শিশুটির চারদিকে, এক দীপ্তিমান, চার দীর্ঘ বাহুযুক্ত মহাপুরুষ আবির্ভূত হলেন। তাঁর কানে জ্বলন্ত স্বর্ণের কুণ্ডল, রক্তাভ চোখ, হাতে গদা—তিনি যেন এক জ্বলন্ত উল্কার মতো বারবার সেই গদা ঘুরিয়ে শিশুর চারপাশে ঘুরতে লাগলেন। নিজের গদা দিয়ে তিনি সেই ভয়ংকর অস্ত্রের অগ্নিশক্তিকে দূর করলেন, যেন গোবর্ধনধারী কৃষ্ণ কুয়াশা সরিয়ে দেন। শিশুটি বিস্ময়ে তাকিয়ে ভাবল—“এ কে?” এইভাবে বিপদ দূর হলে, অপরিমেয়, সর্বব্যাপী, ধর্মরক্ষক শ্রীহরি শিশুটির চোখের সামনেই, দশ মাস পূর্ণ হলে, অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এরপর, যখন সমস্ত মঙ্গলসূচক লক্ষণ প্রকাশ পেল এবং গ্রহরা অনুকূল হল, তখন পাণ্ডুবংশধারী সেই শিশুর জন্ম আবার হল—পাণ্ডুর শক্তি নিয়ে। রাজা যুধিষ্ঠির আনন্দে পরিপূর্ণ মনে ব্রাহ্মণদের—ধৌম্য, কৃপাচার্য প্রভৃতি—দিয়ে শিশুর জন্মকুণ্ডলী নিরীক্ষণ করালেন এবং সমস্ত মঙ্গলাচরণ সম্পন্ন করালেন। তিনি ধর্মজ্ঞ ছিলেন, তাই জন্মস্থানে ব্রাহ্মণদের সোনার, গরু, জমি, গ্রাম, হাতি, ঘোড়া ও উৎকৃষ্ট ভোজ্য দান করলেন। তৃপ্ত ব্রাহ্মণগণ বিনীত রাজাকে বললেন, “হে পুরুবংশশ্রেষ্ঠ, আপনার বংশে তিনিই সেই মহান সন্তান। ভাগ্যের অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছায়, যখন শুভক্ষণ এসেছিল, সর্বশক্তিমান বিষ্ণু আপনার আশীর্বাদের জন্য তাঁকে পাঠিয়েছেন। তাই তিনি ‘বিষ্ণুরাত’ নামে খ্যাত হবেন—বিষ্ণুর দ্বারা রক্ষিত। সন্দেহ নেই, তিনি হবেন মহাভক্ত ও মহাত্মা।” যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, “এই শিশু কি আমাদের রাজর্ষিদের মহৎ ও ধর্মপথ অনুসরণ করবে? যাঁরা সজ্জন ও জ্ঞানীদের দ্বারা প্রশংসিত?” ব্রাহ্মণরা বললেন, “হে পৃথাপুত্র, তিনি প্রজাদের প্রকৃত রক্ষক হবেন, মানুষের মধ্যে ইক্ষ্বাকুর মতো, ব্রাহ্মণপ্রিয় ও সত্যনিষ্ঠ, দশরথনন্দন রামের মতো। তিনি শিবির মতো দাতা ও আশ্রয়দাতা, যজ্ঞকার্যে দুষ্যন্তপুত্রের মতো কীর্তিবান হবেন। তিনি উভয় অর্জুনের মতো তীরন্দাজ, অনতিক্রম্য অগ্নির মতো, এবং সমুদ্রের মতো দুর্লঙ্ঘ্য। তিনি সিংহের মতো বীর, হিমালয়ের মতো দৃঢ়, পৃথিবীর মতো সহিষ্ণু এবং পিতামাতার মতো সহনশীল। তিনি পিতামহের মতো নিরপেক্ষ, শিবের মতো করুণাময়, সকলের আশ্রয়, যেমন লক্ষ্মীর জন্য ভগবান। কৃষ্ণভক্ত, সমস্ত সদ্গুণসম্পন্ন; দানশীলতায় রন্তিদেব, ধর্মনিষ্ঠায় যয়াতির তুল্য। স্থিরতায় বলির মতো, কৃষ্ণভক্তিতে প্রহ্লাদের মতো; তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা করবেন। তিনি রাজর্ষিদের উৎপাদক ও পথভ্রষ্টদের দণ্ডদাতা হবেন; ধর্মরক্ষায় তিনি পৃথিবীতে কলিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন। তক্ষক নামক সর্প কর্তৃক মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে, যেটি ঋষিপুত্র প্রেরিত, তিনি সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করে হরিধামে গমন করবেন। আত্মার প্রকৃত স্বরূপ জানতে চেয়ে, তিনি ব্যাসপুত্র শুকদেবের কাছ থেকে উপদেশ শুনে গঙ্গাতীরে দেহত্যাগ করে নির্ভয়ে সরাসরি পরমগতি লাভ করবেন।” এইভাবে রাজাকে উপদেশ দিয়ে, সম্মানিত ব্রাহ্মণগণ নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি ‘পরীক্ষিত’ নামে পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ হলেন, কারণ পূর্বে যা দেখেছিলেন, তা স্মরণ করে তিনি পৃথিবীর মানুষের পরীক্ষা