দৈত্যদের গুরু যখন বিশ্রাম নিয়ে আসন গ্রহণ করলেন এবং যথাযথ সম্মান পেলেন, তখন তিনি আগন্তুকের আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। এমনকি শত্রুও যদি কারও গৃহে আসে, তাকে শত্রুতা দেখানো উচিত নয়—এই নীতিতে তিনি আগাগোড়া তার স্ত্রীর অপহরণের কাহিনি বিশদভাবে বললেন। বৃহস্পতির কথা শুনে কবি ক্রুদ্ধ হলেন; কিন্তু নারদ, তার শিষ্য চন্দ্রের এই অপরাধের কথা শুনে, একে গুরুতর অপরাধ বলে মনে করলেন এবং রাগে কবি বললেন, ‘‘ভাই, যখন তোমার প্রিয় স্ত্রী, অন্যের দ্বারা অপমানিত, তোমার কাছে ফিরে আসবে, তখনই আমি আহার করব, পান করব, বিশ্রাম নেব, কথা বলব।’’ ‘‘তুমি তাকে এখানে নিয়ে এসো, সম্মান দাও, চন্দ্রকে তার গুরুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য অভিশাপ দাও, তারপরই আমি আহার করব—শক্তিশালী গ্রহাধিপতি, আমার কথা শোনো।’’ এভাবে জীভকে বলার পর দৈত্যদের গুরু চলে গেলেন। তিনি শিবের উপাসনা করে চরম শক্তি অর্জন করলেন। শঙ্কর থেকে নানা বর পেয়েছিলেন, ভবা দ্বারা পূজিত হয়ে, শিবের কৃপায় শরীরধারীদের জন্য এখানে কীই বা unattainable! শুক্র জীভকে নিয়ে চন্দ্রের অধিবাসস্থলে গেলেন এবং উচ্চস্বরে চন্দ্রকে অভিশাপ দিলেন, ‘‘শোনো, চন্দ্র! তুমি পাপের অহংকারে পাপের চেয়েও বড় পাপ করেছ; তাই তুমি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হও—এভাবেই ঋষি রাগে তাকে অভিশাপ দিলেন।’’ ঋষির অভিশাপে চন্দ্র তৎক্ষণাৎ হরিণচিহ্নিত হয়ে গেলেন; কে-ই বা বিনাশের মুখোমুখি হয় না, যখন সে তার গুরু, অধিপতি বা বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতকতা করে? এরপর চন্দ্র তার স্ত্রীকে ত্যাগ করলেন, এবং ঋষি তারা-কে গ্রহণ করলেন; শুক্র দেবতা, ঋষি ও পিতৃগণের দলকে আহ্বান করলেন। তারা-র বিষয়ে সমাধান খুঁজতে তিনি নানা নদী, নদী-দেবতা ও সাধু উদ্ভিদদের জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। তখন দেবতাদের কাছে এক দৈব বাণী প্রকাশিত হল: ‘‘তারা যদি গৌতমী নদীতে ভক্তি সহকারে স্নান করেন, তিনি শুদ্ধ হবেন।’’ এটি সর্বোচ্চ গোপন, কাউকে বলা উচিত নয়; সব অবস্থায় গৌতমী-ই মানুষের আশ্রয়। তারা তার স্বামীর সঙ্গে বিধি অনুসারে স্নান করলেন; সেখানে ফুলের বর্ষণ হল, বিজয়ের ধ্বনি উঠল। আবার দেবতা, আবার মানুষ, এবং সত্যনিষ্ঠ রাজারা ব্রহ্মার স্ত্রীর পুনরুদ্ধার করলেন; আবার তাকে ফিরিয়ে দিলেন। ব্রহ্মার স্ত্রীকে দেবতারা শুদ্ধ করে ফিরিয়ে দেওয়ায় সবকিছু শান্ত হল; তাই, মহর্ষি, সেই স্থান পবিত্র তীর্থ হয়ে উঠল। ব্রহ্মার স্ত্রীকে দেবতারা শুদ্ধ করে ফিরিয়ে দেওয়ায় সবকিছু শান্ত হল; তাই, মহর্ষি, সেই তীর্থ সমস্ত পাপের স্তূপ ধ্বংসকারী, সকল অভিলাষ পূরণকারী, দেবতা ও তাদের অনুগামীদের আনন্দ ও কল্যাণের উৎস হয়ে উঠল। বিশেষত বৃহস্পতি, শুক্র ও তারা-র জন্য, গুরু চরম আনন্দ লাভ করলেন এবং গঙ্গাকে বললেন— ‘‘তুমি, হে গৌতমী, সর্বদা পূজনীয়, সকলের মুক্তিদাত্রী, বিশেষত যখন আমি সিংহ রাশিতে থাকি, তখন তুমি তিনটি জগতকে শুদ্ধ করো।’’ ‘‘তুমি সকল নদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হবে, সকল তীর্থের অধিকারিণী; স্বর্গ, পৃথিবী, পাতালে যত তীর্থ আছে, তারা আমার সিংহ রাশিতে থাকাকালীন তোমার মধ্যে স্নান করতে আসবে, মা।’’ ‘‘আনন্দ নামক তীর্থ সুখ, খ্যাতি, দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে, শুভ ও ধন-সম্পদ উৎপন্ন করে।’’ ‘‘সেখানে গৌতম পাঁচ হাজার তীর্থ ঘোষণা করেছিলেন; তাদের স্মরণ বা পাঠে সর্বদা অভিলাষ পূরণ হয়।’’ ‘‘এখানে, যেখানে শিব বাস করেন, নন্দী সর্বদা গঙ্গার তীরে বিচরণ করেন; তাই একে নন্দীতট বলা হয়, আর সেই তীর্থ আনন্দ নামে পরিচিত, কারণ এটি সকল আনন্দ বৃদ্ধি করে।’’ ‘‘এটি ভবতীর্থ নামে পরিচিত, যেখানে ভবা নিজে অবস্থান করেন—তিনি সকল প্রাণের আত্মা, সমগ্র জগতে বিদ্যমান, যার রূপ সত্তা, চেতন ও আনন্দ।’’ ‘‘এখন, আমি তোমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও পুণ্যময় কাহিনি বলছি—সৌরবংশীয়, ক্ষত্রিয় ধর্মের ধারক, পরাক্রমশালী এক রাজা।’’ ‘‘তিনি ছিলেন প্রচীনবর্হি, সকল কর্তব্যে দক্ষ, যিনি তিন কোটি পঞ্চাশ লক্ষ বছর রাজত্ব করেছিলেন।’’ ‘‘তিনি এই ব্রত পালন করতেন: যখন আমার যৌবন হারিয়ে যাবে, হোক তা প্রিয় স্ত্রী, পুত্র বা প্রিয় সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে—’’ ‘‘—তখন আমি রাজ্য ত্যাগ করব, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটাই জ্ঞানী, উচ্চবংশীয় এবং বিচক্ষণ মানুষের আচরণ।’’ ‘‘কোথাও নির্জনে বাস করে, সম্পদ হারিয়ে বৈরাগ্য লাভ করে, এমনকি পৃথিবী শাসন করলেও, কখনো প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্নতা হয় না।’’ ‘‘তাঁর শাসনে কোনো দুঃখ, রোগ, দুর্ভিক্ষ বা আত্মীয়দের মধ্যে বিবাদ ছিল না; কেউ কাউকে হারায়নি।’’ ‘‘এরপর, পুত্রের আকাঙ্ক্ষায়, জ্ঞানী রাজা যজ্ঞ করলেন; এবং প্রসন্ন ভগবান তাঁর ইচ্ছামত বর দিলেন।’’ ‘‘গৌতমী নদীর তীরে মহেশ্বর রাজাকে দর্শন দিলেন; রাজা তাঁর স্ত্রীসহ ভবা-র কাছে পুত্রের বর চাইলেন।’’ ‘‘ভবা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘আমার তৃতীয় নয়ন দেখো।’ তখন, সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, রাজা ভবা-র নয়ন দেখলেন।’’ ‘‘সেই নয়নের দীপ্তি থেকে এক পুত্র জন্ম নিলেন, যিনি মহিমা নামে খ্যাত, এবং যিনি মহিম্ন স্তোত্র রচনা করেছিলেন।’’ ‘‘প্রসন্ন ত্রিপুরান্তক-র কাছে কীই বা unattainable, যাঁকে হরি, ব্রহ্মা ও দেবতারা সদা অনুসরণ করেন?’’ ‘‘পুত্র লাভ করে, রাজা তীর্থের শ্রেষ্ঠত্ব চাইলেন, গুরুতর পাপ, ভয়ঙ্কর রোগ ও বিপদগ্রস্তদের জন্য।’’ ‘‘বিভিন্ন দুর্দশাগ্রস্তদের সকল অভিলাষ পূরণের জন্য ভবা শ্রেষ্ঠত্ব দিলেন, তাই একে ভবতীর্থ বলা হয়।’’ ‘‘সেখানে স্নান ও দান করলে সব অভিলাষ পূরণ হয়; ভবা-র কৃপায় প্রচীনবর্হি পুত্র পেলেন।’’ ‘‘মহিমা গৌতমীর তীরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; তাই একে ভবতীর্থ বলা হয়। সেখানে সত্তরটি পবিত্র স্নানস্থান রয়েছে, যা সকল কল্যাণ প্রদান করে।’’ এভাবেই এই কাহিনি প্রবাহিত হয়েছে, গৌতমী নদীর তীরের পবিত্র স্থান ও তার মহিমা, দেবতা, ঋষি ও রাজাদের কীর্তি ও বরদান।