তুলসী ছিলেন শ্যামবর্ণা, অপূর্ব কেশধারিণী, মনোমুগ্ধকর এবং তাঁর দেহ ছিল বটবৃক্ষের মতো সুগঠিত। পুরুষ ও নারী—যে-ই তাঁকে দেখত, কেউই তাঁর সৌন্দর্যের তুলনা খুঁজে পেত না। পৃথিবীর পরিমাপ অনুযায়ী তিনি ছিলেন একেবারে যথাযথ, যেমন নারীর স্বভাবেই থাকে। তুলসী সেখানে এক লক্ষ দেববছর ধরে সর্বোচ্চ তপস্যা করলেন। গ্রীষ্মে তিনি পঞ্চাগ্নি তপস্যা করতেন, আর শীতে সেই সুন্দরী জলস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বিশ হাজার বছর ধরে তিনি কেবল ফল ও জল গ্রহণ করলেন। এরপর চল্লিশ হাজার বছর তিনি শুধু বায়ু গ্রহণ করে জীবনধারণ করলেন। এক পা-এ দাঁড়িয়ে, সূক্ষ্ম ও দুষ্প্রাপ্য অবস্থায়, তাঁকে দেখে পদ্মজনিত ব্রহ্মা বিস্মিত হলেন। তুলসী নিজেও দেখলেন—চতুর্মুখী, রাজহংসবাহন ব্রহ্মা সেখানে উপস্থিত। তখন ব্রহ্মা বললেন, ‘‘তুমি চাও ভক্তি, মুক্তি কিংবা অমরত্ব—যা-ই হোক, বর চাও।’’ তুলসী বললেন, ‘‘হে সর্বজ্ঞ, আপনার সামনে আমার আর কী লজ্জা? আমি তুলসী, একসময় গোপী ছিলাম, গোকুলে বাস করতাম। আমি গোবিন্দে আসক্ত ছিলাম, কিন্তু তৃপ্তি পাইনি, অচেতনও হয়েছিলাম। তখন রাধিকা ক্রুদ্ধ হয়ে গোবিন্দকে তিরস্কার করেন এবং আমায় অভিশাপ দেন। গোবিন্দ আমায় বলেছিলেন, ‘তুমি আমারই এক অংশ হয়ে চতুর্ভুজ রূপে জন্মাবে।’ এই কথা বলে দেবতাদের ঈশ্বর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তখন আমি আমার প্রিয় নারায়ণকে দেখলাম—তিনি শান্ত, সুন্দর রূপে প্রকাশিত।’’ ব্রহ্মা বললেন, ‘‘তোমার সেই উজ্জ্বল অংশ ভারতভূমিতে আলভ্য নামে জন্ম নিয়েছে। এখন রাধিকার অভিশাপে সে দানবকুলে জন্মেছে। গোকুলে তোমায় পূর্বে দেখেছিল বলে তার মনে কামনা জেগেছিল। সে পূর্বজন্ম স্মরণ করে তপস্যা করেছিল এবং বর পেয়ে তোমায় পেয়েছে। এখন, হে সুন্দরী ও শুভ্রা, তুমি তার পত্নী হও। নারায়ণের অভিশাপ ও অংশরূপে, দেবব্যবস্থায়, তুমি সকল ফুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হবে, বিষ্ণুর প্রাণের চেয়েও প্রিয় হবে। বৃন্দাবনে তুমি বৃক্ষরূপে জন্মাবে এবং ‘বৃন্দা’ নামে পরিচিত হবে। বৃক্ষদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপে তুমি সর্বদা কৃষ্ণের সঙ্গে থাকবে।’’ ব্রহ্মার এই বাণী শুনে তুলসী হাসলেন, তাঁর হৃদয় আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠল। তুলসী বললেন, ‘‘হে পিতা, আমি সত্য বলছি, চারভুজ নারায়ণের প্রতি আমার তেমন আকর্ষণ নেই। আমি গোবিন্দে তৃপ্ত হইনি, কারণ ভাগ্য আমার কামনায় বাধা দিয়েছে। তবে তাঁর কৃপায়, যিনি দুর্লভ গোবিন্দ, তিনি পুনরায় আমার লাভ হবেন।’’ ব্রহ্মা বললেন, ‘‘আমার বরবলে তুমি রাধিকার কাছে প্রাণের মতো প্রিয় হবে। রাধিকা আদেশ দেবেন, তোমাদের প্রেম গোপন থাকবে।’’ এরপর ব্রহ্মা দেবীকে ষোড়শাক্ষর মন্ত্র প্রদান করলেন এবং সমস্ত পূজাবিধি ও আচার শেখালেন। ব্রহ্মার আদেশে তুলসী পবিত্র বদরিকা আশ্রমে সেই সমস্ত আচরণ পালন করলেন। বারো দেববছর ধরে তিনি পূজা করলেন। যখন তপস্যা ও মন্ত্র সিদ্ধ হল, তিনি অভীষ্ট বর লাভ করলেন। দেবী তখন তপস্যার ক্লান্তি ত্যাগ করলেন, মন তৃপ্ত হল। আহার ও পান করে, সন্তুষ্ট মনে তিনি বিশ্রামে শয়ান হলেন। এ সময় নারায়ণ বললেন, ‘‘তাজা যৌবনা, সেই শ্রেষ্ঠ নারী প্রশংসিত হলেন...