ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণম্
মহাদেব গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধায় বললেন—আমি সেই পরমাত্মার প্রতি প্রণাম জানাই, যিনি অছোঁয়া, সমস্ত কিছুর কারণ, এবং সর্বোচ্চ স্বরূপ। তিনি স্থূলের চেয়েও স্থূল, সূক্ষ্মের চেয়েও সূক্ষ্ম, আবার তিনিই সর্বোচ্চ। তাঁর রূপ আছে—আবার নিরাকারও তিনি; গুণ আছে, আবার নির্গুণও তিনি; তিনিই পরম ঈশ্বর। তাঁর রূপ অপূর্ব সুন্দর, তুলনাহীন এবং সর্বত্র ব্যাপ্ত। তিনি নিজেই কর্মের মূর্তিমান রূপ, সমস্ত কর্মের সাক্ষী। তাঁর অংশ ও রূপভেদে তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা—তিনিই। আবার তিনিই প্রকৃতির স্বরূপ, আর নিজের মায়া দ্বারা পুরুষের রূপ ধারণ করেন। নিজের মায়া দ্বারা তিনি নারী, পুরুষ ও নপুংসকের রূপ ধারণ করেন। তিনি সমস্ত দুঃখ থেকে উদ্ধারকারী, সমস্ত কারণের কারণ। দীপ্তিমানদের মধ্যে তিনি সূর্য, সমস্ত জীবের মধ্যে তিনি পাতাল অগ্নি। রুদ্র, বৈষ্ণব, ও জ্ঞানীদের মধ্যে তিনি স্বয়ং শঙ্কর। প্রজাপতিদের মধ্যে তিনি ব্রহ্মা, সিদ্ধদের মধ্যে তিনি কপিল। দেবতাদের মধ্যে তিনি বিষ্ণু, দেবীদের মধ্যে তিনি স্বয়ং প্রকৃতি, নারীদের মধ্যে তিনি শতরূপা—সেই বহুরূপী ঈশ্বরকে আমি প্রণাম জানাই। ঋতুগুলোর মধ্যে তিনি বসন্ত, মাসগুলোর মধ্যে তিনি মার্গশীর্ষ। নদীগুলোর মধ্যে তিনি সমুদ্র, পর্বতমালার মধ্যে হিমালয়। পাতাগুলোর মধ্যে তুলসীপাতা, কাঠের মধ্যে চন্দন। ফুলের মধ্যে পারিজাত, শস্যের মধ্যে ধান। রাজাতি হাতিদের মধ্যে এয়রাবত, পাখিদের মধ্যে গরুড়। উজ্জ্বল পদার্থের মধ্যে তিনি সোনা, শস্যের মধ্যে যব। যক্ষদের মধ্যে তিনি কুবের, গ্রহদের মধ্যে বৃহস্পতি। বেদসমূহের মধ্যে তিনি শাস্ত্র, বিদ্বানদের মধ্যে সরস্বতী। মন্ত্রসমূহের মধ্যে তিনি বিষ্ণুমন্ত্র, তীর্থের মধ্যে স্বয়ং গঙ্গা। শক্তিশালীদের মধ্যে তিনি শক্তি, দ্রুতগামীদের মধ্যে তিনি মন। শিক্ষকদের মধ্যে তিনি জ্ঞানদাতা, আত্মীয়দের মধ্যে মাতৃরূপ, এবং বন্ধুদের মধ্যে জন্মদাতা—তিনিই সেই সারস্বরূপ ঈশ্বর, যাঁকে আমি প্রণাম করি। কারিগরদের মধ্যে তিনি বিশ্বকর্মা, সুন্দরদের মধ্যে কামদেব। প্রিয়জনদের মধ্যে তিনি পুত্রের রূপ, পুরুষদের মধ্যে রাজার রূপ। ধর্মের বীজে তিনি ধর্ম, বেদসমূহের মধ্যে সামবেদ। জলে তিনি শীতলতার সার, মাটিতে সুগন্ধির রূপ। যজ্ঞসমূহের মধ্যে রাজসূয়, ছন্দের মধ্যে গায়ত্রী। গাভিদের মধ্যে দুধের রূপ, বিশুদ্ধদের মধ্যে বিশুদ্ধতম। ঘাসের মধ্যে কুশ, শত্রুদের মধ্যে রোগ। তিনি দীপ্তির রূপ, জ্ঞানের রূপ, এবং সমস্ত রূপের অধিকারী মহাপুরুষ। যে সমস্ত কিছু ধারণ করে, তাদের মধ্যে তিনি বায়ু; চিরস্থায়ী সত্তাদের মধ্যে তিনি স্বয়ং আত্মা। তাঁকে বেদে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, কোনো পণ্ডিত তাঁকে যথাযথভাবে বর্ণনা করতে পারে না। এমনকি বেদও তাঁকে বন্দনা করতে পারে না; সরস্বতীও সেখানে নীরব হয়ে যান। তিনি শুদ্ধ দীপ্তিময় রূপ, ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহের স্বরূপ। দুই বাহুযুক্ত এক কিশোর, ঠোঁটে বাশিঁ, মুখে আনন্দের হাসি। রাধার কাছ থেকে পান পেয়ে তিনি তা সানন্দে গ্রহণ করেন—তাঁকে দেখলে মন মোহিত হয়ে যায়। রত্নালঙ্কারে বিভূষিত, সাদা চামরের সেবায় অভিষিক্ত। বৃন্দাবনের অপরূপ কুঞ্জে, রাসনৃত্যের আনন্দে তিনি সদা উত্সুক।