ভগবান নারায়ণ বললেন, “হে মহর্ষি, সাবর্ণির জন্ম ও কার্যকলাপ আমি তোমাকে বর্ণনা করলাম। যে কেউ এই কাহিনি পাঠ বা শ্রবণ করে, সে দেবীর কৃপা লাভ করে।” এবার শ্রীর নারায়ণ বললেন, “শোনো, ভ্রমরী দেবীর কাহিনি এবং অবশিষ্ট মনুগণের আশ্চর্য জন্মকথা। কেবল স্মরণ করলেই দেবীর প্রতি ভক্তি জাগে। বৈবস্বত মনুর ছয় পুত্র ছিলেন—করূষ, পৃষধ্র, নাভাগ, দৃষ্ট, শর্যতি ও ত্রিশঙ্কু। এরা সকলেই পরাক্রমশালী ও পুণ্যবান ছিলেন। এই ছয়জন কালীন্দী নদীর পবিত্র তীরে গিয়ে কঠোর সাধনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁরা শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে, অন্ন ত্যাগ করে, প্রত্যেকে পৃথকভাবে মৃত্তিকার দেবীমূর্তি নির্মাণ করে পূজা করতে লাগলেন। নানা উপাচার দিয়ে গভীর শ্রদ্ধায় দেবীর আরাধনা করলেন। এই মহাতপস্বী রাজপুত্ররা শুকনো পাতা, বায়ু, জল, ধূম ও সূর্যরশ্মি আহার করে ক্রমে কঠোর তপস্যা করলেন। এভাবে অব্যাহত ভক্তি ও উপাসনায় তাঁদের অন্তরে নির্মল বুদ্ধি উদিত হলো, সমস্ত মায়া দূরীভূত হল। তাঁরা দেবীর চরণে একাগ্রচিত্তে মন স্থাপন করলেন এবং সেই শুদ্ধ বুদ্ধিতে সমগ্র বিশ্বকে নিজের অন্তরে উপলব্ধি করলেন। বারো বছর কঠোর তপস্যার পর একদিন এক আশ্চর্য্য দর্শন তাঁদের সামনে প্রকাশ পেল—বিশ্বজননী দেবী স্বয়ং তাঁদের সামনে আবির্ভূত হলেন। দেবী ছিলেন সহস্র সূর্যের মতো দীপ্তিময়। তাঁকে দর্শন করে ছয় রাজপুত্রের মন ও আত্মা শুদ্ধ হয়ে উঠল। তাঁরা ভক্তিভরে দেবীকে প্রণাম করে স্তব করতে লাগলেন, “হে মহামায়া, হে জয়ময়ী, হে করুণার আধার! আপনি বাক্ভাবের পূজায় প্রসন্ন, বাক্ভাব থেকে প্রকাশিত, ‘ক্লীং’ বিঞ্জপদের মূর্তি, ক্লীং-উপাসককে আনন্দদানকারী। কামরাজের চিত্তকে আনন্দিত করেন, শিব-নারায়ণ-সূর্য-ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতাদের রূপে আপনি ভোগবৃদ্ধি করেন। আপনি মহামায়া, মহাসুখময়ী, মহাসামর্থ্যদাত্রী।” তাঁদের এই স্তব শুনে দেবী করুণাময়ী মুখে শুভবাক্য উচ্চারণ করলেন, “হে রাজপুত্রগণ, তোমরা মহাতপস্বী ও মহাত্মা। আমার পূজার দ্বারা তোমরা নির্মল ও কলঙ্কহীন হয়েছ। চাও, যা কিছু চাও, নির্দ্বিধায় বর গ্রহণ করো। আমি সন্তুষ্ট, যা কিছু তোমাদের মনে আছে তাই দান করব।” রাজপুত্ররা বললেন, “হে দেবী, আমাদের রাজ্য যেন কণ্টকমুক্ত হয়, আমাদের বংশ যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়, আমাদের ভোগ-বিলাস যেন বাধাহীন হয়, খ্যাতি, দীপ্তি ও জ্ঞান যেন লাভ করি, সকলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সমৃদ্ধি