সহস্র বছরের শেষে, এক আশ্চর্য জলবুদবুদের মতো এক রূপ ধারণ করল। সেই রূপের দেহের একটিমাত্র রোমকূপে সম্পূর্ণ বিশ্ব বাস করে। অথচ তিনি স্বয়ং কৃষ্ণের ষোড়শাংশ মাত্র—তিনি পরমাত্মা। তিনি মহাসমুদ্রে শয়ন করলেন, যেন জলের উপর পদ্মপাতা ভাসছে। তখন সেই জলের মধ্য থেকে কিছু শক্তি উদিত হল, যাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্রহ্মাকে বিনাশ করা। সেই শক্তি থেকে উৎপন্ন হলো সমগ্র পৃথিবী, যা সেই মহাশক্তির মজ্জা থেকেই সৃষ্ট। এ পর্যায়ে, এক জিজ্ঞাসু বললেন, “আমার সন্দেহ দূর করতে আপনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করুন।” উত্তরে বলা হল, “সৃষ্টির আদিতে যা কিছু ঘটেছে, তার সবই আমি বলেছি, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ। সৃষ্টির সূচনালগ্নে নারায়ণ ও মহেশ্বর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। ব্রহ্মা-কাল্পের শুরুতেই এই কাহিনি বলা হয়েছিল, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ। ব্রহ্মা, বরাহ ও পদ্ম—এই তিনটি প্রধান কাল্প আছে। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি—এই চার যুগ। এক মন্বন্তরে একাত্তর দেবযুগ থাকে। ব্রহ্মার এক বছর গঠিত হয় এমন তিনশ ষাট দিনের দ্বারা। অথচ কৃষ্ণ, যিনি পরমাত্মা, তাঁর কাছে এ সময়কাল কেবল এক নিমেষমাত্র। এছাড়াও আছে অনেক ছোট ছোট কাল্প, যেগুলো প্রলয় প্রভৃতি নামে পরিচিত। ব্রহ্মার একটি দিনই এক কাল্প নামে পরিচিত। তিনটি প্রধান কাল্প—ব্রহ্মা, বরাহ এবং পদ্ম। ব্রহ্মা-কাল্পে স্রষ্টা পৃথিবী সৃষ্টি করেন ও সৃষ্টিকর্ম সম্পাদন করেন। বরাহ-কাল্পে তিনি পৃথিবীকে উদ্ধার করেন, যা পাতালে হারিয়ে গিয়েছিল। পদ্ম-কাল্পে স্রষ্টা বিষ্ণুর নাভিকমল থেকে উৎপন্ন পদ্মের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেন। এইভাবে সৃষ্টির ধারায় সময়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।” এখানে আবার প্রশ্ন করা হল, “এই সব সৃষ্টি করার পরে তিনি কী করলেন? দয়া করে তা বলুন।” উত্তরে বলা হল, “এই সব সৃষ্টি করার পরে তিনি গেলেন রস-মণ্ডলের অপূর্ব আনন্দময় পরিবেশে। সেখানে ছিল মনোমুগ্ধকর, ইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষরাজি, অপরূপ সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। চন্দন, আগর, কস্তুরি ও কুমকুমে সুসজ্জিত সেই স্থান; নতুন চন্দনপাতা, রেশমি সুতো ও গ্রন্থিতে অলংকৃত। সেখানে ছিল ত্রিশ কোটি মণিময় মণ্ডপ, যা অমূল্য রত্নের সার থেকে গড়া। চারপাশে ছিল ভোগ্য ও প্রেমের উপযুক্ত অসংখ্য সামগ্রী। সেই স্থানেই বিশ্বেশ্বর সবার সঙ্গে অবস্থান করলেন। ঠিক তখন কৃষ্ণের বাম দিক থেকে এক অপূর্ব কুমারী জন্ম নিলেন। তিনি রস-মণ্ডলের, গোলোকের অধিষ্ঠাত্রী, এবং হরি-সম্মুখে ছুটে চললেন। তিনি জীবনের দেবী, কৃষ্ণের পরমাত্মার প্রিয়তমা। ষোড়শী, সদ্য যৌবনা, অনন্যা সুন্দরী। সৌন্দর্যের মাঝে তিনি সর্বাপেক্ষা সুন্দর, কোমল অঙ্গ, মাধুর্য মূর্তি। তাঁর অধর, বন্দুজীবা ফুলের থেকেও লাল, পৃথিবীর সেরা রমণী তিনি। তাঁর মুখচ্ছবি যেন দশ কোটি শরৎপূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্তিমান, নির্মল ও শুভ্র। তাঁর নাসিকা রাজহংসের ঠোঁটের সৌন্দর্যকেও হার মানায়, দর্শনে মোহিত করে। তিনি পরিধান করেছেন অপূর্ব রত্নখচিত কর্ণফুল। তাঁর গাল দুটি সিঁদুরের টিপে চিহ্নিত, অপূর্ব মোহনীয়তায় ভরা। এইভাবেই সৃষ্টি ও অনন্ত সময়ের ধারায়, সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর অনন্ত লীলার এক অপূর্ব বর্ণনা ফুটে ওঠে।