ধন-সম্পদের গুরুত্ব বোঝাতে শাস্ত্রে বলা হয়েছে—যার কাছে ধন আছে, তার বন্ধুও আছে; যার কাছে ধন আছে, তার আত্মীয়-স্বজনও আছে; যার কাছে ধন আছে, সে সমাজে সম্মানিত হয়; এমনকি, ধনবান ব্যক্তিকে সবাই জ্ঞানী বলেও মনে করে। কিন্তু বিপরীত দিকটি আরও নির্মম—যদি কারও ধন না থাকে, তার বন্ধু, পুত্র, স্ত্রী, সঙ্গী—সবাই তাকে ছেড়ে চলে যায়। আবার, যদি সেই ব্যক্তির কাছে ধন ফিরে আসে, তারাও আবার ফিরে আসে। এই জগতে ধনই যেন মানুষের প্রকৃত আত্মীয়। তবে শুধু ধন থাকলেই চলবে না। শাস্ত্রবিদ্যা না জানা রাজা অন্ধের মতো; অন্ধ মানুষ যদি পথপ্রদর্শক পায়, কিছুটা এগোতে পারে, কিন্তু শাস্ত্রজ্ঞানহীন রাজা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকে। রাজ্যের পুত্র, দাস, মন্ত্রী, পুরোহিত, এমনকি নিজের ইন্দ্রিয়সমূহ যদি অলস হয়ে পড়ে, সেই রাজ্য বেশিদিন টিকে না। যে ব্যক্তি পুত্র, দাস ও আত্মীয়দের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীও অর্জন করে, সে অন্যান্য রাজাদের সঙ্গে চার যুগ ধরে রাজত্ব করতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি শাস্ত্র ও যুক্তির নির্ধারিত পথকে অবজ্ঞা করে, সে নিজে, তার রাজ্য—এমনকি পরলোকে গিয়েও—নাশ হয়। রাজাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—বিপদ আসলে যেন মন খারাপ না করে, সুখ-দুঃখে যেন সমানচিত্তে থাকে, হৃদয় যেন পরিষ্কার রাখে। দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিরা কখনো বিপদে হতাশ হয় না—চাঁদও তো রাহুর মুখে পড়ে আবার উদিত হয়। যারা ক্ষণিক সুখের জন্য দেহকে আহ্লাদিত করে, তাদের প্রতি নিন্দা; ধনের অভাবে দুঃখ করার কিছু নেই, কারণ দেহ নিজেই তো নশ্বর। স্ত্রী-পুত্র থাকা সত্ত্বেও, পাণ্ডবদের মতো, অনেকেই দুঃখ ত্যাগ করে আবার সুখ লাভ করেছে। রাজাকে আরও বলা হয়েছে—গান্ধর্ববিদ্যা, সংগীত, এবং নর্তকীদের সভা দেখে যেমন আনন্দ পাওয়া যায়, তেমনই পৃথিবীতে ধনুর্বিদ্যা ও রাজনীতি রক্ষা করা উচিত। কোনো কারণ ছাড়াই দাসের ওপর রাগ করলে, সেই রাজার মধ্যে বিষধর কালনাগের মতো উন্মাদনা জন্মায়। দৃষ্টি যেন অস্থির না হয়, মিথ্যা কথা যেন বলা না হয়—বিশেষত মানুষের, জ্ঞানী ব্রাহ্মণদের এবং দাসদের ক্ষেত্রে। দাস ও আত্মীয়দের অহংকারে যে রাজা খেলাচ্ছলে রাজ্য চালায়, শত্রুরা তাকে দ্রুত পরাস্ত করে। রাজা যেন কখনো অকারণে রাগ প্রকাশ না করে, কেবল কথার মাধ্যমে ভ্রুকুটি না দেখায়; নিরপরাধ দাসকে শাস্তি দিলে সে নীচ রাজা। অলস বিলাসিতার ভোগও ত্যাগ করা উচিত। যারা সুখ ও সাফল্যে নিমগ্ন, তারা যেন সংঘাতপ্রবণ শত্রুকে দমন করে। যত্ন, উদ্যোগ, সাহস, বুদ্ধি, শক্তি ও বীর্য—এই ছয়টি উৎসাহ যার মধ্যে আছে, তার সামনে দেবতারা পর্যন্ত সতর্ক থাকে। কোনো কাজে যথেষ্ট চেষ্টা করেও যদি সাফল্য না আসে, তবে তা ভাগ্যের কথা; তবুও মানুষের উচিত সদা চেষ্টা করে যাওয়া। এবার সুত