নেবেন। সেই রাজপুত্র চাঁদের মতো দ্রুত বেড়ে উঠতে লাগলেন, প্রতিদিন পিতার স্নেহে যেন চন্দনের কাঠ দিয়ে আহুত হলেন। যুধিষ্ঠির, আত্মীয়দের প্রতি অপরাধবোধ থেকে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার ইচ্ছা করলেন এবং কর ও দণ্ড ছাড়া অন্য উপায়ে সম্পদ লাভের চিন্তা করলেন। তাঁর মনের ইচ্ছা বুঝে, অচ্যুতের প্রেরণায়, তাঁর ভাইয়েরা উত্তর দিক থেকে প্রচুর সম্পদ নিয়ে এলেন। এইভাবে সংগৃহীত সম্পদে, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির তিনটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেন এবং ভীষণ ভক্তি ও ভয়ে হরিকে পূজা দিলেন। রাজার আমন্ত্রণে, ভগবান স্বয়ং ব্রাহ্মণদের দ্বারা রাজাকে অভিষিক্ত করে, কিছুকাল সখাদের প্রতি স্নেহবশত অবস্থান করলেন। পরে, রাজার অনুমতিতে, কৃষ্ণ অর্জুন ও যাদবগণের সঙ্গে দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করলেন। শ্রীকৃষ্ণের এই শৈশবলীলা—ভক্তরক্ষা—ব্রজের কিশোরেরা যৌবনে বিস্ময়ে স্মরণ করে বলত। এ বিষয়ে আশ্চর্য কিছু নেই, কারণ পরম স্রষ্টা স্বয়ং, তাঁর লীলার জন্য মানবরূপে অবতীর্ণ হন; যাঁর ছোঁয়ায় অঘাসুরের মতো পাপীও মোক্ষলাভ করেন, এমনকি তিনি আত্মার সম্যক অবস্থায় পৌঁছান, যা দুর্জনদের জন্য অত্যন্ত দুর্লভ। যিনি একবারও ভগবানের রূপ মনে স্থাপন করেন, তিনি পরম ভক্তির পথ লাভ করেন; তাহলে যিনি মোহমুক্ত হয়ে চিরন্তন আত্মার আনন্দে সদা বিভোর, তাঁর কী হবে! এভাবেই, দ্বিজগণ, যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের আশ্চর্য কীর্তি শুনে পুনরায় শুকদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁর মন সেই পবিত্র কাহিনিতে নিমগ্ন। রাজা জানতে চাইলেন, “হে ব্রাহ্মণ, যেটি শ্রীহরির শৈশবে সংঘটিত হয়েছিল, কিভাবে কিশোররা যৌবনে তা গেয়ে থাকে—যখন সময় ভিন্ন?” তিনি বললেন, “হে মহাযোগী, হে পূজনীয় আচার্য, এই পরম আশ্চর্য বিষয়টি আমায় বলুন; নিশ্চয়ই, এটি হরির মায়ারই খেলা—এছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা নেই। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান, হে আচার্য, যদিও আমরা নামেমাত্র ক্ষত্রিয়, কারণ আমরা সর্বদা আপনার কাছ থেকে কৃষ্ণকথার অমৃত পান করি।” শ্রীসূত বলেন, এইভাবে প্রশ্ন করলে, বদরায়ণের পুত্র, যাঁর ইন্দ্রিয় অনন্ত হৃদয়ে নিমগ্ন, স্মরণ ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে সেই শ্রেষ্ঠ ভাগবতভক্তকে উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, “হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, আপনি যেমন জানতে চেয়েছেন, আমি এখানে ভগবানের সকল লীলাবতারের কাহিনি সম্পূর্ণ বলেছি। যিনি পতিত, ক্লিষ্ট, আহত বা অসহায় অবস্থায় উচ্চস্বরে ‘হরিকে নমস্কার’ বলেন, তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন। যখন অনন্ত ভগবানকে গুণগান করা হয়, শ্রবণের মাধ্যমে যার শক্তি উপলব্ধি হয়, তিনি মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে তাদের সকল দুঃখ সম্পূর্ণরূপে দূর করেন, যেমন সূর্য ও প্রবল বাতাস অন্ধকার ও মেঘ সরিয়ে দেয়। যে কথায় ভগবানের কথা নেই, তা শূন্য, মিথ্যা; কেবল সেটিই সত্য, সেটিই মঙ্গল, সেটিই পবিত্র, যা ভগবানের গুণ প্রকাশ করে।” এভাবেই শ্রীমদ্ভাগবতের এই অংশের কাহিনি প্রবাহিত হয়—ভক্তি, আশ্বাস ও মহিমায় পূর্ণ।