ভীষ্ম যখন অখণ্ড ব্রহ্মের সঙ্গে একীভূত হচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত সকলে একদম নীরব হয়ে গেলেন—যেন দিনের শেষে পাখিরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে দেবতা ও মানুষরা বাজনা বাজাতে লাগলেন; সদ্গুণীজনরা ভীষ্মকে প্রশংসা করলেন, আর আকাশ থেকে রাজাকে ফুলের বৃষ্টি বর্ষিত হতে লাগল। ভীষ্মের মহাপ্রয়াণের পর, যুধিষ্ঠির, ভৃগুবংশীয় পুত্র, সমস্ত শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন করলেন। তবুও, কিছুদিন তিনি গভীর বিষাদে ডুবে রইলেন। তখন উপস্থিত ঋষিরা আনন্দে কৃষ্ণকে গোপন নাম ধরে স্তব করতে লাগলেন, এবং কৃষ্ণভক্তিতে পরিপূর্ণ হৃদয়ে তাঁরা নিজেদের আশ্রমে ফিরে গেলেন। এরপর যুধিষ্ঠির, কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে গজাহ্বয়ায় গেলেন এবং পিতাকে ও ব্রতচারিণী গান্ধারীকে সান্ত্বনা দিলেন। পিতার অনুমতি ও কৃষ্ণের সম্মতিতে, যুধিষ্ঠির পিতামহ ও পিতার উত্তরাধিকার সিংহাসনে বসে ধর্মপূর্বক রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন। সেই সময় বীরদের জননী, তাঁর পুত্রকে বারবার বুকে জড়িয়ে ধরলেন; তাঁর স্তন থেকে দুধ প্রবাহিত হচ্ছিল, আর চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। লোকেরা রাণীকে বলল, “শুভলক্ষণে আপনার পুত্র, যিনি সকলের দুঃখ দূর করেন, দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ফিরে এসেছেন এবং তিনি আবার পৃথিবীকে রক্ষা করবেন।” তারা আরও বলল, “নিশ্চয়ই, হে রাণী, আপনি ভগবানকে, দুঃখহরণকারীকে পূজা করেছেন। যাঁরা একাগ্রচিত্তে তাঁর ধ্যান করেন, তাঁরা মৃত্যুকেও জয় করতে পারেন, যা অতি কঠিন।” এইভাবে, প্রজারা যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভ্রাতাদের স্নেহে আগলে রাখল। আনন্দিত রাজা, সকলের প্রশংসায়, গজে আরোহণ করে নগরে প্রবেশ করলেন। নগরের প্রতিটি প্রবেশপথে ছিল অপূর্ব মকর-তোরণ, কাঁদা কলাগাছের গুচ্ছ, সুসজ্জিত সুপুরি স্তূপ। প্রতিটি দ্বারে ছিল জলপূর্ণ কলস, দীপ, কাঁচা আমপাতার মালা, মুক্তার ঝাড়। চারিদিকে সোনালী অলঙ্কারে সজ্জিত প্রাসাদ, উঁচু গৃহশিখর, দুর্গ ও গেটওয়ে শহরকে শোভিত করছিল। প্রাঙ্গণ, রাস্তা, চৌমাথা ছিল পরিষ্কার, চন্দনজলে সিঞ্চিত, সর্বত্র মুড়ি, অখণ্ড শস্য, ফুল, ফল, সিদ্ধ ভাতের নিবেদন ছিল। রাজা যখন পথে চলছিলেন, নগরনারীরা নানা স্থানে মঙ্গলদ্রব্য—চাল, অখণ্ড শস্য, দই, জল, দুর্বা, ফুল, ফল নিয়ে এলেন। ভক্তিসম্পন্ন নারীরা স্নেহবশত রাজাকে আশীর্বাদ করলেন, তিনি পিতার প্রাসাদে প্রবেশ করলেন, আর নারীদের শিশুসুলভ মধুর গান শুনলেন। সেই অপূর্ব রত্নখচিত প্রাসাদে, পিতা তাঁকে অতিশয় স্নেহে রাখলেন—তিনি যেন স্বর্গে দেবতার মত বাস করতে লাগলেন। সেখানে দুধের ফেনার মত শুভ্র শয্যা ছিল, সোনার অলঙ্কারে সজ্জিত; আসন ছিল অমূল্য, যাবতীয় আসবাব ছিল স্বর্ণনির্মিত। স্ফটিক প্রাচীর ও বৃহৎ পান্নার ওপর রত্নখচিত প্রদীপ জ্বলছিল, যা নারীদের অলংকারের রত্নে সজ্জিত ছিল। সেই প্রাসাদে ছিল মনোমুগ্ধকর উদ্যান, যেখানে দেববৃক্ষ, কূজনরত বিহঙ্গযুগল, ও মত্ত মৌমাছি গুনগুন করছিল। ছিল নীলকান্তমণি সিঁড়িওয়ালা সরোবর, পদ্ম, শাপলা, কুমুদে