কামনা করি—এই বর দিন।” দেবী বললেন, “তথাস্তু। তোমাদের মনে যা আছে, সবই হবে। আরও বলছি, মন দিয়ে শোনো—তোমরা সবাই মন্বন্তরের অধিপতি হবে, দীর্ঘস্থায়ী বংশ ও অসীম ভোগ লাভ করবে। আমার কৃপায় অক্ষয় শক্তি, রাজ্য, খ্যাতি, দীপ্তি ও ঐশ্বর্য লাভ করবে। তোমরা প্রত্যেকে পালাক্রমে এইসব প্রাপ্তি পাবে।” নারায়ণ বললেন, এইভাবে দেবী ভ্রমরী তাঁদের বর দিয়ে, তাঁদের ভক্তি ও স্তব গ্রহণ করে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সেই রাজপুত্ররা তখনই পৃথিবীতে মহাশক্তি ও সর্বোচ্চ ভোগ-সমৃদ্ধিতে রাজত্ব করলেন। তাঁরা নিরবচ্ছিন্ন বংশ স্থাপন করলেন এবং মনুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করলেন। পরবর্তী জন্মে তাঁরা সাবর্ণি মনু রূপে আবির্ভূত হলেন। প্রথমজন হলেন দক্ষ সাবর্ণি—নবম মনু। দেবীর কৃপায় তিনি অপরাজেয় শক্তিশালী হলেন। দ্বিতীয়জন হলেন মেরু সাবর্ণি—দশম মনু। তিনিও দেবীর কৃপায় মন্বন্তরের অধিপতি হলেন। তৃতীয়জন সূর্য সাবর্ণি—একাদশ মনু। চতুর্থজন চন্দ্র সাবর্ণি—দ্বাদশ মনু, যিনি তপস্যায় সিদ্ধ ও শক্তিতে অনুপম। পঞ্চমজন রুদ্র সাবর্ণি—ত্রয়োদশ মনু, মহাশক্তিসম্পন্ন। ষষ্ঠজন বিষ্ণু সাবর্ণি—চতুর্দশ মনু, কর্মে সিদ্ধ। এভাবে চৌদ্দ মনু দেবী ভ্রমরীর কৃপায় মহাপ্রভা, মহাশক্তি ও সর্বত্র সম্মান লাভ করেন এবং সর্বদা দেবী-স্তব ও পূজায় বিখ্যাত হন। এ পর্যায়ে নারদ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভগবান, এই ভ্রমরী দেবী কে? তিনি কিভাবে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর স্বরূপ কী? এই আশ্চর্য কাহিনি বলুন, যা সমস্ত দুঃখ নাশ করে। দেবীকথার অমৃত পান করে কখনো তৃপ্তি হয় না, কারণ এ কাহিনি শ্রবণে মৃত্যুও আসে না।” শ্রীনারায়ণ বললেন, “শোনো নারদ, আমি তোমাকে সেই বিশ্বজননীর লীলাকথা বলব, যাঁর রূপ অচিন্ত্য ও অব্যক্ত, আশ্চর্য ও মুক্তিদায়িনী। দেবীর সমস্ত কার্যকলাপ জগতের মঙ্গলের জন্য, যেমন মা সন্তানের জন্য করেন। এককালে পাতাললোকে অরুণ নামক এক মহাশক্তিশালী অসুর বাস করত। সে দেবতাদের ঘোর শত্রু ও দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। দেবতাদের জয় করতে সে পদ্মজন অর্থাৎ ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা শুরু করল, ভাবল—তিনি আমাদের রক্ষা করবেন। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে, যেখানে গঙ্গার জল অতি শীতল, সেখানে গিয়ে সে পত্রাহারী হয়ে, শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে তপস্যায় মনোনিবেশ করল।