এই মহাবিশ্বের বিস্তার এবং মন্বন্তরগুলির নির্ধারণ সম্পর্কে আগেই আলোচনা হয়েছে, যা জ্ঞান ও যোগে নিবেদিতদের সর্বদা পূজ্য বলে বর্ণিত হয়েছে। সেই জ্ঞান, যার দ্বারা আমরা পরম ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারি—এই জ্ঞানই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সমস্ত জ্ঞান লাভ করার পরও আমরা আবারও প্রকৃত সত্যের স্বরূপ জানতে আগ্রহী হলাম। এমন সময় পুরাণপাঠক সুত তাঁর স্মৃতিতে যা ছিল তা মনে করে কথা বলা শুরু করলেন। তিনি সেই স্থানে উপস্থিত হলেন, যেখানে শ্রেষ্ঠ ঋষিগণ যজ্ঞের জন্য একত্রিত হয়েছিলেন। দ্বিজাতিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই পুরুষ, পদ্মনয়ন মহর্ষি ব্যাসের প্রতি প্রণতি জানালেন। তিনি গুরুকে তিনবার পরিক্রমা করে, হাত জোড় করে তাঁর পাশে দাঁড়ালেন। তখন ঋষিরা তাঁর জন্য যথাযোগ্য আসন প্রস্তুত করে সসম্মানে তাঁকে প্রদান করলেন। তাঁরা সুতকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তোমার তপস্যা, অধ্যয়ন বা বিদ্যায় কোনো হ্রাস ঘটেছে কি?’’ তাঁরা বললেন, ‘‘তুমি আমাদের সেই ব্রহ্মবিষয়ক জ্ঞান বলো, কারণ আমাদের মধ্যে শোনার গভীর আকাঙ্ক্ষা জেগেছে; তুমি আমাদের সত্য কথা বলো।’’ তাঁরা জানতে চাইলেন, ‘‘যা একসময় বিষ্ণু কূর্ম অবতারে ঋষিদের বলেছিলেন, তুমি আমাদের তা বলো।’’ সুত তখন রুদ্রকে প্রণাম জানিয়ে, কল্যাণময় বাক্য উচ্চারণ করলেন। তিনি যা স্বয়ং সনৎকুমার ও অন্যান্যদের বলেছিলেন, সেই কথাই বললেন। অঙ্গিরা, রুদ্র ও সর্বোচ্চ ধর্মজ্ঞ ভৃগু, শুক্র, পূজনীয় বসিষ্ঠ এবং যাঁদের মন সংযত—তাঁরা সকলে একত্রে বদরিকার আশ্রমে কঠোর তপস্যা করছিলেন। সেই সময় তাঁরা নরসহিত নিত্য-অনাদি-অনন্ত নারায়ণকে ধ্যান করছিলেন। যোগীরা পরম ভক্তিতে, যোগজ্ঞ supreme নারায়ণকে প্রণতি জানালেন। সেই সময় নারায়ণ গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘‘এই তপস্যা কেন করা হচ্ছে?’’ সরাসরি, স্বয়ং ভগবান নারায়ণ তাঁদের সামনে আবির্ভূত হলেন—এটাই ছিল তাঁদের সিদ্ধির লক্ষণ। ঋষিরা বললেন, ‘‘আমরা কেবল আপনাকেই শরণাগত হয়েছি, হে পরমপুরুষ।’’ তখন নারায়ণ, সেই অনাদি, অপ্রকট পুরুষ, তাঁদের সামনে দাঁড়ালেন। তাঁরা বললেন, ‘‘আমরা আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই; আমাদের সমস্ত সন্দেহ দূর করুন। আত্মা কী? মুক্তি কী? পুনর্জন্ম কেন ঘটে? সেই পরম ব্রহ্ম কী? আপনি আমাদের সবকিছু বলুন।’’ তখন নারায়ণ তপস্বীর রূপ ত্যাগ করে, নিজস্ব দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্ন নিয়ে তিনি গলিত সোনার মতো দীপ্তিমান হয়ে উঠলেন। সেই মুহূর্তে, তাঁর নিজস্ব ঐশ্বর্য্যের কারণে, কোনো মানুষ তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পারল না। এমন সময় সদয় রুদ্র, স্বয়ং মহেশ্বর, সেখানে আবির্ভূত হলেন। সকলে আনন্দচিত্তে পরমেশ্বরকে ভক্তিভরে স্তব করতে লাগলেন—‘‘জয় হোক আপনাকে, সকল ঋষিদের অধিপতি, তপস্যায় পূজিত; জয় হোক আপনাকে, হে অনন্ত, সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও সংহারকারি; জয় হোক আপনাকে, দেবী অম্বিকার স্বামী, আপনাকে প্রণাম, হে পরমেশ্বর।’’ রুদ্র তখন হৃষীকেশকে আলিঙ্গন করে গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘‘হে অচ্যুত, এখানে এসে আমার কী কর্তব্য?’’ তখন ভগবান সদয় মহাদেবের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন, ‘‘যাঁরা আমার কাছে শরণাগত হয়ে সত্যদর্শনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এসেছেন, তাঁদের সামনে তুমি এই ঐশ্বরিক জ্ঞান প্রকাশ করো।