ভরা—হংস, সারস, চক্রবাকের বিচরণস্থল। রাজর্ষি উত্তানপাদ, পুত্রের এই অসাধারণ মহিমা দেখে ও শুনে চরম বিস্ময়ে অভিভূত হলেন। পুত্রের বৃদ্ধি, প্রজার স্নেহ এবং মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন দেখে, তিনি ধ্রুবকে পৃথিবীর অধিপতি করে দিলেন। নিজ বার্ধক্য উপলব্ধি করে, রাজা সংসারবিমুখ হয়ে, আত্মার পথ চিন্তা করতে করতে বনগমন করলেন। এদিকে, শৌনক জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ধর্মজ্ঞ শ্রেষ্ঠ, যুধিষ্ঠির যখন শত্রুদের পরাজিত করে রাজ্য পুনরুদ্ধার করলেন, ভাইদের সঙ্গে নির্ভয়ে আহার করতে লাগলেন, তখন তিনি পরে কী করলেন?” সূত বললেন, “হরি, জগতের কর্তা, কুরু বংশকে যে নিজেদের দ্বন্দ্বে ধ্বংস হয়েছিল, পুনরায় প্রতিষ্ঠা করলেন। যুধিষ্ঠিরকে নিজ রাজ্যে বসিয়ে হরি আনন্দিত হলেন।” ভীষ্ম ও অচ্যুতের উপদেশ শুনে, সত্যজ্ঞান দ্বারা সমস্ত সংশয় দূর করে, যুধিষ্ঠির অপরাজেয় ভ্রাতাদের সহায়তায় দেবরাজ ইন্দ্রের মতো পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন। তখন মেঘ ইচ্ছামত বৃষ্টি দিত, পৃথিবী চাহিদামত ফসল দিত, গাভীরা আনন্দে দুধে গ্রাম প্লাবিত করত। নদী, সমুদ্র, পর্বত, অরণ্য, উদ্ভিদ—সবই তাঁর জন্য ইচ্ছামত ফল দিত। রাজত্বকালে কোনো ব্যাধি, রোগ, বা দুঃখ—ভাগ্য, অন্য প্রাণী বা নিজের দ্বারা—কোনো প্রাণীকেই স্পর্শ করত না। হরি, কিছুকাল হস্তিনাপুরে থেকে, বন্ধুদের আনন্দ দিতে ও প্রিয় বোনকে খুশি করতে এলেন। বিদায় নেওয়ার অনুমতি পেয়ে, আলিঙ্গন ও প্রণাম করে তিনি রথে আরোহণ করলেন; কেউ তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, কেউ সম্মান জানালেন। সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, বিরাটকন্যা, গান্ধারী, ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, নকুল ও সহদেব উপস্থিত ছিলেন। ভীম, ধৌম্য, ও অন্যান্য নারী—যেমন মাছ্যরাজকন্যা—বিমূঢ় ও বিহ্বল হয়ে, শার্ঙ্গধারীর বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারছিলেন না। সৎজনদের সঙ্গে সঙ্গ করে যে জ্ঞানী কু-সংসর্গ থেকে মুক্ত হয়, একবার ভগবানের মধুর কীর্তি শুনে সে আর তা ছাড়তে পারে না। পাণ্ডুপুত্রদের মন যাঁর মধ্যে নিবদ্ধ ছিল, তাঁরা কেমন করে সহ্য করতেন—যাঁর সঙ্গে দেখা, স্পর্শ, কথা, শয়ন, আসন, আহার সব ভাগ করে নিয়েছেন—তাঁর বিচ্ছেদ? তাঁদের হৃদয় কৃষ্ণের পেছনে ছুটছিল; তাঁরা অনিমেষ নয়নে কৃষ্ণকে অনুসরণ করছিলেন, স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, এদিক-ওদিক ঘুরছিলেন। কৌরব নারীরা, দেবকী-পুত্রের প্রতি আকাঙ্ক্ষায়, চোখের জল সংবরণ করছিলেন—ভাবছিলেন, “তিনি গৃহত্যাগ করছেন, কোনো অশুভ যেন না ঘটে।” মৃদঙ্গ, শঙ্খ, ভেরি, বীণা, পণব, গোমুখ, ধুন্ধুরি, অনক, ঘণ্টা ও দন্দুভি ধ্বনিত হতে লাগল। কৌরব নারীরা কৃষ্ণকে দেখার জন্য প্রাসাদের চূড়ায় উঠে এলেন, প্রেম ও লজ্জার হাসিতে চোখ ভাসিয়ে, ফুল বর্ষণ করতে লাগলেন। এভাবেই ভীষ্মের মহাপ্রয়াণ থেকে শুরু করে যুধিষ্ঠিরের শাসন, নগরপ্রবেশ, রাজপ্রাসাদের সৌন্দর্য, উত্তানপাদের বনগমন, এবং কৃষ্ণের বিদায়—সবই মহিমামণ্ডিত হয়ে এক অপূর্ব ধারায় প্রবাহিত হলো।