একবার ধন্বন্তরির আশ্রমে, নানা রকম চর্মরোগ ও কৃমি-সংক্রান্ত রোগের লক্ষণ ও কারণ সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। তিনি সুশ্রুতকে বললেন, ‘‘আমি তোমাকে বাত, কফ, পিত—এই ত্রিদোষের বিকার থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন চর্মরোগ এবং কৃমির উৎপত্তি ও লক্ষণ সম্পর্কে জানাব।’’ তিনি প্রথমে এক বিশেষ চর্মরোগের বর্ণনা দিলেন: ‘‘এটি ভিতরে শুকনো, বাইরে তেলতেলে, ভেতরে ঘষলে ধুলা ঝরে, স্পর্শে মসৃণ ও পাতলা, পরিষ্কার ও ঘামের ফুলের মতো দেখতে।’’ এরপর বললেন, ‘‘এ রোগে উপরের দিকে শুকিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, তীব্র চুলকানির গুচ্ছ দিয়ে ঢাকা থাকে, হাত ও পায়ে লাল সূচের মতো দাগ দেখা যায়, এবং এর নাম ‘বিপাদিকা’। এতে তীব্র যন্ত্রণা, প্রচণ্ড চুলকানি, লাল ফোঁড়া, এবং দুঃর্বা ঘাস বা অতসি ফুলের মতো রঙ দেখা যায়।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘এক ধরনের উঁচু গোলাকার দাগ, যার নাম ‘দদ্রু’, এটি চুলকানির সঙ্গে থাকে; এর ভিত্তি মোটা, ক্রমাগত দাহবেদনা, লাল স্রাব, এবং অনেক ঘা দেখা যায়। আবার একটি রোগে দাহ, স্যাঁতস্যাঁতে ভাব, যন্ত্রণা, এবং প্রতিটি জন্মে পুনরাবৃত্তি হয়; ফ্যাকাশে গোলাকার দাগ, লালাভ আভা, চুলকানি, দাহ ও যন্ত্রণা থাকে।’’ ধন্বন্তরি বললেন, ‘‘একটি রোগে দাগ উঁচু ও লাল হয়, যেন পদ্মপাতায় জল রয়েছে; এর নাম ‘পুণ্ডরীক’, যার ফোঁড়া সাদা ও লালচে। ‘পামা’ রোগে ফোঁড়া ও ফুসকুড়ি, চুলকানি, স্যাঁতস্যাঁতে ভাব ও যন্ত্রণা, সূক্ষ্ম, গাঢ় লাল, শুকনো, সাধারণত নিতম্ব, হাত ও কনুইয়ে দেখা যায়। আরেক রোগে ফোঁড়া, স্পর্শে ব্যথা, চুলকানি, লালচে দাগ ও তীব্র দাহবেদনা থাকে; ‘কাকণ’ নামের এই দাগ প্রথমে লাল, পরে কালো হয়ে যায়, ত্রিফলা ফলের মতো, এবং নানা কারণ থেকে উৎপন্ন হয়।’’ তিনি বললেন, ‘‘ত্রিদোষের পৃথক লক্ষণ ও কার্যাবলী নির্ধারণ করতে হবে; যেসব কুষ্ঠরোগ সব দোষের অনুসরণ করে, তা পরিত্যাগ করা উচিত। কুষ্ঠরোগ যদি অস্থি, মজ্জা বা শুক্রে থাকে, তা কঠিন; চর্বিতে থাকলে নিয়ন্ত্রণযোগ্য; চর্ম, মাংস বা অস্থিতে থাকলে দীর্ঘস্থায়ী। কফ ও বাত থেকে উৎপন্ন, কেবল চর্মে সীমাবদ্ধ বা অপবিত্র হলে, তা কঠিন নয়; চর্মে থাকলে দেহে বিবর্ণতা ও শুষ্কতা দেখা যায়। রক্ত ও মাংসে ঘাম, উষ্ণতা, ফোলা, হাত-পায়ে ফোঁড়া, বিশেষত সংযোগস্থলে দেখা যায়।’’ ধন্বন্তরি আরও বললেন, ‘‘ত্রিদোষের বারবার সংযোগে চর্বি নষ্ট হয়; মজ্জা, অস্থি, চোখ বা কণ্ঠে স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। যদি ক্ষত, শুক্রে কৃমি, স্ত্রী-সন্তানের রোগ দেখা যায়, পূর্বের সব লক্ষণ প্রাণী ও অন্যদের মধ্যে দেখা যায়। কাঠ থেকে উৎপন্ন শ্বেত্র (শ্বেত দাগ) ভয়ানক ও কঠিন; এটি ত্রিদোষের বিকার থেকে সৃষ্টি হয়। বাত থেকে দাগ শুকনো ও লালচে, পিত থেকে দাগ তামার মতো, পদ্মপাতার মতো, চুলের ক্ষতি করে, কফ থেকে দাগ সাদা, ঘন ও ভারী। চুলকানির সঙ্গে দাগ ধীরে ধীরে লাল হয়, মাংস ও চর্বিতে প্রভাব ফেলে; রঙ দেখে দুই ধরন চিহ্নিত হয় এবং ক্রমশ তীব্রতা বাড়ে।’’ তিনি সতর্ক করে বললেন, ‘‘যদি দাগ সাদা না হয়, প্রচুর চুল থাকে, সংযুক্ত না হয়, নতুন ও আগুনে পোড়া না হয়, তবে শ্বেত্র নিরাময়যোগ্য; অন্যথায় তা পরিত্যাগ করা উচিত। যদি দাগ নতুন করে যৌনাঙ্গ, হাতের তালু বা ঠোঁটে দেখা যায়, সাফল্যপ্রার্থী ব্যক্তিদের তা বিশেষভাবে পরিহার করা উচিত। রোগ সাধারণত সংস্পর্শ, খাবার ভাগাভাগি, বিছানা, আসন, পোশাক, মালা, মলম ভাগাভাগি থেকে ছড়ায়।’’ এরপর ধন্বন্তরি কৃমির বিষয়ে বললেন, ‘‘কৃমি দুই ধরনের: বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ। বাহ্যিক কৃমি চার ধরনের—ময়লা, কফ, রক্ত ও বিষ্ঠা থেকে উৎপন্ন। বাহ্যিক কৃমি বিশ প্রকার; ময়লা থেকে উৎপন্ন কৃমি তিলের মতো আকার ও আকৃতির, চুল ও পোশাকে বাস করে। এরা বহু পা-ওয়ালা ও সূক্ষ্ম, ‘উকুন’ ও ‘নিট’ নামে পরিচিত, দুই ধরনের, দেহে বাস করে এবং চুলকানি ও ফোলা সৃষ্টি করে।’’ তিনি বললেন, ‘‘কুষ্ঠর sole কারণ অভ্যন্তরীণ কৃমি; বাহ্যিক কফ ও মিষ্টি খাবার, গুড়, দুধ, দই, মাছ, নতুন ভাত থেকে উৎপন্ন। পাকস্থলীতে কফ থেকে জন্ম নিয়ে, তারা বেড়ে উঠে, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে; কেউ চওড়া সূতার মতো, কেউ ফোলা গুটির মতো। কেউ অঙ্কুরিত শস্যের মতো, পাতলা, লম্বা, ছোট; সাদা বা তামার মতো, সাত ধরনের। কেউ অন্ত্রে জন্ম নিয়ে পেট ঘিরে রাখে, কেউ হৃদয় থেকে, কেউ মলদ্বার থেকে; তারা ঘাসফুলের মতো, সুগন্ধী, এবং নানা প্রভাব সৃষ্টি করে।’’ ধন্বন্তরি বললেন, ‘‘এরা বমি, মুখে জল, অজীর্ণতা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, অজ্ঞান, বমি, জ্বর, পেট ফোলা, শুকিয়ে যাওয়া, হাঁচি, নাক বন্ধ করে। রক্তনালিতে জন্ম নেওয়া কৃমি সূক্ষ্ম, পা-হীন, গোলাকার, তামার মতো, অত সূক্ষ্ম যে কিছু দেখা যায় না। চুল থেকে উৎপন্ন কৃমি চুল ধ্বংস করে, চুলের দ্বীপ তৈরি করে, ডুমুরের মতো; এই ছয় ধরনের কৃমি কুষ্ঠের sole কারণ, সঙ্গে sausura ও samatara। বৃহদান্ত্রে মল থেকে জন্ম নেয়া কৃমি ছড়িয়ে পড়ে, বেড়ে উঠে পাকস্থলীতে যায়। তখন তারা দুর্গন্ধ, শ্বাসকষ্ট, মলের গন্ধ তৈরি করে; চওড়া, গোল, মোটা, এবং কালো, হলুদ, সাদা বা কালো হতে পারে। এই কৃমি পাঁচ নামে পরিচিত: কাকেরুকা, মাকেরুকা, সাউসুরা, সাশুলা ও লেলিহা; এরা সন্তান উৎপাদন করে।’’ ধন্বন্তরি বললেন, ‘‘এরা কথা বিভাজিত করে, তীব্র যন্ত্রণা, শক্ত হয়ে যাওয়া, শুকিয়ে যাওয়া, রুক্ষতা, ফ্যাকাশে ভাব, লোম খাড়া হওয়া, মলদ্বারে উষ্ণতা, চুলকানি, অস্বাভাবিক মলত্যাগ সৃষ্টি করে।’’ এরপর তিনি বাত-সংক্রান্ত রোগের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করলেন: ‘‘হে সুশ্রুত, বাতজ রোগের উৎপত্তি আমি ব্যাখ্যা করবো। প্রতিটি দুর্ভাগ্যের মূল কারণ বাধা। অদৃশ্য, বিকৃত বাত দেহে সর্বত্র প্রভাব ফেলে; তিনি সৃষ্টিকর্তা, সকলের আত্মা, বিশ্বরূপ, জীবের অধিপতি। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সর্বব্যাপী, বিষ্ণু, বিনাশক, মৃত্যু ও অন্ত। তাই যা বলা হয়েছে, তা সর্বদা চেষ্টা করে অনুসরণ করতে হবে। বর্ণিত দোষগুলো জানার পর, স্বাভাবিক ও পরিবর্তিত কার্যাবলী বিচার করতে হবে, সংক্ষেপ ও বিস্তারিতভাবে দোষের বিভিন্নতা নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিটি দোষ পাঁচভাবে, তাদের বিভাজন, কারণ ও লক্ষণসহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’’ এইভাবে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে নানা চর্মরোগ, কুষ্ঠ, শ্বেত্র, কৃমি ও বাতজনিত রোগের লক্ষণ, কারণ ও বিভাজন সম্পর্কে বিশদভাবে উপদেশ দিলেন।