বললেন—দাসদেরও নানা ধরন আছে—উত্তম, মধ্যম ও অধম; তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া উচিত। দাসের গুণাবলির বিচার এবং তাদের পরখ করার নিয়ম তিনি ব্যাখ্যা করলেন। যেমন সোনা চারভাবে—ঘষে, কেটে, আগুনে পুড়িয়ে ও পিটিয়ে—পরীক্ষা করা হয়, তেমনি দাসকে চারটি বিষয়ে—চরিত্র, স্বভাব, সময় ও কাজে—পরীক্ষা করতে হয়। যিনি উৎকৃষ্ট বংশ, সদ্গুণ, সত্য ও ধর্মে নিষ্ঠ, সুন্দর ও প্রফুল্ল—তাকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়। যে মূল্য ও রূপ বিচার করতে পারে, সে রত্নমূল্য নির্ধারক; যে শক্তি-দুর্বলতা বুঝতে পারে, সে সেনাপতি। যে অঙ্গভঙ্গি বোঝে, বলবান ও সতর্ক, কর্মঠ—সে দ্বাররক্ষক। বুদ্ধিমান, বাক্পটু, জ্ঞানী, সত্যবাদী, সংযমী ও সর্ববিদ্যায় পারদর্শী—এমন ব্যক্তিই লেখক। বিচক্ষণ, অন্যের মন বোঝে, কঠোর, নির্দেশিত কথায় কথা বলে—তাকে দূত করা হয়। স্মৃতি ও ধর্মশাস্ত্রে পারদর্শী, ইন্দ্রিয়জয়ী, সাহসী, বলবান, গুণবান—এমন ব্যক্তি ন্যায়াধিপতি। যিনি বংশানুক্রমে পাকা, শাস্ত্রজ্ঞ, সত্যবাদী, শুচি ও কঠোর—তাকে রাঁধুনি বলা হয়। আয়ুর্বেদে পারদর্শী, সকলের প্রিয়, দীর্ঘায়ু, সদ্গুণে ভূষিত—তাকে চিকিৎসক করা হয়। যিনি বেদ ও অঙ্গবিদ্যায় পারদর্শী, পাঠ ও যজ্ঞে নিয়োজিত, সর্বদা আশীর্বাদে মনোযোগী—তিনি রাজপুরোহিত। লেখক, পাঠক, হিসেবকারী, বিতর্ককারী ও অলস—এমন দাস রাজাকে সর্বদা এড়িয়ে চলা উচিত। যিনি দ্বিমুখী, উত্তেজক, অতি নিষ্ঠুর, অত্যন্ত কঠোর—তার কথা নিরীহের সর্বনাশ ডেকে আনে। কু-ব্যক্তিকে, সে যতই বিদ্যায় ভূষিত হোক, এড়িয়ে চলা উচিত—জহর বসানো সাপ তো ভয়ঙ্করই। অকারণে রাগী দুষ্ট ব্যক্তিকে কে না ভয় পাবে? বিষধর সাপের মতো, তার মুখেই বিষ ও কটু কথা জমে থাকে। যে দাস ধনে, যোগ্যতায়, গোপন বিষয়ে জ্ঞানে, সংকল্পে সমান, এবং রাজ্যের অর্ধেক দখল করে, তাকে হত্যা করলেও রাজা দোষী হয় না। যারা সাহসী, কিন্তু মৃদুভাষী, ইন্দ্রিয়জয়ী, প্রকৃত বীর—তারা প্রথমে যেমন, পরে বদলে যায়—এমন দাস উপকারে আসে না। যারা অলসতা থেকে মুক্ত, সন্তুষ্ট, সতর্ক, সুখ-দুঃখে ধৈর্যশীল, দৃঢ়চিত্ত—এমন দাস এই পৃথিবীতে বিরল। যার ধৈর্য ও লজ্জা নেই, মন নিষ্ঠুর, কুৎসাবাদী, প্রতারণাপূর্ণ, ছলনাময়, লোভী, অযোগ্য, ভীতু—তাকে রাজা অবশ্যই বরখাস্ত করবে। দুর্গে নানা অস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা উচিত; তারপর শত্রুকে আঘাত করতে হবে। রাজা ছয় মাস বা এক বছরের সন্ধি করে নিজেকে সতর্কভাবে রক্ষা করবে, পরে আবার শত্রুকে আঘাত হানবে। শেষে বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি রাজ্যের জন্য তিন ধরনের মূর্খকে নিয়োগ করে, সে রাজ্যের অপমান, ধনহানি ও নরকে পতন ঘটায়। এভাবেই শাস্ত্রের এই অংশে রাজা ও রাজ্যের কল্যাণ, দাস নির্বাচন ও পরিচালনার গভীর নীতিগুলি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে।