একবার, ধন্বন্তরির কাছ থেকে সুশ্রুত শুনলেন নানা রোগের লক্ষণ ও কারণ সম্পর্কে। ধন্বন্তরি বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি অ্যানিমিয়া বা যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়, তখন তার নাভি, পা, মুখ ও মূত্রনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তার মল কৃমির মতো, ভাঙা, ও শ্লেষ্মা মিশ্রিত হয়। যদি পিত্ত-প্রকোপিত ব্যক্তি পিত্তবর্ধক উপাদান গ্রহণ করে, তখন তার জন্ডিস হয়; পিত্ত অন্ত্রে প্রবেশ করে রক্ত ও মাংসকে দগ্ধ ও ক্ষয় করে। এ সময় তার প্রস্রাব ও চোখ হলুদ হয়ে যায়, মুখ ও মল লাল হয়; তার শরীরে দাহ, অস্বাভাবিক হজম, তীব্র তৃষ্ণা, ব্যাঙের মতো চেহারা ও ইন্দ্রিয় দুর্বলতা দেখা যায়। অ্যানিমিয়ার সঙ্গে পিত্তের কারণে ফোলা হয়; অবহেলা করলে ফোলা ও অনুরূপ কঠিন রোগ, যেমন ড্রপসি ও তীব্র জন্ডিস সৃষ্টি হয়। যখন অ্যানিমিয়ার সঙ্গে সবুজ বা কালো পিত্ত, এবং বাত ও পিত্ত যুক্ত হয়, তখন মাথা ঘোরা, তৃষ্ণা, নারীদের যৌন উত্তেজনা ও মৃদু জ্বর দেখা যায়। যদি ঘুমঘুম ভাব বা হজমের আগুন নিভে যায়, তাকে হলীমক বলা হয়; অতিরিক্ত অলসতা তার প্রাথমিক লক্ষণ। ফোলা রোগের মূল কারণ ব্যাখ্যা করা হয়: যখন পিত্ত, রক্ত, শ্লেষ্মা ও বাত দুষ্ট হয়, তখন তারা দুষিত পদার্থকে বাহ্যিক শিরায় নিয়ে যায়। সেখানে তারা প্রবাহ বাধা দেয়, ও চর্ম ও মাংসে ফোলা স্থাপন করে; এই দৃঢ়, উঁচু ফোলাকে কেউ কেউ সঞ্চয় বলে। সব ধরনের কারণ, নানা রূপ ও প্রকৃতিতে, সব দোষ, আঘাত বা বিষ থেকেও ফোলা সৃষ্টি হয়। যখন এটি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কামজন্ডিস প্রকাশ পায়; এর বিস্তৃত, উঁচু ও গিঁটযুক্ত বৈশিষ্ট্য থাকে, এবং তিন ধরনের পরিচিত। ফোলার সাধারণ কারণ দোষের অশান্তি; বিশেষ করে উপবাসে দুর্বলদের মধ্যে রোগ দ্রুত জন্ম নেয়। যখন কেউ অতিরিক্ত ভারী বা অতিশয় ঠাণ্ডা খাদ্য, বা নুন, ক্ষার, ঝাল, টক সবজি, জল, অথবা অনিয়মিত ঘুম-জাগরণ করেন, তখন সমস্যা বাড়ে। স্বাভাবিক প্রবৃত্তি দমন, শক্ত মাংস খাওয়া, অজীর্ণতা, ক্লান্তি, যৌনতা, ভ্রমণ, বা যানবাহনের উত্তেজনা—সবই ফোলার কারণ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, কাশি, ডায়ারিয়া, অর্শ, উদররোগ, জ্বর, ফোলাভাব, অলসতা, বমি, হেঁচকি, অ্যানিমিয়া ও ছড়ানো চর্মরোগ দেখা যায়। যখন ফোলা মূত্রথলি উপরে, নিচে বা মাঝখানে হয়, এবং কেন্দ্রে থাকে, তখন পুরো শরীরে হলে তাকে 'সর্বাঙ্গগ', বিস্তৃত হলে 'সর্বগত', ও স্থানীয় হলে 'প্রত্যাপ্রত্যগ' বলা হয়। এর প্রাথমিক লক্ষণ—হাঁচি, মাথা ও অঙ্গের ভার, বাতের ফোলা যা চলমান, শুষ্ক, চুল রুক্ষ, রক্তিম বা কালো। মূত্রথলি, সংযোগস্থল ও চর্বি টিস্যুতে ফোলা, অসাড়তা, বাতের ঊর্ধ্বগতি, ক্লান্তি ও দ্রুত বাড়া—সবই শরীরকে কষ্ট দেয়। যদি ফোলা তৈলাক্ত হয়, মালিশে তা কমে, রাতে ছোট ও দিনে বড় হয়; সরিষার তেল মাখালে চামড়া চুলকায়। পিত্তের কারণে ফোলা হলুদ-লাল, শুষ্ক, সহজে কমে না, দেহকে ভিতর থেকে দগ্ধ করে। তৃষ্ণা, দাহ, জ্বর, ঘাম, মাথা ঘোরা, স্যাঁতসেঁতে ভাব, অজ্ঞানতা, কাম, ডায়ারিয়া, গন্ধ, স্পর্শে