ভাসুদেব যখন শুনলেন যে হরি তাঁর দেহ ত্যাগ করেছেন, তখন তিনি নিজেকে শুদ্ধ করে ও জগতের মহামায়ার ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে স্বেচ্ছায় প্রাণ ত্যাগ করলেন। এদিকে, মহাশোকাকুল অর্জুন প্রভাসে গিয়ে সকলের যথাযথ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। এরপর তিনি হরির দেহ পরীক্ষা করে, কাঠের চিতা প্রস্তুত করে, স্বীয় আট রাণীকে সঙ্গে নিয়ে সেই চিতায় অগ্নি সংযোগ করলেন। রামের দেহ এবং রেভতীকে চিতায় দাহ করার পর অর্জুন দ্বারকা গিয়ে সকল নাগরিককে শহর থেকে বের করে নিয়ে এলেন। তখন ভাসুদেবের সেই নগর সমুদ্রের জলে প্লাবিত হয়ে গেল; অর্জুন সকল মানুষকে নিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলেন। পথে কৃষ্ণের রাণীরা ডাকাত ও রাখালদের দ্বারা লুণ্ঠিত হলেন, তাঁদের সমস্ত ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হল, আর অর্জুন সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়লেন। পরে ইন্দ্রপ্রস্থে পৌঁছে অর্জুন অনিরুদ্ধের পুত্র বজ্রকে রাজ্যাভিষেক করলেন, কারণ তখন তাঁর শক্তি অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল। অর্জুন তাঁর দুঃখের কথা মহর্ষি ব্যাসকে জানালেন। তখন সেই মহাবীর ব্যাস তাঁকে বললেন, ‘‘হরি ও তুমি আবার জন্ম নিলে, হে জ্ঞানী, তখন পুনরায় তোমার শক্তি অপরিমেয় হবে পরবর্তী যুগে।’’ এই কথা শুনে অর্জুন নাগপুরে গেলেন। সেখানে তিনি কষ্টাকুল হয়ে যুধিষ্ঠিরকে কৃষ্ণের প্রয়াণ ও যাদবদের বিনাশের কথা জানালেন। রাজা যুধিষ্ঠির তখন সোনার পর্বতগামী হওয়ার সংকল্প করলেন এবং উত্তরার পুত্র পারীক্ষিতকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন, রাজ্য শাসনের ৩৬ বছর পূর্ণ করে। এরপর যুধিষ্ঠির, দ্রৌপদী ও তাঁর ভ্রাতাগণ হস্তিনাপুরে ৩৬ বছর রাজত্ব করে অরণ্যে প্রবেশ করলেন। হিমালয়ে পৌঁছে পৃথার ছয় পুত্র দেহত্যাগ করলেন; পারীক্ষিত, সেই রাজর্ষি, ধর্মপূর্বক সকলকে রক্ষা করলেন। পারীক্ষিত অবিরামভাবে ষাট বছর রাজত্ব করলেন; পরে তিনি শিকারে আসক্ত হলেন এবং একদিন বৃহৎ অরণ্যে প্রবেশ করলেন। মধ্যাহ্নে আহত হরিণ খুঁজতে খুঁজতে উত্তরা-পুত্র রাজা ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড রৌদ্রে কষ্ট পেয়ে, তিনি কাছে এক ঋষিকে ধ্যানে নিমগ্ন দেখতে পেলেন এবং তাঁর কাছে জল প্রার্থনা করলেন। ঋষি মৌন রইলেন, কোনো উত্তর দিলেন না; তখন রাজা তীব্র তৃষ্ণায় কষ্ট পেয়ে ধনুর ডগা দিয়ে একটি মৃত সাপ তুলে ঋষির গলায় রাখলেন। তবুও ঋষি নির্বাক, ধ্যানে অবিচল রইলেন; রাজা নিজের গৃহে ফিরে গেলেন। সে সময়, গো-মাতা থেকে জন্মানো মহাতপস্বী ঋষিপুত্র বন ছাড়িয়ে খেলছিলেন এবং বন্ধুদের মুখে শুনলেন, ‘‘তোমার পিতার গলায় মৃত সাপ পড়ানো হয়েছে।’’ এই কথা শুনে ঋষিপুত্র অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তিনি হাতে জল নিয়ে রাজাকে অভিশাপ দিলেন, ‘‘যে দুষ্কৃতিকারী আজ আমার পিতার গলায় মৃত সাপ রেখেছে, তাকে সাত রাতের মধ্যে তক্ষক দংশন করবে।’’ এরপর ঋষির এক শিষ্য রাজা পারীক্ষিতের কাছে এসে এই অভিশাপের কথা জানালেন। ব্রাহ্মণের অভিশাপ শুনে, অভিমন্যুপুত্র পারীক্ষিত বুঝতে পারলেন, এ অনিবার্য। তিনি প্রবীণ মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, ‘‘আমি ব্রাহ্মণের অভিশাপে অভিশপ্ত হয়েছি, নিশ্চয়ই শত্রুতাবশত। মন্ত্রীরা, এখন কী করা উচিত? বেদজ্ঞরা বলেন, মৃত্যু অনিবার্য। তবুও শাস্ত্রবিধান অনুযায়ী প্রয়াস তো করতেই হয়, কিছু চিন্তক বলেন, উপায় খুঁজে নিতে হয়। উপযুক্ত উপায়ে কাজ সিদ্ধ হয়, অন্যভাবে নয়; রত্ন, মন্ত্র, ওষধির শক্তি বোঝা কঠিন।’’ ‘‘যদি ভালভাবে প্রস্তুত রত্নধারীও কিছু করতে না পারে, তবে কেন এক ঋষির পত্নী, সাপের দংশনে মৃত হয়ে, আবার জীবিত হলেন? সেই অপ্সরা ঋষি স্বীয় আয়ুর অর্ধেক দিয়ে পুনর্জীবিত করেছিলেন। তবুও, ভাগ্য প্রবল হলে জ্ঞানীরাও তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। মন্ত্রীরা যেন এই উদাহরণ প্রত্যক্ষ করেন। স্বর্গে বা মর্ত্যে এমন কেউ কি আছেন, যিনি ভাগ্য এড়াতে পেরেছেন?’’ ‘‘ভাগ্যের ওপর স্থির থেকে নিরুদ্যম থাকা যায়, অথবা অনাসক্ত হয়ে ভিক্ষুকের মতো সর্বত্র ভিক্ষা করা যায়। গৃহস্থদের বাড়িতে, নিমন্ত্রিত বা অনিমন্ত্রিতভাবে, যেভাবে হোক, যা মুখে আসে—কিন্তু চেষ্টাবিহীন খাদ্য কি পেটে পৌঁছায়? চেষ্টা করতেই হয়; সাফল্য না এলে, তখন ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়—এটাই জ্ঞানীদের মত।’’ মন্ত্রীগণ জানতে চাইলেন, ‘‘কোন ঋষি তাঁর প্রিয়াকে অর্ধেক আয়ু দান করে জীবিত করেছিলেন? কিভাবে তিনি মারা গিয়েছিলেন, হে মহারাজ? দয়া করে বিস্তারিত বলুন।’’ রাজা বললেন, ‘‘ভৃগুর সুন্দরী ও মনোহরী পত্নীর নাম ছিল পুলোমা। তাঁর গর্ভে জন্মালেন বিখ্যাত ঋষি চ্যবন। চ্যবনের কন্যা শার্যতি থেকে জন্মালেন অপরূপা সুকন্যা। তাঁর গর্ভে জন্মালেন বিখ্যাত ও সমৃদ্ধশালী প্রমতি। প্রমতির প্রিয় পত্নী ছিলেন প্রসিদ্ধ প্রতাপী। তাঁদের গর্ভে জন্মালেন ঋষি রুরু, যিনি তপস্যায় শ্রেষ্ঠ। সেই সময়ে বিখ্যাত ঋষি স্থূলকেশাও ছিলেন, যিনি তপস্যাপরায়ণ, ধর্মনিষ্ঠ ও সত্যবাদী।