শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের দ্বিতীয়ার্ধে ‘শ্রুতদেবের আশীর্বাদ’ অধ্যায়টি শেষ হলো। এরপর রাজা পারীক্ষিত শ্রীর শ্রীশুকদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রাহ্মণ, নিরাকার, নিরুপলক্ষ্য, অতীন্দ্রিয় ব্রহ্মকে নিয়ে গুণাশ্রিত বেদসমূহ কিভাবে কার্য করে, যেখানে তিনি অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব—উভয়েরই অতীত?” শ্রীশুক বললেন, “ভগবান জীবের বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়, মন ও প্রাণ সৃষ্টি করেছেন—ইন্দ্রিয়বিষয়, সংসার, আত্মার কল্যাণ এবং স্ব-অসঙ্গতার জন্য। এই উপনিষদই পুরাকালের মহর্ষিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত; যে কেউ একাগ্রচিত্তে একে ধারণ করেন, তিনি চরম মঙ্গললাভ করেন, চাই তার কিছুই না থাকুক। এখন আমি তোমাকে নারায়ণময় এক শ্লোক ও নারদ ও নারায়ণ ঋষির সংলাপ বলবো। কোন এক সময় ভগবানের প্রিয় নারদ, জগত ভ্রমণ করতে করতে, চিরন্তন নারায়ণ ঋষির দর্শন করতে তাঁর আশ্রমে গেলেন। এই ঋষি ভারতভূমিতে মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য যুগের শুরু থেকেই ধর্ম, জ্ঞান ও শান্তিসংযমে তপস্যা করছেন। সেখানে কলাপ গ্রামে অবস্থানরত মুনিদের পরিবেষ্টিত নারায়ণ ঋষিকে নারদ নমস্কার করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে কুরুশ্রেষ্ঠ, আমি জানতে চাই—ব্রহ্মতত্ত্ব সম্বন্ধে।’ ভগবান তখন মুনিদের সামনে, প্রাচীন জনলোকবাসীদের ধারিত ব্রহ্মতত্ত্বের উপদেশ শোনালেন। তিনি বললেন, “একবার জনলোকে স্বায়ম্ভূব বংশধরদের দ্বারা ব্রহ্মযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, সেখানে মনঃসন্তান ব্রহ্মচারী ঋষিগণ উপস্থিত ছিলেন। তখন তুমি শ্বেতদ্বীপে তার অধিপতির দর্শনে গিয়েছিলে; সেই সময়, যেখানে বেদসমূহ অবস্থান করে, সেখানে ব্রহ্মতত্ত্ব নিয়ে গভীর আলোচনা হচ্ছিল, এবং ঠিক এই প্রশ্নই উঠেছিল, যা তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছো। সেই ঋষিগণ জ্ঞানে, তপস্যায়, আচরণে সমান ছিলেন; তাদের সম্পদ, শত্রু-মিত্রও ছিল সমান। কেউ তত্ত্ব আলোচনা করছিলেন, কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। তখন শ্রীসনন্দন বললেন, ‘ভগবান, স্বরচিত এই সৃষ্টি আপন শক্তিসহ শয়ান। তখন বেদসমূহ তাঁকে তাদের চিহ্নে জাগ্রত করলেন, যেন তাঁকে জাগিয়ে তুললেন।’ যেমন গায়করা সকালে ঘুমন্ত রাজাকে বীরত্বের স্তবগীতে জাগিয়ে তোলে, তেমনই বেদসমূহ ভগবানকে মহিমান্বিত স্তবগীতে জাগিয়ে তুললেন। তারা বলল, ‘বিজয় হোক, বিজয় হোক! হে অজন্মা, হে অজয়, গুণাগুণে সঞ্চিত দোষ পরিত্যাগ করো। তুমি স্বভাবতই সকল শক্তির আধার, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য জগতে সকল শক্তির জাগরণ তুমি। বেদসমূহ কখনও তোমার পিছু নেয়, কখনও তোমার অদ্বিতীয় গতিতে পৌঁছাতে পারে না।’ ‘এই বিস্তৃত বিশ্ব, যা অস্তিত্বময় বলে প্রতীয়মান, জ্ঞানীরা জানেন—এটি মূলত অসার; যেমন মাটির পাত্রে রূপান্তর ঘটে, কিন্তু রূপান্তর আসলে মাটিতেই। তাই সাধুরা মন, বাক্য ও কর্ম তোমাতেই স্থাপন করেন; মানুষের পদচিহ্ন যেমন মাটিতে মিথ্যা, তেমনই এই জগতের বহিরঙ্গও মিথ্যা।’ ‘তাই, হে ত্রিলোকেশ্বর, জ্ঞানীরা তোমার লীলার অমৃতসমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে সমস্ত তপস্যা পরিত্যাগ করেন। যারা চিত্তশুদ্ধ, কামনা-কালপ্রবৃত্তি ত্যাগী, তারা তোমার ধামেই অনন্ত আনন্দে স্থিত হন।’ ‘যেমন প্রাণবায়ু দেহকে ধারণ করেও তোমার ইচ্ছানুসারী, তেমনই মহাভূতাদি, অগ্নি থেকে শুরু করে, তোমার কৃপায় ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করে। খাদ্য থেকে শুরু করে জীবসমূহের ক্রম তোমার প্রকাশ, তবু তুমি সত্য-মিথ্যার উর্দ্ধে; যা কিছু অবশিষ্ট, সেটাই তোমার অমর স্বরূপ।’ ‘যারা সীমাবদ্ধ দৃষ্টিসম্পন্ন, তারা হৃদয়কেই পথ মনে করে, সূক্ষ্ম আকাশকে গমনপথ ভাবে। সেখান থেকে, হে অনন্ত, তোমার পরম ধাম মস্তকের ঊর্ধ্বে উদিত হয়; যারা সেখানে পৌঁছে, তারা মৃত্যুর মুখে আর পতিত হয় না।’ ‘তুমি নানা আশ্চর্য গর্ভে কারণরূপে প্রবেশ করো, কর্মানুযায়ী বিভিন্ন রূপে দীপ্ত হও, যেমন আগুন নানা রূপে প্রকাশ পায়। কিন্তু যারা মিথ্যা আত্মবোধ ত্যাগী, তাদের কাছে তোমার ধাম সমভাবে উপলব্ধি হয়; বিশুদ্ধ চিত্তরা বৈচিত্র্য ত্যাগ করে তোমাতে একাত্ম হন।’ ‘এই দেহে, যা তোমারই সৃষ্টি, বহিরন্তর উভয়ই, তুমি পরম পুরুষ—সমস্ত শক্তির ধারক, সর্বত্র বিরাজমান। তাই, মানবপথ ও বেদসমাপ্তি বিচার করে, জ্ঞানীরা তোমার চরণেই ভরসা রাখে।’ ‘অনেকে আত্মতত্ত্ব জানতে চায়, যা দুষ্প্রাপ্য; তারা তোমার অমৃত কর্মসমুদ্রে নিমগ্ন হয়ে, মোক্ষও চায় না। তারা গৃহত্যাগ করে হংসসম ভক্তদের সঙ্গ চায়, তোমার চরণে আশ্রয় নেয়, আর কিছুই চায় না।’ ‘তোমার পথে চলতে চলতে, এই দেহধারীরা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-প্রিয়জনের সঙ্গে চলার ভান করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, যখন তোমার দিকে মন ফেরে, তখনই তারা সত্যিকারের তৃপ্তি পায়। আর যারা মিথ্যা আসক্তিতে মগ্ন, তারা নিজেকে কষ্ট দেয়, ভারী দেহ নিয়ে দুঃখে ঘোরে।’ ‘যে ঋষিগণ নিয়ন্ত্রিত শ্বাস, মন ও ইন্দ্রিয় দ্বারা দৃঢ় যোগাভ্যাসে তোমাকে হৃদয়ে উপাসনা করেন, তাদের শত্রুরাও স্মরণে তোমাকে লাভ করে। নাগরাজের আলিঙ্গনে যেসব নারীরা মগ্ন, তারাও, আমরাও—তোমার চরণরস পেয়ে সমান।’ ‘এখানে কে সত্যিই জানে, কার আরম্ভ, শেষ বা গতি কী—যার থেকে ঋষির উদ্ভব, যার পিছু দেবতা ও অন্যরা চলে? তাই তিনি অস্তিত্ব, নাস্তিত্ব বা উভয়ও নন; তিনি কালের অধীন নন। যখন তিনি এইভাবে শয়ান, তখন কোনো শাস্ত্রও তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।’ ‘যারা বলেন, আত্মা জন্মায়, মরে, বা দেহ থেকে পৃথক, তারা অজ্ঞানে বলেন—তারা কেবল বাহ্যিককে মনে রাখেন। পুরুষ তিন গুণময়—এ ধারণা অজ্ঞতা থেকে; তোমাতে বা তোমার বাইরে সত্যজ্ঞানীদের কাছে এসব বিভেদ স্থান পায় না।’ ‘যেমন স্বর্ণ নানা রূপে প্রকাশ পেলেও, তার সারতত্ত্ব জানলে কেউ তা ত্যাগ করে না, তেমনই আত্মজ্ঞরা সবকিছু আত্মরূপেই দেখেন, রূপান্তর ত্যাগ করেন না, কারণ সবই তোমাতে পরিব্যাপ্ত।’ ‘যারা তোমার সঙ্গী হয়ে, সমস্ত জীবের আশ্রয়রূপে ভ্রমণ করেন, তারা মৃত্যুকেও নিঃশঙ্কচিত্তে পদদলিত করেন। তুমি, হে প্রভু, দেবতাদেরও রাখালের মতো একত্র করো; যারা তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে, তারা সত্যিই পবিত্র, কিন্তু যারা বিমুখ, তারা নয়।’ ‘তুমি অক্রিয়, স্বয়ম্ভু, সমস্ত সৃষ্টিশক্তির ধারক। দেবতারা সদা জাগ্রত থেকে তোমাকে সমর্পণ করে, যেমন বাহুসমূহ সর্বাধিপতিকে সেবা দেয়। জগতের স্রষ্টারা তোমার দ্বারা নিযুক্ত হয়ে, ভয়ে তোমার সামনে কর্ম করে।’ ‘চরাচর জীবসমূহ কারণ ও অজন্মার সংযোগে উৎপন্ন হয়; তারা তোমার দৃষ্টিতেই কর্ম করে, হে মুক্ত। কিন্তু তা থেকে মুক্ত হলে, অন্য কিছু থাকে না, আর দ্বিতীয়ও নয়; যেমন আকাশ সবকিছু ধারণ করেও তুলনাহীন ও শূন্য।’ ‘যদি দেহী সত্যিই সীমাহীন, সর্বব্যাপী হয়, তবে তাদের ওপর কর্তৃত্বের নিয়ম থাকত না—কিন্তু তা হয় না। আর যা জন্মায়, যদি অজন্মার দ্বারা হয়, তবে তা ত্যাগ না করে নিয়ন্ত্রক থেকে যায়; কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুল।’ ‘প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়েরই প্রকৃত উৎপত্তি নেই, কারণ উভয়ই অজ। তাদের সংযোগে যা উৎপন্ন হয়, তা অস্থায়ী, জলের বুদ্বুদের মতো। হে পরম, তোমাতে এই সমস্ত নাম-গুণ বিলীন হয়, যেমন নদীর স্বাদসমেত জল সাগরে মিশে যায়।’ ‘মানুষদের মধ্যে যারা তোমার মায়ার প্রবল মোহ চিনে তোমাতে মন স্থাপন করে, তাদের ভক্তি ক্রমশ গভীর হয়। যারা তোমার শরণ নেয়নি, তাদের জন্য সামান্য ভ্রুকুটিও ভয় সৃষ্টি করে, আর যারা তোমার পথে চলে, তাদের সংসারভয় কেমন থাকবে?’ ‘এখানে যারা চঞ্চল মনকে নিয়ন্ত্রণে ইন্দ্রিয় ও শ্বাসের জোরে চেষ্টা করে, কিন্তু গুরুর চরণে আশ্রয় নেয় না, তারা অসংখ্য দুঃখে ভোগে, যেমন মাঝি ছাড়া বণিকরা সমুদ্রে পথ হারায়।’ ‘তুমি যখন আছো, তখন মানুষের আত্মীয়, সন্তান, স্ব, পত্নী, ধন, গৃহ, রথ—এসবের কী মূল্য? যারা অজ্ঞানে ভোগের আশায় বিচরণ করে, তাদের নিজ ভাগ্য না পেলে, কে এখানে সুখী হয়?’ ‘পৃথিবীতে যেসব মুনি তীর্থ ও আশ্রম পরিদর্শনে শুদ্ধ, যাদের হৃদয় তোমার চরণামৃতজলে ধৌত, যারা একবারও তোমাতে মন স্থাপন করেছে—তারা আর কখনো মিথ্যা আনন্দ-লুটেরা দেবলোকের বাসনা করে না।’ ‘যদি কেউ বলে, ‘এটি সত্তা থেকে জন্মে’, তবে সেই যুক্তি ভুল; কারণ তা কখনও ঠিক, কখনও ভুল, কখনও সংমিশ্রণ হয় না। ব্যবহারিক কারণে বিভেদ করা হয়, কিন্তু তা অন্ধভাবে চলে আসে, আর বাক্য, তার অলংকারে, মন্ত্রপাঠে অক্ষমদের বিভ্রান্ত করে।’ ‘যা পূর্বে ছিল না, পরে বিলীন হবে, আর মাঝখানে সীমাবদ্ধ—তা তোমাতে একরস মায়া মাত্র। তাই তা ধন বা জাতিভেদরূপ তুলনা পায়; কিন্তু জ্ঞানীরা জানেন—মনের খেলা মিথ্যা, তার আনন্দও মায়াময়।’ ‘আত্মা, অজন্মার সংস্পর্শে গুণধারী হয়ে, অজের স্পর্শে তার সদৃশ হয়, তারপর মৃত্যুমুক্ত হয়ে নিজ অংশ ত্যাগ করে। তুমিও সেই রূপ পরিত্যাগ করো, সাপের মতো খোল ফেলে, আর তোমার পরম, অমেয় মহিমায় তুমি অষ্টগুণে শ্রেষ্ঠ ও অতীত।’ ‘যদি ত্যাগীরা হৃদয় থেকে কামনার গোঁড়া উপড়ে ফেলতে না পারে, তাহলে তুমি, অযোগ্যদের জন্য দুষ্প্রাপ্য, গলার অলঙ্কারের মতো হৃদয়ে গোপন থাকো। যারা আত্মায় তৃপ্ত নয়, তাদের দুই দিকেই দুঃখ—হে প্রভু—কারণ তারা তোমার অমৃত, মৃত্যুহীন অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি।’ এইভাবে, বেদসমূহের স্তব ও ঋষিদের আলোচনা থেকে ভগবানের অদ্বিতীয়, অনির্বচনীয় স্বরূপ, তাঁর ধাম ও ভক্তির গৌরব, এবং মায়ার বিভ্রম থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ শ্রীশুক পারীক্ষিতকে শ্রদ্ধাভরে উপস্থাপন করলেন।