কোমলতা দেখা যায়। চুলকানি, ফ্যাকাশে চুল, শক্ত ও ঠাণ্ডা চামড়া, ভার, তৈলাক্ততা, মসৃণতা, দৃঢ়তা, ব্যথা, ঘুম, বমি, দুর্বল হজম হয়। আঘাত, কাটাছেঁড়া, ক্ষত, ঠাণ্ডা বাতাস, টক বাতাস, ভল্লাতক ও কপিকচ্ছু উদ্ভিদ থেকেও ফোলা হয়। ঝাল বা শুষ্ক পদার্থের সংস্পর্শে ফোলা হয়, সঙ্গে ছড়ানো প্রদাহ, তীব্র উষ্ণতা, রক্তিমতা ও পিত্তের লক্ষণ। বিষের কারণে ফোলা বিষাক্ত প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা সংস্পর্শে, এমনকি অ-বিষাক্ত প্রাণী থেকেও হয়। মল, মূত্র, বীর্য বা অন্য অপবিত্র পদার্থ, বিষাক্ত উদ্ভিদ বা বাতাস, বা বিষাক্ত গুঁড়ার ব্যবহারেও ফোলা হয়। এ ধরনের ফোলা নরম, চলমান, ঝুলে পড়ে, দ্রুত দাহ ও ব্যথা দেয়, নতুন, জটিলতা নেই, এবং শাস্ত্রমতে আরোগ্যযোগ্য বা অনারোগ্য হয়। ধন্বন্তরি বললেন, এখন আমি ছড়ানো রোগ, যেমন বিসর্পার কারণ ব্যাখ্যা করব—শুনো, সুশ্রুত। বিসর্পা আঘাত ও দুষ্ট দোষ থেকে হয়, ফোলার মতো। এর অবস্থান বাহ্যিক, সেখানে ভয় বা ক্লান্তিতে এটি আরও তীব্র হয়; নির্দিষ্ট দোষের উপর নির্ভর করে এর চিকিৎসার কঠিনতা। বিশেষ উত্তেজক দ্বারা দোষ দ্রুত দেহে প্রবেশ করে, ভিতরে বা বাইরে প্রকাশ পায়। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, প্রবৃত্তি বিকার, অনিয়মিত আচরণ, হজমের আগুন হঠাৎ নিভে গেলে রোগ বাহ্যিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বাতের কারণে বিসর্পা বাত-জ্বরের মতো: ফোলা, কাঁপা, তীব্র ব্যথা, ক্লান্তি, উত্তেজনা। পিত্তের কারণে দ্রুত ছড়ায়, পিত্ত-জ্বরের লক্ষণ, তীব্র রক্তিমতা; শ্লেষ্মার কারণে চুলকানি, তৈলাক্ততা, শ্লেষ্মা-জ্বরের লক্ষণ। সব কারণের মিলনে, সব লক্ষণসহ, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে জমা হয়, ফুসকুড়ি উপেক্ষা করলেও ঘাম নির্গত হয়, ক্ষতের চিহ্ন বহন করে। জ্বর, বমি, অজ্ঞানতা, ডায়ারিয়া, তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা, ফোলা ফেটে যাওয়া, ক্ষুধা নষ্ট, অন্ধকার, স্বাদহীনতা—বাত ও পিত্তের কারণে হয়। এটি সব অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, যেন জ্বলন্ত অঙ্গার ছড়ানো; যেখানে ছড়ায়, সেখানে বিস্তার ঘটে। অঙ্গার নিভে গেলে, তা কালো, নীল বা লাল হয়ে জমা হয়; আগুনে দগ্ধের মতো, ফুসকুড়ি নিয়ে দ্রুত গতিতে ছড়ায়। ছড়ানো রোগ প্রাণকেন্দ্র অনুসরণ করলে, বাত অত্যন্ত প্রবল হলে, অঙ্গের ব্যথা, অজ্ঞানতা, ঘুম, শ্বাসকষ্ট হয়। হেঁচকি দেখা দেয়, এবং ব্যক্তি এমন অবস্থায় পৌঁছায়; কখনও প্রাণকেন্দ্রে আক্রান্ত হয়ে মাটিতে, বিছানায়, বা আসনে শুয়ে থাকে। তখন, কষ্টে সে ব্যাকুল হয়, দেহ ও মন বিভ্রান্ত, ঘুম থেকে জাগানো কঠিন হয়; এটিকে অগ্নিময় বিসর্পা বলা হয়। বাত শ্লেষ্মা দ্বারা বাধা পেলে, তা নানা ভাবে শ্লেষ্মা বা রক্ত ভেদ করে; রক্ত বাড়লে তা চামড়া, শিরা, স্নায়ু ও মাংসে প্রভাব ফেলে। এইভাবে ধন্বন্তরি সুশ্রুতকে রোগের লক্ষণ, কারণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে জানালেন, যাতে তিনি যথাযথভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করতে পারেন।