চণ্ডীশ, গণেশ, নন্দী ও গুহ—এঁদের কথা প্রথমেই স্মরণ করা হয়। এরপর দেবীকে সম্বোধন করে বলা হয়, “হে দেবী, আমার মনে যে মনোরম কাহিনি আছে, তা মনোযোগ দিয়ে শুনো।” এই কাহিনিতে বলা হয়, আট দিন পরে, তিনি যখন চোখ খুললেন, তখন দেখলেন শিবা নিদ্রায় নিমগ্ন। এরপর জগদম্বিকা জানতে চাইলেন, “তুমি কত শ্লোক শুনেছ?” এই প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, গুহার ভিতরে বাস করা তোতা পাখিটি এই মহাকথা শুনে দীর্ঘায়ু লাভ করেছিল। সে শিবের ধামে থেকে দেবীর ধ্যানে নিজেকে নিমগ্ন করেছিল। এর ফলে সে ভাগবতের মাহাত্ম্য ও তার দুর্লভতা উপলব্ধি করেছিল। পরে, যখন সে নর্মদা নদীর তীরে পৌঁছায়, তখন সে এই পুণ্যকথা বর্ণনা করে। এই কাহিনি যেন যোগ্য, জ্ঞানী বিষ্ণুভক্ত কাউকে প্রদান করা হয়। এভাবে দেবতা বোপদেব শান্ত মনে কথা শেষ করে অদৃশ্য হয়ে যান। এভাবেই কালী যুগের ইতিহাসের সংকলনে, চতুর্যুগ-খণ্ড-অপরপর্যায় অংশে, প্রতিসর্গ পর্বের অন্তর্গত ভবিষ্য পুরাণের বত্রিশতম অধ্যায় সমাপ্ত হয়। এরপর বলা হয়, “সমস্ত বেদের ব্যাপকতা দেখে আমরা তা শুনতে আগ্রহী। কোন স্তব পাঠ করলে বেদপাঠের ফল লাভ করা যায়?” এখানে বলা হয়, ‘ব্যাধকর্ম’ নামে এক ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন—যিনি একজন ব্রাহ্মণীর গর্ভে শূদ্রের সন্তান। সেই ব্রাহ্মণীর নাম ছিল কামিনী, যিনি ত্রৈবিধ্য পাঠকারী এক দ্বিজের স্ত্রী ছিলেন। জীবিকার সন্ধানে সেই দ্বিজ একসময় সপ্তশতী পাঠ করতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক মাস কাটিয়ে দেন, বাড়ি ফেরেননি। এদিকে কামিনী এক শক্তিশালী নিষাদকে দেখেন, যে কাঠ বহন করে জীবিকা নির্বাহ করত। পরে নিষাদের সঙ্গে মিলনে কামিনী গর্ভবতী হন। বারো বছর কেটে গেলে সেই সন্তান, যে ছিল বৈদিক জ্ঞানে অজ্ঞ, এবং তার মা—দু’জনকেই দ্বিজ নিজে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর তারা প্রতিদিন চণ্ডীকা স্তব পাঠ করতে করতে বিন্ধ্য পর্বতে বাস করতে থাকে। পরে তারা সুখে নিষাদের বাড়িতে, বনে গিয়ে থাকতে শুরু করে। সেই ছেলেটি ব্যাধের কাজ করতে করতে চুরি করেও পিতা-মাতাকে খুশি করত। চুরির নেশায় সে এক নারীর জন্য অলঙ্কার এনে দিত। একদিন সে এক দ্বিজের পোশাকও চুরি করে। তবে, পবিত্র স্তব পাঠের শক্তিতে তার মনে ধর্মভাব জাগে। সেখানে সে এক গুরুর শিষ্য হয় এবং ‘মৈষ’ বর্ণ উচ্চারণ করতে থাকে। পরে সে অক্ষরমালার স্তব পাঠ করে আদির কীর্তির কথা গাইতে থাকে। পরম আনন্দে সে মহাদেবী অন্নপূর্ণাকে স্তব করে। তিনি চিরন্তন আনন্দদাত্রী, পরম নির্ভয়তা দানকারী, সৌন্দর্য ও রত্নের সাগর, পাপ নাশিনী এবং কাশীর অধিষ্ঠাত্রী। একশ আটটি নাম স্তব করে সে ধ্যানে স্থিত হয়। তখন দেবী তাকে ঋগ্বেদের জ্ঞান দান করেন এবং অদৃশ্য হন। পরে সে রাজা বিক্রমাদিত্যের যজ্ঞের পুরোহিত হয়। হে বিদ্বান, এভাবেই তোমাকে আদির কীর্তির পুণ্যকথা বর্ণনা করা হল। ভবিষ্য পুরাণের প্রতিসর্গ পর্বের চতুর্যুগ-খণ্ডের অন্তর্গত কালী যুগের ইতিহাসের সংকলনের তেত্রিশতম অধ্যায়, ‘প্রথম কীর্তির বিবরণ’ এখানেই শেষ। পরবর্তী কাহিনিতে বলা হয়, ভীমবর্মন নামে এক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি মাংস খান ও মদ্যপান করতেন। মাংসের লোভে তিনি শুকর ও গ্রাম্য মুরগি ভক্ষণ করতেন। ক্রমে তিনি এতটাই অধঃপতিত হন যে, মানুষের মাংস খেতে শুরু করেন এবং অন্য খাবার পরিত্যাগ করেন। অল্প বয়সেই তিনি ক্ষয়রোগ ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই ভয়ঙ্কর ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির জন্য চণ্ডীকা স্তব পাঠ করা হয়। এভাবেই এই কাহিনিগুলি পরপর বর্ণিত হয়েছে, যেখানে দেবীর কৃপা, স্তবের মহিমা, পুণ্য ও পাপের ফল, এবং ভাগ্য পরিবর্তনের অলৌকিক কাহিনি উঠে এসেছে।