একদিন এক জ্ঞানী ঋষি তাঁর শিষ্যদের কাছে সময়, তিথি, নক্ষত্র, এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত দেবতাদের মাহাত্ম্য ও আচরণের নিয়মকানুন বোঝাতে লাগলেন। তিনি বললেন— "বীজ বপন, যাতায়াতের কাজ ও গমনাগমন-সম্পর্কিত যেসব কর্ম আছে, সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ে করা উচিত। আবার, যেসব কাজ পাশের দিকে বা পার্শ্ববর্তী স্থানে করতে হয়, সেগুলোও এই সময়েই করতে হয়। উত্তরের দিকে মুখ করা বারোটি নক্ষত্রের মধ্যে বরুণ, শ্রবণ এবং আরও নয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই উপরের দিকে মুখ করা নক্ষত্রগুলিতে যেসব কাজ উন্নতি বা ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে, সেগুলোই করা উচিত। নবমী, দ্বাদশী, চতুর্দশী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা—এই তিথিগুলিরও বিশেষ গুরুত্ব আছে। তৃতীয়া পৃথিবীপুত্রের সঙ্গে, চতুর্থী শনির সঙ্গে, সপ্তমী সোমপুত্রের সঙ্গে, অষ্টমী মঙ্গল ও সূর্যের সঙ্গে, একাদশী বৃহস্পতি ও শুক্রের সঙ্গে, দ্বাদশী আবার বুধের সঙ্গে যুক্ত। পূর্ণিমা ও অমাবস্যা বৃহস্পতির জন্যও শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য। তবে দশমীতে মঙ্গল এবং নবমীতে বুধের কার্য এড়িয়ে চলা উচিত। ষষ্ঠীতে সূর্যপুত্রের জন্যও কোনো গমন বা বিশেষ কাজ করা উচিত নয়। বিশেষ করে বুধবারে যাত্রা আরম্ভ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আবার, বৃষ, কুম্ভ, মকর ও তুলা রাশিতে চতুর্থী বা দ্বাদশী তিথি দুঃখ ও অশুভ ফল দেয়, তাই এই সময়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা উচিত নয়। মঙ্গলবারে তিনটি ধনিষ্ঠা, বুধবারে তিনটি রেবতী এবং শনিবারে তিনটি উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্রে কাজ এড়িয়ে চলা উচিত। সূর্য যখন মূলায়, চন্দ্র যখন শ্রবণে, মঙ্গল যখন উত্তরপ্রোষ্ঠপদায়, শুক্র যখন পূর্বফাল্গুনীতে, শনির সঙ্গে স্বাতী—এসব সময়ও শুভ নয়। সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শক্তি ও শুভফল সবসময় পাওয়া যায় না; অনেক সময় তা নিষ্প্রভ ও অনুচিত হয়। পাত্র ও পাত্রী—পুরুষ ও নারীর নামের অক্ষর থেকে তিনটি ভাগে নাম নিয়ে মিল করলে শুভ সময় নির্ধারণ সহজ হয়। বিশেষ কিছু যোগ ও নক্ষত্রের কথা বললেন ঋষি—বিশ্কম্ভ যোগে পাঁচ ঘটি, শূল যোগে সাত ঘটি সময় শুভ; ব্যতীপাত, পরিঘ ও বৈধৃতি যোগে প্রতিদিন হিসেব রাখতে হয়। হস্তায় সূর্য, পুষ্যায় বৃহস্পতি, অনুরাধায় বুধবার শুভ; শুক্রবারে রেবতী, অশ্বিনীতে মঙ্গল, শুক্রের সঙ্গে ভরণী, চন্দ্রের সঙ্গে চিত্রা, বৃহস্পতির সঙ্গে শতভিষা, শুক্রের সঙ্গে রোহিণী—এসব সময় বিশেষভাবে শুভ। পুষ্য, পুনর্বসু, রেবতী ও চিত্রার সংযোগেও শুভকার্য করা যায়। শতভিষায় জন্মাদি ক্রিয়াকর্ম করা উচিত, কিন্তু আশ্লেষা ও কৃত্তিকায় গমন বা মৃত্যুকর্ম অশুভ। এইভাবে ঋষি বললেন, “এভাবে গরুড় মহাপুরাণের আচারকাণ্ডের জ্যোতিষশাস্ত্রের ঊনষাটতম অধ্যায়ে নক্ষত্র, তাদের দেবতা ও যোগের দাহ সংক্রান্ত বর্ণনা সম্পূর্ণ হল।” এরপর তিনি সময়ের আরও গভীর রহস্য উন্মোচন করলেন— ছয়টি আদিত্যে দশটি তিথি, সোমে পনেরোটি তিথি স্মরণীয়। শনির দশ বছর, বৃহস্পতির ঊনিশ বছর, সূর্যের দশ বছর—এগুলি সময়ের বিশেষ পর্ব, যার মধ্যে সূর্যের দশ বছর রাজাদের জন্য দুঃখ ও ধ্বংস ডেকে আনে। মঙ্গলের সময় দুঃখ ও রাজ্যহানি হয়, শনির সময় রাজ্যহানি, বন্ধন ও কষ্ট, আর রাহুর কালে রাজ্যহানি, রোগ ও দুঃখ আসে। তিনি রাশিচক্রও ব্যাখ্যা করলেন— মেষ মঙ্গলের, বৃষ শুক্রের, সিংহ সূর্যের, কন্যা বুধের, ধনু বৃহস্পতির, মকর ও কুম্ভ শনির। পূর্ণিমা ও পূর্বাষাঢ়ায় দুটি করে ভাগ, এবং অশ্বিনী, রেবতী, চিত্রা ও ধনিষ্ঠা—এই নক্ষত্রগুলি শোভা ও অলংকারের জন্য শুভ বলে গণ্য। এভাবেই ঋষি শিষ্যদের সময়, নক্ষত্র, তিথি ও গ্রহের শুভাশুভ ফল, তাদের দেবতা এবং আচরণের নিয়ম এক স্নিগ্ধ, পবিত্র ধারায় শ্রদ্ধাভরে তুলে ধরলেন।