শ্রীবাসুদেব কৌমারী দেবকীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘‘মাতা, এই লোকদের প্রতি তোমার কোনো রাগ পোষণ কোরো না। তারা তো নিয়তির খেলনাস্বরূপ, ভাগ্যের হাতে সকলেই বাঁধা। এই জগত্ সর্বশক্তিমান ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন, তিনিই সকল কর্মের কারণ এবং কর্তা।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘আমরা সকলে কংসের অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু হে ভগিনী, ভাগ্যবশত আজ আবার আমরা আমাদের যথাযথ স্থানে ফিরে এসেছি।’’ শ্রীশুকদেব বললেন, তখন বাসুদেব, উগ্রসেন এবং যাদবগণ যখন রাজাদের যথাযথ সম্মান দিলেন, তখন রাজাগণ অচ্যুত শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করে অপার আনন্দ ও তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ হলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, অম্বিকার পুত্র ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও তাঁর পুত্রগণ, পাণ্ডবেরা তাঁদের পত্নীসহ, কুন্তী, সঞ্জয়, বিদুর ও কৃপাচার্য, কুন্তিভোজ, বিরাট, ভীষ্মক, মহাবীর নাগ্নজিত, পুরুজিত, দ্রুপদ, শল্য, ধৃষ্টকেতু, কাশীরাজ, দমঘোষ, বিশালাক্ষ, মিথিলার রাজা, মদ্র ও কেকয় দেশের রাজা, যুধামন্যু, সুশর্মা, বাহ্লিকপুত্রগণ এবং আরও অনেকে—যাঁরা সকলেই যুধিষ্ঠিরের অনুগত রাজা ছিলেন—তাঁরা সকলেই শৌরির ঐশ্বর্যময় রূপ এবং তাঁর পত্নীদের দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলেন। এরপর, বলরাম ও কৃষ্ণের কাছ থেকে যথাযথ সম্মান পেয়ে, তাঁরা আনন্দিত মনে কৃষ্ণভক্ত বৃ্ষ্ণিগণদের প্রশংসা করতে লাগলেন। তাঁরা বললেন, ‘‘হে ভোজরাজ, তুমি সত্যিই ভাগ্যবান। কারণ, যাঁকে মহাযোগীরাও সহজে দর্শন পান না, তাঁকে তুমি বারবার দেখতে পাও। যাঁর কীর্তি বেদে বন্দিত, যাঁর পবিত্র গৌরব সকলকে শুদ্ধ করে, যাঁর চরণামৃত, বাণী ও উপদেশও পবিত্র করে; সেই ভগবান কৃষ্ণের পদস্পর্শে, ভাগ্যহীন পৃথিবীও পূর্ণ আশীর্বাদে সিক্ত হয়। তাঁকে দেখা, ছোঁয়া, তাঁর পিছু চলা, তাঁর সঙ্গে কথা বলা, একসঙ্গে শোয়া, বসা, আহার করা, আত্মীয়তা ও পারিবারিক সম্পর্ক—এমনকি নরকের পথে গৃহে বাস করলেও—স্বয়ং বিষ্ণু, স্বর্গ ও মুক্তিদাতা, তোমাদের সঙ্গী হয়েছেন।’’ এদিকে, নন্দ মহারাজ জানলেন যাদুগণ কৃষ্ণের নেতৃত্বে এসেছেন। তিনি গোপগণকে নিয়ে, উপযুক্ত উপহারসহ, তাঁদের দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে বৃ্ষ্ণিগণ পরম আনন্দে অভিভূত হলেন, যেন তাঁদের প্রাণ ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পরে এই পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষায় তাঁরা নন্দকে জড়িয়ে ধরলেন। বাসুদেব গভীর স্নেহে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন এবং কংসের অত্যাচার ও সন্তানকে গোকুলে অর্পণের স্মৃতি মনে করে আবেগে আপ্লুত হলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের পিতামাতাকে আলিঙ্গন করে প্রণাম করলেন, কিন্তু প্রেমাশ্রুতে গলা বুজে গিয়ে কোনো কথা বলতে পারলেন না। তাঁদের নিজের আসনে বসিয়ে, দুই হাতে জড়িয়ে, শুভ্রা যশোদা ও তাঁর স্বামী তাঁদের পুত্রদের জন্য সমস্ত দুঃখ ভুলে গেলেন। এরপর রোহিণী ও দেবকী, বৃজেশ্বরী যশোদাকে আলিঙ্গন করলেন। পুরনো বন্ধুত্ব স্মরণ করে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে তাঁরা বললেন, ‘‘হে বৃজেশ্বরী, তোমার অটুট বন্ধুত্বকে কে ভুলতে পারে? স্বয়ং ইন্দ্রপদ লাভ করেও এর প্রতিদান দেওয়া যায় না।’’ তাঁরা আরও বললেন, ‘‘তোমার পিতামাতা তোমাকে আনন্দ, উন্নতি, লালন ও রক্ষা করেছেন—তাঁরা তাঁদের কর্তব্য সম্পূর্ণ করেছেন। যেমন চোখের পলক চোখকে রক্ষা করে, তেমনি সজ্জনদের কোনো ভয় নেই; তাঁদের জন্য স্বর্গই চরম লক্ষ্য নয়।’’ শ্রীশুক বললেন, তখন গোপীগণ বহুদিন পরে প্রিয় কৃষ্ণকে দেখে তাঁদের চোখের পলককে অভিশাপ দিলেন, কারণ পলক পড়ায় তাঁদের দর্শন বাধা পাচ্ছিল। তাঁরা চক্ষু দিয়ে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন, হৃদয়ে ধারণ করলেন, এবং এমন এক ভক্তি লাভ করলেন, যা সর্বদা কৃষ্ণের সঙ্গে থেকেও দুর্লভ। ভগবান কৃষ্ণ নির্জনে তাঁদের কাছে গিয়ে আলিঙ্গন করলেন, কুশল জিজ্ঞাসা করলেন এবং হাসিমুখে বললেন, ‘‘তোমরা কি আমাদের বন্ধুত্ব স্মরণ করো? আমরা আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য শত্রু নিধনে মনোযোগী হয়ে অনেক দিন দূরে ছিলাম।’’ ‘‘তোমরা কি আমাদের প্রতি কোনো অভিমান করেছ, অকৃতজ্ঞতা ভেবেছ? প্রকৃতপক্ষে, ঈশ্বরই সকলের মিলন ও বিচ্ছেদ ঘটান। যেমন বাতাস মেঘ, ঘাস, তুলো ও ধূলিকণাকে একত্রিত ও ছড়িয়ে দেয়, তেমনি স্রষ্টা সকল প্রাণীর মিলন ও বিচ্ছেদ ঘটান।’’ ‘‘আমার প্রতি তোমাদের ভক্তিই অমরত্বের পথ। ভাগ্যবশত তোমাদের আমার প্রতি এই অনুরাগ জন্মেছে, যা সকল বাধা দূর করেছে। আমি সকল সত্তার আদিভূত, অন্ত্য এবং অন্তঃ ও বহিরঙ্গ সার, যেমন স্থান, জল, মাটি, বায়ু ও আলো পদার্থের জন্য। এইভাবে, আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে সকল সত্তা বিদ্যমান—যাঁরা অবিনাশীকে উপলব্ধি করেন, তাঁরাই আমাকে ও সর্বোচ্চকে দেখতে পান।’’ শ্রীশুক বললেন, কৃষ্ণের এই আত্মজ্ঞানমূলক উপদেশে গোপীগণ তাঁদের প্রাণশক্তিকে স্মরণে বিলীন করে স্বীয় স্বত্বা অতিক্রম করলেন। তাঁরা প্রার্থনা করলেন, ‘‘যাঁর চরণযোগী মহাযোগীরা হৃদয়ে ধ্যান করেন, যিনি সংসার-গহ্বর থেকে উদ্ধার করেন, সেই পদ্মপদভূষিত ভগবান সদা আমাদের চিত্তে উদিত হোন, এমনকি আমরা গৃহে থাকলেও।’’ এভাবেই দশম স্কন্ধের দ্বিতীয়ার্ধে ‘বৃ্ষ্ণি ও গোপদের সাক্ষাৎ’ অধ্যায়টি সম্পূর্ণ হল। এরপর শ্রীশুক বললেন, গোপীদের আশীর্বাদ দিয়ে ভগবান, যাঁরা তাঁদের গুরু ও আশ্রয়, যুধিষ্ঠির ও তাঁর সকল প্রিয়জনের কুশল জিজ্ঞাসা করলেন। যাঁরা ভগবানের কাছে এইভাবে কুশলপ্রশ্ন ও সম্মান পেয়েছিলেন, তাঁরা আনন্দে ভরে, তাঁর চরণ দর্শনে পাপমুক্ত হয়ে উত্তর দিলেন। তাঁরা বললেন, ‘‘হে মহাশয়, তোমার চরণরস কখনো কখনো তোমার মুখ থেকেও প্রবাহিত হয়। যাঁরা শ্রবণের মাধ্যমে সেই অমৃত পান করেন, তাঁদের পক্ষে শরীরী বন্ধন ও দেহ-বিস্মৃতি ছিন্ন করা সহজ হয়। আমরা আত্মার ত্রিবিধ অবস্থা পরিত্যাগ করে, সকল কর্ম থেকে বিশুদ্ধ হয়ে, অবিচ্ছিন্ন আনন্দ ও অনাবৃত জ্ঞান লাভ করেছি। যোগ, শাস্ত্র ও কালের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে, আমরা তোমার মায়াময় রূপকে পরমহংসদের সর্বোচ্চ পথরূপে বন্দনা করি।’’ এরপর ঋষি বললেন, তখন অন্ধক ও কৌরব বংশের রমণীগণ একত্রিত হয়ে, যশস্বী মহাপুরুষদের মধ্যে শিরোমণি গোবিন্দের কীর্তি পরস্পরকে বললেন, যা তিনটি লোকেই বিখ্যাত। আমি তা তোমাকে বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো। শ্রীদ্রৌপদী বললেন, ‘‘হে বৈদর্ভী, ভদ্রা, জাম্ববতী, কৌশলা, সত্যভামা, কালিন্দী, শৈব্যা, রোহিণী, লক্ষ্মণা—হে কৃষ্ণের সকল পত্নী, তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, ভগবান স্বয়ং কীভাবে তোমাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁর ঐশ্বর্যশালী লীলায় সংসারধর্মের অনুকরণ করেছিলেন, তা বলো।’’ শ্রীরুক্মিণী বললেন, ‘‘যখন সশস্ত্র বীরেরা আমাকে চেদিরাজকে দিতে চেয়েছিল, তখন যাঁর চরণধূলি সৈন্যদের মস্তকে শোভা পায়, তিনি সিংহের মতো ছাগলের পাল থেকে ভাগ নিয়ে আমায় অপহরণ করেন। সেই শ্রীনিবাস ভগবানের চরণ সদা আমার পূজ্য হোক।’’ শ্রীসত্যভামা বললেন, ‘‘আমার অপর স্ত্রী-সহধর্মিণীর অভিশাপ মোচনে, যিনি পৃথিবীর রাজাকে পরাজিত করে রত্ন নিয়ে এলেন, আমার পিতাকে ভীত করলেন, এবং যদিও আমি অন্যকে দেওয়া হয়েছিলাম, তবু তিনি আমায় গ্রহণ করলেন।’’ শ্রীজাম্ববতী বললেন, ‘‘তিনিই শরীরের স্রষ্টা ও আমার ভাগ্যলিপ্ত স্বামী। সীতার স্বামী রূপে তিনি আমার পিতার সঙ্গে একুশ দিন যুদ্ধ করলেন। বুঝতে পেরে আমার পিতা তাঁকে পরীক্ষা করলেন এবং পরে তাঁকে রত্নসহ আমার হাত দিলেন। আমি তাঁর সেবিকা হলাম।’’ এভাবেই শ্রীকৃষ্ণের পত্নীগণ তাঁদের স্বামীর অলৌকিক বিবাহলীলা বর্ণনা করতে লাগলেন।