত। সব ধরনের বিবাদ এড়িয়ে চলা উচিত, এবং অনুচিত পথে প্রবেশ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। এইভাবে, ঋষিরা মানবজীবনের জন্য শুদ্ধাচারের নিয়মাবলি নির্ধারণ করলেন, যাতে মানুষ পবিত্র ও সৎপথে জীবনযাপন করতে পারে।