রাজ্যের সেই মহাপরাক্রমশালী রাজাকে অনুসরণ করছিলেন নানা পেশার মানুষ—কবিদের দল, কবিতার স্রষ্টা, নানান ছন্দে পারদর্শী জনেরা; ছিলেন বিষের চিকিৎসক, গরুড়বিদ্যায় দক্ষ ব্যক্তিত্ব, আর বহু রকম রত্ন পরীক্ষা করার বিশেষজ্ঞরা। সঙ্গে ছিলেন ধাতুশিল্পী, তামার কারিগর, কাঁসার ও সোনার গয়নার শিল্পী, রেশম বুননকারী, চিত্রকর, কুমোর এবং অগ্নিশিল্পীও। রাজাকে অনুসরণ করছিলেন লাঠি নির্মাতা, তরবারি গড়ার কারিগর, মদ প্রস্তুতকারক, কুস্তিগীর, বার্তাবাহক, লেখক, ও আরও নানা কাজে নিযুক্ত মানুষ। ছিলেন তাঁতিরা, মূর্তি নির্মাতা, নানা হস্তশিল্পী, তেল নিষ্কাশক, ভাজা খাদ্য বিক্রেতা, পক্ষী শিকারি ও বন্য প্রাণী ও পাখি ধরে জীবিকা নির্বাহকারীরাও। এছাড়াও ছিলেন হাতির চিকিৎসক, মানব চিকিৎসক, বৃক্ষ চিকিৎসক, গরুর চিকিৎসক এবং ছেদন ও দাহ চিকিৎসায় পারদর্শীরা। এইভাবে নগরের সব শ্রেণির মানুষ—এমনকি যাঁদের নামোল্লেখ হয়নি, তাঁরাও—রাজাকে অনুসরণ করছিলেন; গোটা নগরবাসীরাই তাঁর সাথে চলেছিলেন। ঠিক যেমন সন্তানরা উৎসাহভরে পিতার পিছু নেয় যখন তিনি অন্য গ্রামে যান, তেমনই নগরের অধিবাসীরাও রাজাকে অনুসরণ করলেন। সেই মহাপ্রতাপশালী রাজা, চারিদিকে বিশিষ্ট মানুষ, হাতি, ঘোড়া, রথ ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন। এভাবে দীর্ঘ সময় যাবৎ সেই বিশাল বাহিনী তাঁকে অনুসরণ করতে করতে, রাজা পৌঁছালেন সমুদ্রের দক্ষিণ তীরে। তিনি সেখানে অপূর্ব সুন্দর সমুদ্র দর্শন করলেন—যেন নৃত্যমগ্ন, অসংখ্য লক্ষ লক্ষ তরঙ্গে উচ্ছলিত। সমুদ্রটি ছিল নানাবিধ রত্নে পূর্ণ, অসংখ্য জলজ প্রাণীতে পরিপূর্ণ, তরঙ্গ ও উচ্ছ্বাসে প্রাচুর্যময়, বিচিত্র বিস্ময়ে ভরা। সেই মহাতীর্থ সমুদ্র ছিল গর্জনে মুখর, সীমাহীন, ভয়ংকর, মেঘের মতো গম্ভীর, অতলস্পর্শ, মকরদের আবাস। মাছ, কচ্ছপ, শঙ্খ, ঝিনুক, মগর, কাঁটা মাছ, শুশুক, কাঁকড়া এবং ভয়ংকর বিষধর সাপের ভিড়ে পূর্ণ ছিল সেই সমুদ্র। এ ছিল লবণাক্ত মহাসাগর—হরি ভগবানের শয়নভূমি, নদীর অধিপতি, সমস্ত পাপের বিনাশকারী, পবিত্র এবং সকল কামনার পূরণকারী। এ মহাসমুদ্র ছিল অসংখ্য ঘূর্ণাবর্তে গভীর, দানবদের আশ্রয়স্থল, অমৃত মন্থনের মথানি, দেবত্বের উৎস, জলের অধিপতি। সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, জীবনের ধারক, শুদ্ধদের মধ্যেও সর্বশুদ্ধ, মঙ্গলময়দের মধ্যেও সর্বোৎকৃষ্ট। তীর্থসমূহের মধ্যে প্রধান, অবিনশ্বর, জলচরদের অধিপতি, যার সীমা চন্দ্রের ক্ষয়বৃদ্ধির মতো নির্ধারিত। সকল প্রাণীর অগম্য, দেবতাদের অমরত্বের আশ্রয়, চিরন্তন সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ। এই নদী ও স্রোতের অধিপতিকে, সকলের পুণ্যফলের উৎসকে দেখে, সেই শ্রেষ্ঠ রাজা গভীর বিস্ময়ে অভিভূত হলেন। তিনি সমুদ্রতীরে, পবিত্র ও মনোরম, সকল ভূমিজ গুণে সমৃদ্ধ এক ভূমিতে বাস স্থাপন করলেন। সেই স্থানটি শোভিত ছিল শাল ও কদম্ব বৃক্ষের বনে, পুন্নাগ, সরল, কাঁঠাল, নারকেল, বকুল ও নাগকেশর বৃক্ষে। ছিল তাড়ি, অশ্বত্থ, খেজুর, কমলালেবু, বিজপুরী, শাল, অম্রাতক, লোধ্র, বকুল ও নানান বারাক বৃক্ষ। কপিঠ ও কর্ণিকার, পাতলা, অশোক, চম্পা, ডালিম, তামাল, পারিজাত, অর্জুন—এমন বহু বৃক্ষ সেখানে ছিল। প্রাচীন আমলকি, বেল, প্রিয়াঙ্গু, বট, খদির, ইঙ্গুদি, সপ্তপর্ণ, অশ্বত্থ, অগস্ত্য ও জাম্বুক বৃক্ষও ছিল। মধুক, কর্ণিকার, বারাক, টিন্দুক, পালাশ, বড়, নীপ, সিদ্ধ নিম্ব, শুভ অঞ্জন বৃক্ষ—এসবও ছিল। বারাক, কোবিদার, ভল্লাত, আমলকি, হিন্তাল, অঙ্কোল, করঞ্জ, বিভীতক বৃক্ষও সেখানে ছিল। সসর্জ, মধুক, আশ্মরী, শালমলী, দেবদারু, শাখোটক, নিম, বট, কুম্ভী, কৌশ্ঠ, হরীতক বৃক্ষের সমারোহ ছিল। গুগ্গুলু, চন্দন, আগরু, পাতলা, জাম্বীর, করুণ, টিন্টিডি ও রক্তচন্দন বৃক্ষও ছিল। এভাবে নানান প্রকার বৃক্ষ, অসংখ্য উদ্ভিদ, সর্বদা ফলদানকারী ইচ্ছা-পূরণ বৃক্ষ ও চিরকাল ফুলে ভরা বনভূমি ছিল সেখানে। ছিল অসংখ্য দেবপাখি, মাতাল পাপিয়ার গান, ঝাঁকে ঝাঁকে মনোরম ময়ূর, তোতা ও শ্যামা পাখিতে ভরা। হারিত, ভৃঙ্গরাজ, চাতক, বহুপ্রিয়, জীবঞ্জীব, কাকোল, কলবিঙ্ক ও ঘুঘু পাখিরা ছিল। আরও নানা রকম পাখি, কণ্ঠমধুর ও মনোহর, বৃক্ষের শাখায় বসে মধুর সুরে গাইত। সেখানে সদা শুভ্র কেতকী, মল্লিকা, কুন্দকুসুম, যূথিকা, তগর ফুলের ঝাঁক ছিল। কুটজ, বাণপুষ্প, অতিমুক্ত, কুব্জক, মালতী, করবীর ও সোনালী কলাগাছ শোভা দিত। বিভিন্ন বন, উদ্যান ও বনে নানা রঙের ও সুবাসিত ফুলে পূর্ণ ছিল সেই ভূমি। ছিল বিদ্যাধর, সিদ্ধ, চারণ, গান্ধর্ব, নাগ, রাক্ষস, ভূত, অপ্সরা ও কিন্নরদের সমাগম। ঋষি, যক্ষের দল, নানা প্রাণী, হরিণ, গৃধ্র, সিংহ, বন্য শূকর ও মহিষে ভরা ছিল সেই স্থান। আরও ছিল কৃষ্ণসার মৃগ ও অন্যান্য প্রাণী, বাঘ, দীপ্তিমান হাতি ও নানা বন্য পশু। নানাবিধ বৃক্ষ, নন্দন উদ্যানসম গাছগাছালি, লতা ও ঝোপের কুঞ্জ, নানা জলাশয়ে পূর্ণ ছিল ভূমি। হাঁস, কারাণ্ডব, পদ্মপুকুরের ঝাঁক, কদম্ব পাখি, জলচর, রাজহাঁস ও চক্রবাক পাখিতে সে স্থান শোভিত ছিল। এভাবেই সেই রাজা, তাঁর রাজ্যবাসী ও বিশাল বাহিনী নিয়ে, সমুদ্রতীরে এক অপূর্ব, পবিত্র, সম্পদে ও সৌন্দর্যে ভরা ভূমিতে বাস করতে লাগলেন।